ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ২০ মার্চ ২০২৫ ০৯:৫৪ এএম
ফাইল ফটো
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের ১৮টি সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই সুপারিশগুলোর মধ্যে স্থায়ী জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড পুনর্গঠন, ডিজিটাল রূপান্তর ও ই-সেবা চালু, ভূমি রেজিস্ট্রেশন সংস্কার, উপজেলা পরিষদ শক্তিশালীকরণ, পদোন্নতি না পেলেও বেতন সুবিধা চালু, দুর্নীতি তদন্তে স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন এবং চাকরিতে পুলিশ ভেরিফিকেশন সীমিতকরণসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। গতকাল বুধবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে এ-সংক্রান্ত চিঠি পাঠানো হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বে থাকায় তার অবগতির জন্য চিঠিটি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়েও প্রেরণ করা হয়েছে।
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলোর মধ্যে যেগুলো দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য, সেগুলো চূড়ান্ত করেছেন আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। তিনি পাঁচটি কমিশনের সুপারিশ চিহ্নিত করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠান। এরপর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর উপদেষ্টাদের কাছে সুপারিশগুলো প্রেরণ করে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো এখন সুপারিশ বাস্তবায়নের কৌশল ও পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দেবে। এরই অংশ হিসেবে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের ১৮টি সুপারিশ এখনই বাস্তবায়নের জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরীসহ কমিশনের সদস্যরা প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদনে বিদ্যমান ৮টি প্রশাসনিক বিভাগের পাশাপাশি নতুন করে ফরিদপুর ও কুমিল্লা বিভাগ গঠনের সুপারিশ করা হয়। এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা ৪৩টি থেকে কমিয়ে ২৫টি করার প্রস্তাব করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে দেশে ৮টি প্রশাসনিক বিভাগ রয়েছে। ভৌগোলিক ও যাতায়াতের সুবিধা বিবেচনায় কুমিল্লা ও ফরিদপুর বিভাগ গঠনের দাবি অনেক দিনের। এ দুটি নতুন বিভাগ গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দেশের বিশাল জনসংখ্যার পরিষেবা ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণের জন্য পুরোনো চার বিভাগের সীমানাকে চারটি প্রদেশে বিভক্ত করে প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে মোট ৪৩টি মন্ত্রণালয় ও ৬১টি বিভাগ রয়েছে। সংস্কার কমিশন মন্ত্রণালয়গুলোকে যুক্তিসংগতভাবে কমিয়ে ২৫টি মন্ত্রণালয় ও ৪০টি বিভাগে পুনর্বিন্যাস করার সুপারিশ করেছে। মন্ত্রণালয়গুলোকে পাঁচটি গুচ্ছে বিভক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। যেমনÑ বিধিবদ্ধ প্রশাসন; অর্থ, শিল্প ও বাণিজ্য; ভৌত অবকাঠামো ও যোগাযোগ; কৃষি ও পরিবেশ এবং মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন।
সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে মেধাবী ও দক্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে সচিবালয়ের উপসচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পর্যন্ত পদগুলো নিয়ে একটি ‘সুপিরিয়র এক্সিকিউটিভ সার্ভিস’ গঠনেরও সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া সরকারি চাকরিতে সুপিরিয়র এক্সিকিউটিভ সার্ভিসের বাইরে ৫ শতাংম পদে বিশেষ যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে চুক্তিভিত্তিক যুগ্ম সচিব বা সংস্থা প্রধান পদে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এক্ষেত্রে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের আওতায় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দরখাস্ত আহ্বান করে মূল্যায়নের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হবে। নিয়োগের আগে কমপক্ষে তিন মাস ওরিয়েন্টেশন কোর্স সম্পন্ন করার বিধান রাখা হবে।
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের ১৮টি সুপারিশের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্থায়ী জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন। এ-সংক্রান্ত প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, জনপ্রশাসন সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। টেকসই সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য একটি স্বাধীন ও স্থায়ী জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তর ও ই-সেবা নিয়ে প্রস্তাবে বলা হয়, জনসেবা ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়াতে সরকারি সেবার ডিজিটাল রূপান্তর একটি মূল কৌশল হতে পারে। সরকার অনলাইন ট্যাক্স দাখিল, ডিজিটাল জমির রেকর্ড, ইলেকট্রনিক জন্মনিবন্ধন, এনআইডি, পাসপোর্ট ইত্যাদি ই-গভর্নমেন্ট সেবা শক্তিশালী করতে পারে। ই-সেবা সরকারি সেবার সময় ও খরচ হ্রাস করে দক্ষতা বৃদ্ধি করতে পারে। এ ছাড়া এটি দূরবর্তী বা অনগ্রসর এলাকার নাগরিকদের জন্য সেবার অভিগম্যতা বাড়াতে পারে। ই-সেবা স্বচ্ছতা বাড়াতে পারে এবং নাগরিকদের সঙ্গে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে এটি খরচ সাশ্রয়ী এবং তথ্য ব্যবস্থাপনায় উন্নতি করতে পারে।
অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব ও রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে একই কর্মকর্তাকে দ্বৈত দায়িত্ব থেকে আলাদা করে একজন সচিবের নেতৃত্বে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ রাজস্বনীতি প্রণয়ন করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। নীতি বাস্তবায়নের জন্য তিনটি দপ্তর থাকবেÑ আয়কর অধিদপ্তর, শুল্ক ও আবগারি অধিদপ্তর এবং মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) অধিদপ্তর। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগকে নতুন বিশেষজ্ঞ জনবল দিয়ে শক্তিশালী করা হবে। নবগঠিত তিনটি অধিদপ্তরের জন্য আলাদা আলাদা মহাপরিচালক পদ সৃজন করে জনবল পুনর্বিন্যাস করা হবে।
একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছে, অতীতে বিভিন্ন সরকারের সময়ে যেসব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ভোট জালিয়াতি, অর্থ পাচার, দুর্নীতি এবং গণহত্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হয়ে জনপ্রশাসনের পেশাদারত্ব ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্তের জন্য মাঠপর্যায়ে জনমত রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
পদোন্নতির ক্ষেত্রে পুলিশ বা কোনো গোয়েন্দা বিভাগের কাছে রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চাওয়ার প্রথা বাতিল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, জনপ্রশাসনে রাজনীতিকীকরণ এ স্তর থেকেই শুরু হয়। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার ফলাফল ঘোষিত হওয়ার আগে কোনো প্রার্থীর পুলিশ ভেরিফিকেশন করা যাবে না। বিসিএস পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়ার পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত নিয়োগের আগে পুলিশ বিভাগের কাছে শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা আছে কি না, সে সম্পর্কে প্রতিবেদন চাইবে। প্রয়োজনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় দুর্নীতি দমন কমিশনে প্রতিবেদন চাইতে পারে।
বর্তমানে ভূমি রেজিস্ট্রেশন অফিস আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করে। অপরদিকে, ভূমি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিভিন্ন অফিস ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করে। ভূমি ব্যবস্থাপনা ও হস্তান্তর সংক্রান্ত দুটি আলাদা অফিস থাকায় জনদুর্ভোগ ও জটিলতা বৃদ্ধি পায়। এমতাবস্থায় দ্বৈত ব্যবস্থাপনা বাতিল করে ভূমি রেজিস্ট্রেশন অফিসকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্ত করার জন্য সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
উপজেলা পরিষদকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলার জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে উপজেলা পরিষদের অধীনে ন্যস্ত না রেখে তাকে শুধু সংরক্ষিত বিষয় ও বিধিবদ্ধ বিষয়াদি যেমন আইনশৃঙ্খলা, ভূমি ব্যবস্থাপনা, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ইত্যাদি দেখাশোনার ক্ষমতা দেওয়ার সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য তাকে রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে রাখা। একজন সিনিয়র সহকারী সচিব পদমর্যাদার অফিসারকে উপজেলা পরিষদের সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে।
পদোন্নতি না পেলেও বেতন দেওয়ার বিধান করা হচ্ছে। কোনো কর্মচারী যদি কোনো পদে পদোন্নতির সর্বোচ্চ ধাপে পৌঁছে যান এবং এরপর আর ইনক্রিমেন্ট না পান এবং তিনি যদি কোনো বিভাগীয় মামলায় গুরুতর দণ্ডিত না হয়ে থাকেন, তবে তাকে দুই বছর পর পরবর্তী বেতন স্কেল প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুসারে তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়নেও গুরুত্ব দেওয়া হবে। এতে বলা হয়, নাগরিকরা যাতে সহজে ও অবাধে চাহিদামতো সরকারি সেবা সংক্রান্ত তথ্য পেতে পারে, সেজন্য তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ এবং অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ১৯২৩ পর্যালোচনা ও সংশোধন করা যেতে পারে।
গ্রাম পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য স্বাস্থ্য খাতে নিয়োজিত বেসরকারি সংস্থাগুলোকে দায়িত্ব প্রদান করা যেতে পারে। সরকার কতগুলো সুনির্দিষ্ট শর্তে বাজেট বরাদ্দ দিয়ে কেন্দ্রগুলো পরিচালনা আউটসোর্স করবে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার, স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও অভিজ্ঞ বেসরকারি সদস্য নিয়ে একটি কমিটি এনজিওগুলোর কাজ তদারকি করতে পারে।
সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি গঠনে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এতে বলা হয়, কলেজ ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটিতে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা সংশ্লিষ্ট থাকায় আগে নানা রকম সমস্যা হতো। সাধারণ মানুষ সরকারি অফিসারদের নিয়ে বেসরকারি কলেজ ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটি গঠনের পক্ষে জোরালো মত দিয়েছেন। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনও নাগরিক সমাজের মতামতের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
মহাসড়কের পাশে স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট স্থাপনেরও উদ্যোগ নেওয়া হবে। এতে বলা হয়, বর্তমানে মহাসড়কের পেট্রল পাম্পগুলোতে টয়লেট থাকলেও সেগুলো স্বাস্থ্যসম্মত বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে না। অনেক জায়গায় মহিলাদের জন্য আলাদা টয়লেট নেই। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে।