আ ন ম আমিনুর রহমান
প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০২৫ ১২:৩০ পিএম
কেরানীগঞ্জের ঘাটারচরের মেঘশিরীষ গাছে বিরল শালিক লাল ময়না। লেখক
এবারের শীতের শুরুতে একটি বিরল প্রজাতির শালিকের দেখা মিলল খোদ ঢাকা শহরে। তবে অত্যন্ত ব্যস্ত থাকায় ওকে দেখতে যেতে পারলাম না। নাইকন ফ্যান ক্লাবের আমন্ত্রণে অতিথি হয়ে ১২ ফেব্রুয়ারি রাতের লঞ্চে চর কুকরি-মুকরির পথে রওনা হলাম। পরদিন কুকরি-মুকরির পাশের দ্বীপ ঢালচরে আমাদের তাঁবু টাঙানো হলো। বঙ্গোপসাগরের এই দ্বীপে নেটের বড়ই সমস্যা। বিকালে খানিকটা নেট আসতেই ফেসবুক পোস্টে বিরল প্রজাতির আরেকটি শালিককে ঢাকার উপকণ্ঠে কেরানীগঞ্জের ঘাটারচরে দেখতে পাওয়ার কথা জানতে পারলাম। বিরল পাখিটিকে ইতঃপূর্বে সেন্ট মার্টিন, হাতিয়া, সোনাদিয়া ও সুন্দরবনে অর্থাৎ দেশের দ্বীপ বা উপকূলীয় এলাকা বাদে মূল-ভূখণ্ডের গভীরে কালেঙ্গা ছাড়া আর কোথাও দেখা গেছে বলে শুনিনি। ২০১৩ সালের ১৬ মার্চ হবিগঞ্জের কালেঙ্গা বন্য প্রাণী অভয়াণ্যে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য ওকে দেখেছিলাম। ঠিক পাঁচ বছর পর ২৪ ফেব্রুয়ারি পাখিটিকে দ্বিতীয়বারের মতো দেখলাম শ্রীমঙ্গলের বাইক্কা বিল পক্ষী অভয়ারণ্যের শিমুল গাছে। এরপর বহু দিন ওকে দেখিনি।
চর কুকরি-মুকরি থেকে ফিরে সঙ্গে সঙ্গেই ঘাটারচর যেতে পারলাম না যদিও পক্ষী আলোকচিত্রী ব্যাংকার তরিকুল রনি আমাকে বার বার অনুরোধ করছিল। শেষ পর্যন্ত সপ্তাহখানেক পর ২২ ফেব্রুয়ারি দুপুর আড়াইটার দিকে রনিকে নিয়ে ঘাটারচর রওনা হলাম। তবে পাখিটিকে দেখা যাওয়ার স্থান রমজান বাস কাউন্টারের সামনে পৌঁছতেই প্রায় চারটা বেজে গেল। কিছুক্ষণ এদিকে ওদিক খোঁজাখুঁজি করলাম। কিন্তু ওর দেখা পেলাম না। অবশেষে বিকাল ৩:৫৩টায় এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। কালভার্টের পাশের রেইনট্রি বা মেঘশিরীষ গাছে এসে পাখিটি বসল। কিন্তু ওর ছটফটানি ও সূর্যের আলোর বিপরীতে অবস্থান করায় ভালো ছবি তোলা গেল না। এরপর আরও প্রায় ঘণ্টাখানেক থাকলাম। এই সময়ের মধ্যে কয়েকবার তাকে আসতে দেখা গেল। তবে তার অস্থিরতার কারণে তেমন কোনো ভালো ছবি তুলতে পারলাম না।
এতক্ষণ বিরল যে শালিকটির কথা বললাম সে হলো এদেশের অতি বিরল এক পরিযায়ী পাখি লাল ময়না। কেতাবি নাম গোলাপি কাঠশালিক বা গোলাপি শালিক। ইংরেজি নাম Rosy Starling, Rose-colored Starling or Rose-colored Pastor। Sturnidae পরিবারের এই সদস্যের বৈজ্ঞানিক নাম Pastor roseus। মধ্য এশিয়া, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার পাখিটিকে শীতে এদেশে দেখা যায়।
লাল ময়না আকারে ভাতশালিক, ঝুঁটি শালিক বা গো-শলিকের মতোই ২৩ সেন্টিমিটার লম্বা। ওজন প্রায় ৬৪ গ্রাম। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম। শুধু প্রজনন মৌসুমে পুরুষের দেহের রঙ কিছুটা উজ্জ্বল হয়। মাথার ঝুঁটিটিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্ত্রীর ঝুঁটি কিছুটা ছোট। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির দেহের গোলাপি রঙের মাধ্যমে সহজেই অন্য প্রজাতির শালিক থেকে পৃথক করা যায়। মাথা, মুখমণ্ডল, ঘাড়, গলা, ডানা ও লেজ চকচকে কালো। পিঠ, বুক, পেট ও তলপেট হালকা গোলাপি। ঠোঁট হলুদ। পা ও নখ উজ্জ্বল গোলাপি। অল্পবয়স্ক পাখির দেহের রঙ বালু-বাদামি ও তাতে কিছুটা ছিট ছিট দেখা যায়।
লাল ময়না বিরল ও অনিয়মিত পরিযায়ী পাখি। এরা পারিবারিক বা বড় দলে কৃষিজমি, স্যাঁতসেঁতে তৃণভূমি, ফুল-ফলের বাগান, কাঁটা-ঝোঁপ ইত্যাদিতে বিচরণ করে। এরা পোকামাকড়, ফল, ফুল-ফলের রস, শস্যদানা ইত্যাদি খেতে পছন্দ করে। আর তাই খাবারের খোঁজে চষাজমি, ফুল বা ফলের বাগানের আশপাশে ঘুরে বেড়ায়। উচ্চস্বরে ও পরিষ্কারভাবে ‘চিক্-ইক্-ইক্-ইক্’ বা ‘কি-কি-কি’ শব্দে ডাকে।
সাধারণত মে থেকে জুন এদের প্রজনন করে। এদের মূল আবাস এলাকা অর্থাৎ পূর্ব ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য-এশিয়ার উঁচু ও খাড়া পর্বতের গায়ে গর্ত করে বা ফাটলে এদেশের গাঙ শালিকের মতো দলবেঁধে বিশাল কলোনি তৈরি করে বাসা বানায়। স্ত্রী তাতে ৩ থেকে ৫টি ফিকে নীল ডিম পাড়ে। আয়ুষ্কাল ৪ থেকে ৫ বছর।
এদেশে এখনও বিরল এই শালিক সম্পর্কে তথ্যের অপ্রতুলতা রয়েছে। তাই এ সম্পর্কে গবেষণা হওয়া দরকার। লাল ময়না এদেশে আরও বেশি সংখ্যায় আসুক ও ভালোভাবে বেঁচে থাকুক এটাই আমাদের কামনা।