× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ফুলের বাগানে সাপ, শিশুরা কোথায় যাবে

সাইফ বাবলু ও ফারহানা বহ্নি

প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০২৫ ১০:৩১ এএম

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

‘বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে’Ñ এই চিরসত্য বাণী আজ বাস্তবতায় ম্লান হয়ে যাচ্ছে। পরিবার, যা শিশুদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হওয়ার কথা, সেটিই এখন হয়ে উঠছে সবচেয়ে অনিরাপদ। পারিবারিক কলহ, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে শিশু হত্যা, বাবা-মায়ের অবৈধ সম্পর্ক, ধর্ষণ, গণধর্ষণ ও ধর্ষণ শেষে হত্যার মতো নৃশংস ঘটনায় শিশুরা প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। বিশেষ করে কন্যাশিশুরা সমাজের বিকৃত মানসিকতার ব্যক্তিদের যৌন লালসার শিকার হচ্ছে। পরিবার থেকে শুরু করে আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমেও শিশুদের যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে। আর এসব নৃশংসতার শিকার অধিকাংশ ক্ষেত্রে ৬ মাস থেকে ১২ বছর বয়সি কন্যাশিশুরা। 

অপরাধ বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, আমাদের দেশে শিশুদের জন্য নিরাপদ সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। শিশু সুরক্ষা আইন করেও শিশুদের বিশেষত কন্যাশিশুদের সুরক্ষা দেওয়া যাচ্ছে না। যেখানে নিজের ঘরই শিশুদের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠছে, সেখানে বাইরের পরিবেশ তাদের জন্য কতটা ভয়ংকর হতে পারে তার উদাহরণ সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো। সম্প্রতি কয়েকটি জেলায় পারিবারিক কলহ, অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করতে গিয়ে এবং সম্পত্তিগত বিরোধে শিশুদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। কন্যাশিশুকে ধর্ষণ, গণধর্ষণ এবং ধর্ষণের সময় হত্যার মতো লোমহর্ষক ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় কোনোটির এখন পর্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচার করা যায়নি। ফলে ঘটনা আরও বাড়ছে এবং সামনের দিকে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ইউনিসেফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১ থেকে ১৪ বছর বয়সি শিশুদের প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জন শিশু প্রতিমাসে সহিংস পরিস্থিতির শিকার হয়। শিশু সুরক্ষায় অগ্রগতি সত্ত্বেও সহিংসতা, নিপীড়ন ও শোষণ-বঞ্চনার কারণে লাখ লাখ শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা দেশের শিশুদের সুরক্ষায় ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। ২০১৩ সালে শিশু সুরক্ষা আইন করে সরকার। এরপর বাংলাদেশ পরিত্যাগকৃত শিশুর অধিকার সুরক্ষা (বিশেষ বিধান) আইন-২০২২ নামে আরেকটি আইন করা হয়। এসব আইনে শিশুদের সুরক্ষা ও অধিকারের কথা বলা আছে। কিন্তু বাস্তবে এসব আইন অনুযায়ী শিশুরা কোথাও সুরক্ষা বা অধিকার পায় না। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, শিশুদের সুরক্ষা করার দুটি ক্ষেত্র দেখি। প্রথমত. আইন দ্বারা। দ্বিতীয়ত. সামাজিক অনুশাসন দ্বারা অপরাধীদের সামাজিকভাবে চাপে রাখা। বাস্তবতা হচ্ছে এ দুটির কোনোটিরই প্রয়োগ বাংলাদেশে নেই। শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ বা হত্যার মতো ঘটনায় মামলা হলে কোনো না কোনোভাবে পার পেয়ে যায় অপরাধীরা। অন্যদিকে প্রান্তিক অর্থনীতির জনগোষ্ঠীর পরিবারগুলোর শিশুরা নির্যাতনের ঘটনায় সঠিক বিচার পায় না। আর এ জনগোষ্ঠীর শিশুরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতন, হত্যা বা হয়রানির শিকার হয়। 

তিনি বলেন, আমাদের দেশে শিশু ও নারীদের সুরক্ষায় ভূরি ভূরি আইন আছে। কিন্তু একটি আইনেরও সঠিক কোনো প্রয়োগ নেই। অতীতের সরকার থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ক্ষমতাচ্যুত সরকার নানা প্রয়োজনে অনেক আইন করেছে। কিন্তু কোনো আইনেই শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে শিশুদের প্রতি সহিংসতা আগের চেয়েও বেড়েছে। তিনি বলেন, শিশু নিপীড়ন বা হত্যাকারীরা দেখছে আইন আছে কিন্তু আইনের কোনো প্রয়োগ নেই। ফলে তারা মনে করে কোনো না কোনোভাবে পার পেয়ে যাবে। অতীতেও তাই হয়েছে বর্তমানেও হচ্ছে। ফলে মোটাদাগে বলা যায় বাংলাদেশ শিশুদের জন্য সুরক্ষার কোনো জায়গা এখনও তৈরি হয়নি। 

তিনি বলেন, আগে পরিবারগুলো ছিল যৌথ। সেখানে শিশুদের সুরক্ষা ছিল। কিন্তু এখন শিশুদের সুরক্ষা বাংলাদেশের কোথাও নেই। বিশেষ করে কন্যাশিশুরা কারও কাছেই নিরাপদ নয়। এর অন্যতম কারণ আকাশ সংস্কৃতি, পর্নোমুভি, ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় নানা ধরনের অরুচিকর কনটেন্ট থেকে বিকৃত রুচির লোকেরা প্রভাবিত হচ্ছে। ফলে তারা শিশুদের ধর্ষণ করছে। ধরা পড়ার ভয়ে ধর্ষণের পর হত্যা করছে। তিনি আরও বলেন, শিশুদের সুরক্ষা দিতে হলে আইনের প্রয়োগ যথাযথ করতে হবে। আলাদা ট্রাইব্যুনাল করে শিশু নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। 

বেসরকারি সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সমাজে প্রতিদিনই কোথাও না কোথায় শিশুরা নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। পারিবারিক কলহের জেরে, বাবা বা মায়ের অবৈধ সম্পর্ক, সম্পত্তিগত বিরোধ, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে শিশুদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। শুধু যে মেয়েরা, তা নয় বরং সব জেন্ডারের শিশুরাই এখন নিরাপত্তাহীনতায় বেড়ে উঠছে। 

তিনি আরও জানান, কন্যাশিশুরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে বেশি। সব ঘটনা গণমাধ্যমে আসে না। বিভিন্ন গণমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী অথবা মামলার হিসাব অনুযায়ী গত ১০ বছরে ধর্ষণ, গণধর্ষণ, যৌন হয়রানির শিকার হওয়াদের মধ্যে অধিকাংশ ৬ মাস থেকে ১২ বছর বয়সি কন্যাশিশু। তিনি বলেন, ঘটনার মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ প্রকাশ পায়। বাকি ঘটনাগুলো কোনো না কোনোভাবে ধামাচাপা পড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে পরিবার থেকে কখনও সমাজের প্রভাবশালীদের হুমকি আবার কখনও লোকলজ্জার ভয়ে ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা পড়ে।

তিনি আরও বলেন, শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় মামলার ক্ষেত্রে দেখা গেছে অধিকাংশ মামলায় বিচার হয় না। টাকা দিয়ে মামলার নিষ্পত্তি করা হয়। অথবা মামলা তুলে নিতে সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ থাকে। আবার বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে বিচার কার্যক্রমকে প্রভাবিত করার প্রবণতাও আমরা দেখেছি। তিনি বলেন, মূলত বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে সমাজে শিশুদের ওপর বর্বরতা বাড়ছে। পরিবার, নিকটাত্মীয় আর প্রতিবেশীর দ্বারাই সবচেয়ে বেশি যৌন নির্যাতন, ধর্ষণের মতো বর্বরতার শিকার হচ্ছে কন্যাশিশুরা। 

এ বিষয়ে গবেষক ও লেখক গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, দেশের আইন বা রাষ্ট্র কেন শিশুদের কথা ভাববে। শিশুরা তো ভোটার না! বাবা-মাও শিশুদের বোঝা মনে করে। শিশুদের হাতে একটা মোবাইল দিয়ে দেয় নিজেরা একটা মোবাইল নেয়। আমরা শিশু জন্মানোর পর বলি তাকে মানুষ করব। কেন! শিশুরা কি মানুষ না? যারা আমরা বলি মানুষ করব, তারা কতটুকু মানুষ হতে পেরেছি। আমরা কোথাও কিছু শিশুদের কথা মাথায় রেখে করি না। টয়লেট বড়দের কথা চিন্তা করে বানানো হয়। বাসায় মেহমান এলে বড়দের রান্না করা হয়। শিশুদের পছন্দ অনুযায়ী কে রান্না করে? আমাদের চিন্তার মধ্যে শিশু নেই। আমাদের চিন্তায়-মননে শিশুদের জন্য রয়েছে বৈষম্য। একটা শিশুকে কীভাবে সেভ থাকতে হবে তা বুঝতে হবে। যে কেউ শিশুদের গালে, ঠোঁটে চুমু দিচ্ছে। যে যেভাবে ইচ্ছে ট্রিট করছে। শিশুটার কি মনে হচ্ছে তা কতজন ভাবছি? শিশুদের জন্য কষ্টকর পরিবেশ এটা। জায়গাটা নিরাপদ না। তার সম্মতি ছাড়া আমরা কিছুই করতে পারি না। শিশুর প্রতি সংবেদনশীল হতে হবে। তিনি বলেন, গুড টাচ, বেড টাচ কিংবা শিশু বিকাশে যে শিক্ষা দেওয়া উচিত তা যদি আমি নিজেই না বুঝি, তবে বোঝাব কীভাবে। বড়দের মগজে বিষয়গুলো থাকতে হবে। শিশুদের নিয়ে সচেতনতামূলক চলচ্চিত্র, নাটক, সিনেমা বানাতে হবে। শিশুরা যেন আমাদের বোঝা না হয়ে যায়। আমরা যেন তাদের প্রতি বিরক্ত না হই। 

পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী পুলিশ মহাপরিদর্শক (এআইজি মিডিয়া) ইনামুল হক সাগর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, পুলিশ সদর দপ্তরে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন’ নামে আলাদা একটি সেল রয়েছে। এ সেলের মাধ্যমে সারা দেশে নির্যাতনের শিকার শিশু ও নারীদের বিষয়ে যেসব মামলা হয় সেগুলো মনিটরিং করা হয়। তিনি বলেন, সারা দেশে সাড়ে ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার বিট পুলিশিং কার্যক্রম রয়েছে। প্রতিটি বিটে একজন সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই), অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর (এএসআই) এবং কনস্টেবল রয়েছে। এসব বিটের মাধ্যমে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তারা প্রতিনিয়ত নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে সামাজিক  জনসচেতনতা তৈরি এবং অপরাধের ক্ষেত্রে কী ধরনের সাজা হয় সেই বার্তাগুলো দিয়ে থাকে।

এআইজি সাগর আরও জানান, ২০২১ সালে পুলিশ সদর দপ্তর দেশের প্রতিটি থানায় নারী ও শিশু হেল্পডেস্ক চালু করেছিল। এসব হেল্পডেস্ক চালুর উদ্দেশ্য ছিল নির্যাতন বা সহিংসতার শিকার শিশু বা নারীরা যাতে স্বচ্ছন্দে তাদের অভিযোগগুলো জানাতে পারে। প্রতিটি হেল্পডেস্কে নারী এসআই আলাদাভাবে নিয়োগ করা হয়েছে। ওই হেল্পডেস্ক চালুর পর থেকে পুলিশ চেষ্টা করে যাচ্ছে নারী ও শিশু বিশেষ করে শিশুর প্রতি সহিংসতা যাতে নিয়ন্ত্রণে বা পুরোপুরি বন্ধ করা যায়। 

একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা গেছে শিশুরা সবচেয়ে বেশি পারিবারিক নির্যাতন বা সহিংসতার শিকার হয়। পারিবারিক কলহে শিশুরা বাবা-মায়ের দ্বারা খুন হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এসব ঘটনায় পুলিশ অনেক সময় বাদী হয়ে মামলা করে। শিশু নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ, যৌন হয়রানির মতো মামলাগুলো পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে। বিভিন্ন সামাজিক অনুসন্ধানে শিশু নির্যাতন বন্ধে মানুষকে সচেতন করা হয়। তারপরও শিশুরা নির্যাতন, হত্যার শিকার হচ্ছে ।এটি বন্ধ করতে হলে প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। 

বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে পাশবিক নির্যাতনের শিকার আট বছরের শিশুটি হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। এ ঘটনায় মামলা করেছেন শিশুটির মা। মামলার এজাহারে তিনি অভিযোগ করেন, বড় মেয়ের স্বামীর সহায়তায় তার বাবা (শ্বশুর) শিশুটিকে ধর্ষণ করেন। শিশুটির অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানান চিকিৎসকরা। এ ঘটনার পর ধর্ষণের প্রতিবাদে আবারও উত্তাল দেশ। প্রশ্ন উঠছে ঘরে-বাইরে কোথাও শিশুরা কেন নিরাপদ নয়? এর আগে একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হয় আরেক শিশু। শিশুটি ফুলবাগান থেকে ফুল সংগ্রহ করছিল, তখন তাকে জোর করে ঘরে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়। এ সময় শিশুটির চিৎকারে ফজরের নামাজ পড়ে বাড়িতে যাওয়া কয়েকজন মুসল্লি ওই বাড়িতে গিয়ে শিশুটিকে উদ্ধার করে বাসায় নিয়ে আসে। শুধু ধর্ষণ নয়, পারিবারিক সহিংসতার শিকারও শিশুরা। গত নভেম্বরে পারিবারিক কলহ ও আর্থিক অনটনের জেরে রাজধানীর পল্লবীতে দুই শিশুকে গলা কেটে হত্যা করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন বাবা মো. আহাদ। গত মাসের ফেব্রুয়ারিতে মৌলভীবাজারে বাবার হাতে নির্মমভাবে খুন হয় মাহিদ নামে ৭ বছরের এক শিশু। ঘটনার পর শিশুর বাবা খোকন মিয়া ও দাদি হাওয়া বেগম নিজ ঘরে লাশ রেখে আত্মগোপন করেন। এর আগে ২০১৮ সালে ১০ বছরের শিশু স্কুলছাত্র জয়ন্ত চন্দ্র দাসের হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ দেখা দেয় দেশে। পরিবারের লোকজন অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান পাননি। পরদিন জয়ন্তর বাবা শ্রী চৈতন্যকে জানান, তার ছেলে জয়ন্তকে জীবন্ত ফেরত পেতে হলে পাঁচ লাখ টাকা দিতে হবে। কিন্তু পরে ওই মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। পরে জয়ন্তকে শ্বাসরোধে হত্যার পর লাশ ঘরের ভেতরে রেখে যায়। 

ধর্ষণের শিকার অধিকাংই শিশু ও কিশোরী

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, গত ১০ বছরে যত ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে অর্ধেকের বেশি ঘটনায় কন্যাশিশু ৬ মাস থেকে শুরু করে ৫ বছর, ৬ বছর থেকে শুরু করে ১২ বছর, ১৩ বছর থেকে শুরু করে ১৮ বছর পর্যন্ত ৩টি বয়সি শিশু ও কিশোরীদের বয়সভেদে এ পরিসংখ্যান মিলেছে। অর্থাৎ গত ১০ বছরে ধর্ষণের ঘটনায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশই কন্যাশিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। 

বেসরকারি সংস্থা আসকের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৪ সালে ৭০৭ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এ সময় ৬৮ জনকে হত্যা করা হয়েছে। মোট ধর্ষণের ঘটনায় ৬ বছরের শিশু ছিল ৩৫ জন। ৭ থেকে ১২ বছর বয়সি শিশু ছিল ৯৯ জন এবং ৬২ জন ১৩ থেকে ১৮ বয়সি। সব মিলিয়ে ১৯৬ জন শিশু ও কিশোরী ধর্ষণ, গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছে ২৩ জন শিশু ও কিশোরীকে। ২০১৫ সালে ৪৪৬ জন ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছে ৬০ জনকে। এর মধ্যে ৫ বছরের নিচ থেকে শুরু করে ১৮ বছর পর্যন্ত ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩৩৫ জন। ৬ থেকে ১৩ বছর পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার শিশু রয়েছে ২১৬ জন। ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছে ২৯ জন শিশু ও কিশোরীকে। 

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে পারিবারিক সহিংসতা, ধর্ষণ, আত্মহত্যার ঘটনায় ২ হাজার ৭৬০ শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালে ৫৭৪ জন শিশু, ২০২৩ সালে ৪৮৫ জন, ২০২২ সালে ৫১৬ জন, ২০২১ সালে ৫৯৬ জন, ২০২০ সালে ৫৮৯ জন শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১২৮ জন শিশুকে। ২০২৪ সালে ১৯, ২০২৩ সালে ২৯, ২০২২ সালে ১৭, ২০২১ সালে ৩১, ২০২০ সালে ৩২ জন শিশু। এ ছাড়া গত পাঁচ বছরে সহিংসতার শিকার হয়েছে ৫ হাজার ৯১৫ জন শিশু। ২০২০ সালে ১ হাজার ৭১৮ জন, ২০২১ সালে ১ হাজার ৪২৬ জন, ২০২২ সালে ১ হাজার ৮৮ জন শিশু, ২০২৩ সালে ১ হাজার ১৩ শিশু, ২০২৪ সালে ৬৭০ শিশু। তাদের মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ২ হাজার ৯০১ জন শিশু। ২০২৪ সালে ২৩৪, ২০২৩ সালে ৩১৪, ২০২২ সালে ৫৬১, ২০২১ সালে ৭৭৪, ২০২০ সালে ১০১৮ জন শিশু। এ ছাড়া ছেলেশিশুরাও সহিংসতা থেকে বাদ যায়নি। যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে ২৯৩ জন ছেলেশিশু। ২০২৪ সালে ৩৬, ২০২৩ সালে ৭৫, ২০২২ সালে ৫২, ২০২১ সালে ৭৮, ২০২০ সালে ৫২ জন ছেলেশিশু যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে। বারবার এত ঘটনার পরেও শিশু নির্যাতন থামছে না। 

মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, দেশে আইন আছে শুধু কাগজে-কলমে। শিশুদের নিয়ে আইনে যা আছে বাস্তবে তা দেখা যায় না। আমাদের সমস্যা হচ্ছে শিশু সনদ আছে। তাতে আমরা স্বাক্ষর করেছি। শুধু ওইটুকুই। আমাদের আইনের ভিত্তিতে দেশ চলে না। শুধু আইন নয়, শিক্ষা ও পরিবারকেও ভূমিকা রাখতে হবে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, আমাদের পেরেন্টিং যথাযথ নয়। শিশুদের কথা আমরা ভাবিই না। তাদেরকে গুড টাচ, বেড টাচ কী শেখানো হয় না। তাদের পড়াশোনায় যৌন শিক্ষা থাকলে আপত্তি আসে। এদিকে বাসায় ইউটিউব, টিভি, মোবাইলে শিশুদের সময় কাটে। তাদের বিকাশটাও সঠিকভাবে হচ্ছে না। আমাদের সমাজের যে দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছে এটা যেমন ভয়াবহ তেমনি সোসাইটিও ভালনারেবল হয়ে আছে, অস্থিরতাও আছে। 

নারী সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক বলেন, সব ধরনের সহিংসতার দায় রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র নিরাপত্তা দিতে পারছে না। পরিবার সারাক্ষণ পাহারা দিতে পারবে না। এসব নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ দরকার। নারীকে সম্মান, শিশুদের যত্ন করা শেখাতে হবে। সাম্প্রতিক সময়েই এসব ঘটনা ঘটছে তা নয় আগেও ঘটেছে। রাজনৈতিক কারণেও আক্রমণ নারী ও শিশুর দিকে যায়। সারা বছরই এমন ঘটনা ঘটছে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা