× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ঢাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ ভয়াবহ সংকটের মুখে

রাহাত হুসাইন

প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৩:৪৩ পিএম

গ্রাফিক্স : প্রবা

গ্রাফিক্স : প্রবা

গাড়ি চলাচল করলে দেখা যায় না সড়ক। ধুলার দাপটে ধূসর হয়ে যায় চারপাশ। গাড়ি যত দ্রুত চলে তত বেশি ধুলা ওড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ফিটনেসহীন গাড়ির কালো ধোঁয়া। সড়কের ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে গিয়ে অনেকে নাক চেপে ধরছেন। কেউ কেউ আবার মাস্কও পরছেন। মিডিয়ানের গাছগুলোতেও জমেছে ধুলোর আস্তরণ। 

রাজধানীর টিটিপাড়া, কমলাপুর সড়কের চিত্র এটি। সড়কের ফুটপাতে চায়ের দোকান দিয়েছেন আল-আমিন। দোকানের সামনে ঝুলানো রুটি মোড়ানো পলিথিন, কলা ও বিস্কুটের বয়ামগুলোতেও অনবরত জমছে ধুলা। দোকানি আল-আমিন সারাক্ষণ মাস্ক পরে থাকছেন। তবে মাথা ঢাকা না থাকায় ধুলার আস্তর পড়ে চুলগুলো ধূসর হয়ে আছে। তিনি কিছু সময় পর পর ছেঁড়া কাপড় দিয়ে সেগুলো পরিষ্কার করছেন। 

এই প্রতিবেদককে আল-আমিন বললেন, ‘ব্যস্ততম সামনের সড়কটিতে দীর্ঘদিন ধরেই সংস্কার কাজ চলছে। তার মাঝেই সারাক্ষণ চলছে গাড়ি। অধিকাংশ গাড়িই আবার কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে যাচ্ছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। মাস্ক পরে কোনোমতে টিকে আছি। কাস্টমারও কমে গেছে। ধুলার কারণে একটা সময় নিজেকেই অচেনা মনে হয়।’

টিটিপাড়া, কমলাপুর সড়কের মতো চিত্র এখন রাজধানীর যত্রতত্র। অপরিকল্পিত ও সমন্বয়হীন রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কারণে অনেক এলাকার রাস্তাঘাট জন ও যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে আছে। সংস্কার কাজে সেই বরাবরের ধীরগতি। ফলে প্রতিনিয়ত ধুলাবালি আর যানবাহনের কালো ধোঁয়া মিশছে ঢাকার বাতাসে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বায়ুর মান। আর তা নগরের বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

আন্তর্জাতিক বায়ুমান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের পর্যবেক্ষণে বায়ুদূষণের বিশ্ব মানদণ্ডে ঢাকা প্রায়শ তালিকার প্রথম আবার কখনও দ্বিতীয় অবস্থানে থাকছে। গেল ১৫ ফেব্রুয়ারি ছুটির দিনও বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষে ছিল ঢাকার অবস্থান। 

ঢাকার বায়ুদূষণের কারণগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ ফিটনেসবিহীন গাড়ির কালো ধোঁয়া, শিল্প-কারখানার ধোঁয়া, উন্মুক্তভাবে নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা, ল্যান্ডফিল থেকে নিঃসৃত মিথেন গ্যাস এবং সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি থেকে উড়ে আসা ধুলাবালি। এসব দূষণকারী উপাদান প্রতিনিয়ত ঢাকার বাতাসে মিশে বায়ুর মান আরও খারাপ করে তুলছে।

তবে কোন উৎস থেকে কী পরিমাণে বায়ুদূষণ হচ্ছে তার কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থার কাছে।

পরিবেশগত ভয়াবহ সংকটের মুখে থাকা ঢাকা রক্ষায় নেই আন্তঃসংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ। রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে পরিবেশকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। পরিবেশ মন্ত্রণালয়, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), সিটি করপোরেশন, ঢাকা ওয়াসা ও বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) এ সংস্থাগুলো সমন্বয়হীনভাবে নিজেদের মতো করে কাজ করছে। ফলে এক সংস্থা সড়ক কেটে রাস্তা সংস্কারের পরপরই আরেক প্রতিষ্ঠান গাঁইতি-শাবল নিয়ে রাস্তার ওপর হামলে পড়ছে। এ কারণে একদিকে রাষ্ট্রের আর্থিক অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে সারা বছর খোঁড়াখুঁড়ির কারণে জনদুর্ভোগ চরমে উঠছে। পরিবেশ দূষণও চলছে বিরামহীন।

পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন আন্দোলনের (পরিজা) সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস আহমেদ উজ্জ্বল বলেন, ‘ঢাকা শহরে পরিবেশ বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় কারণ হলো আন্তঃসংস্থাগুলোর কাজে সমন্বয়হীনতা। রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে পরিবেশকে একটি অগুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা হয় বরাবরই। নাগরিকদের চরম অসচেতনতাও আমাদের পরিবেশ ধ্বংসের অন্যতম কারণ। পানি, বায়ুসহ সার্বিক পরিবেশ দূষণ থেকে রক্ষা পেতে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।’ 

প্রকৃতিক পরিবেশ, সবুজ-জলাশয় কমে যাওয়ায় যেকোনো নির্ণায়কের মাপকাঠিতে ঢাকা বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স’র (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘গাছপালা কমে যাওয়ায় বায়ু ও পানিদূষণ বেড়ে যাচ্ছে। কংক্রিটের কারণে গ্রীষ্মকালে শহরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়। সবুজ অঞ্চলে ফল-ফুলের বাইরেও বিভিন্ন ধরনের পাখি ও প্রাণী থাকে। বাস্তুসংস্থানের স্বাভাবিকতার জন্যই মানুষের পাশাপাশি গাছপালা ও অন্যান্য প্রাণী থাকা প্রয়োজন। যত সবুজ কমে যাবে আমাদের জীববৈচিত্র্যের ‍ওপর তত নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’

ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর ঢাকার পরিবেশ রক্ষায় নড়েচড়ে বসেছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। ঢাকাকে বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব করতে নতুন অ্যাকশন প্ল্যান করছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। তাদের প্ল্যানিংয়ের মধ্যে রয়েছেÑ পুকুর সংস্কার ও পুনঃখনন, দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে নির্মাণ, গাছ লাগানো, রাস্তা প্রশস্তকরণ, ওপেন স্পেস তৈরি, দখলকৃত পুকুরের জায়গা উদ্ধার। 

ঢাকার পরিবেশ রক্ষায় আন্তঃসংস্থাগুলোর মধ্যে বৈঠক হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রাজউক চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মো. সিদ্দিকুর রহমান। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে নতুন অ্যাকশন প্ল্যান করছে রাজউক। অন্তর্বর্তী সরকারের এ সময় অন্য সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় হচ্ছে। পরিকল্পনা ‍অনুযায়ী সংস্থাগুলোর কাজ বণ্টন করে দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে আমরা সবাই মিলে ছয়টি খাল সংস্কারের কাজ শুরু করেছি। ঢাকার জেলা প্রশাসক ও রাজউকের যৌথ উদ্যোগে নগরীতে ৫৫টি খাস ও ৭টি ভিপি পুকুর করা হবে। সেজন্য জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন পড়বে না। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী ঢাকার জন্য নির্ধারিত সবুজায়ন গড়ে তোলা এবং শহরের জলাবদ্ধতা রোধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বলেন, ‘ঢাকাকে একটি বাসযোগ্য শহর করতে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, পরিবেশ যেন ভালো থাকে, বাতাস বিশুদ্ধ হয়, নদী-খালগুলো বাঁচে, সবার জন্য উন্মুক্ত জায়গা থাকে; যেখানে শিশুরা খেলতে পারে, মানুষ হাঁটতে ও বসতে পারে, রাস্তা, ড্রেনেজ, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঠিক থাকে। সেভাবেই কাজ করব।’

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ঢাকার পরিবেশ নিয়ে কোনো মন্ত্রণালয়ের ভ্রূক্ষেপ নেই। যদিও এ ক্ষেত্রে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের নামটা আসে কিন্তু পৃথিবীতে কোথাও পরিবেশ মন্ত্রণালয় বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে না। বিভিন্ন দেশে মন্ত্রণালয়ের নাম হচ্ছে পরিকল্পনা ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়। এর কারণ হচ্ছে পরিকল্পনার গাফিলতির কারণে যাতে পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে পরিবেশ মন্ত্রণালয় শুধু পরিবেশগত ছাড়পত্র নিয়ে ব্যস্ত থাকে, এটাই বাস্তবতা। ইতোমধ্যে ঢাকার খাল-বিল উধাও হয়ে গেছে, খেলার মাঠগুলো বেদখল হয়ে গেছে, সবুজ নষ্ট করে কংক্রিটের ভবন হয়েছে। ভবনের আশপাশে ৪০ ভাগ ফাঁকা রাখার কথা, সেটাও হচ্ছে না। এসব কিছু এখন পরিবেশের জন্য অভিঘাত হয়ে ফিরে আসছে। ঢাকার পরিবেশ নিয়ে সমন্বয়হীন কাজ হচ্ছে, কেউ কাউকে মানছে না। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের এই সময় আমরা আশাবাদী, সবাই সমন্বিতভবে কাজ করবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা