ফারহানা বহ্নি
প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ০৯:১১ এএম
আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ০৯:৪৯ এএম
ছবি : সংগৃহীত
‘রক্তে আমার আবার প্রলয় দোলা/ফাল্গুন আজ চিত্ত আত্মভোলা/আমি কি ভুলিতে পারি/একুশে ফেব্রুয়ারি।’ বছর ঘুরে আবার সেই দিনটি এসেছে। চেতনার পথে দ্বিধাহীন অভিযাত্রীর বেশে বাঙালিকে সর্বদা চলার প্রেরণা জোগায় একুশ। আজ সেই অমর একুশে ফেব্রুয়ারি। মহান শহীদ দিবস। ভাষার অধিকারের পক্ষে লড়াইয়ের পাশাপাশি, ঔপনিবেশিক প্রভুত্ব ও শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে একুশ ছিল প্রথম প্রতিরোধ। বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রথম লড়াই করতে শিখিয়েছিল একুশ। ইতিহাসে নানাভাবে এদেশের মানুষের আন্দোলন, সংগ্রামে ফিরে ফিরে এসেছে একুশে ফেব্রুয়ারি।
আজ থেকে ৭৩ বছর আগে নিদারুণ বৈষম্যের বিরুদ্ধেই লড়াই করেছিল এই ভূখণ্ডের ছাত্র-জনতা। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথ হয়ে উঠেছিল বিক্ষোভে উত্তাল। পাকিস্তানি শাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ১৪৪ ধারা ভেঙে মাতৃভাষার মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে পথে নেমে এসেছিল ছাত্র, শিক্ষক, শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সি অসংখ্য মানুষ। সেদিন তারা বজ্রকণ্ঠে আওয়াজ তুলেছিল, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।’ সেই আন্দোলন দমানোর জন্য গুলি চালানো হয়েছিল মিছিলে। আর সেই আঘাত থেকে নিঃসৃত রক্তস্রোত বেয়ে সূচিত হয় নতুন এক ইতিহাস। যার প্রেক্ষাপট রচিত হতে থাকে পাকিস্তানের জন্মের পরপরই, উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার হীন চেষ্টার বিরোধিতার মধ্য দিয়ে। ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের যারা ছাত্র, তাদের অধিকাংশই সরকারি চাকরিতে যেতেন। যারা সরকারি চাকরি করতেন, এর প্রত্যক্ষ প্রভাব তাদের ওপরই পড়ত। তাদের পাকিস্তানের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হওয়ার একটা আশঙ্কা ছিল। সেই বৈষম্য নিরসনেই প্রতিবাদ জানায় ছাত্র-জনতা। পাকিস্তানের শাসকদের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে তারা।
ভাষা আন্দোলনের সেই সংগ্রামী চেতনাকে বুকে ধারণ করে একে একে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। স্বাধীন দেশেও মানুষের অধিকার আদায়ের বহু আন্দোলনে প্রেরণা জুগিয়েছে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। ১৯৮২ সালে শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলনও একসময় স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনে পরিণত হয়। সর্বশেষ চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান এদেশের মানুষের সংগ্রামী ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা হিসেবে বিধৃত হয়েছে।
আমাদের ভাষা আন্দোলনের যে উদ্দেশ্য তা বাস্তবায়ন হয়নি, মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়নি, শহীদের রক্তের ত্যাগে পাওয়া দেশে এখনও সামাজিক মুক্তি আসেনিÑ এমনটাই মনে করেন ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, আমাদের এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই। বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হবে এটাই আশা ছিল। কিন্তু তা হয়নি। বিগত ৫৩ বছরের ইতিহাস নিরবচ্ছিন্ন স্বৈরশাসনের ইতিহাস। স্বাধীনতা আগেও এসেছে, কিন্তু মুক্তি ঘটেনি। কোটাবৈষম্য নিয়ে যে আন্দোলন হয়েছে, তাতে তরুণরা যুক্ত হয়েছে। কারণ আমাদের এখানে যে ধরনের উন্নয়ন হয়েছে, তাতে কর্মসংস্থান ঘটেনি। আজকে বৈষম্যের কথা বলতে হলে আমাদের পুঁজিবাদের কথা বলতে হবে, সাম্রাজ্যবাদের কথা বলতে হবে। এই বৈষম্যের সূত্র তো পুঁজিবাদ। এই কাঠামো থাকলে তো আমাদের মুক্তি নেই।
অধ্যাপক ও প্রাবন্ধিক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, মানুষ যতদিন থাকবে বৈষম্য ততদিন থাকবে। বৈষম্য নিরসনের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা, শিক্ষাক্ষেত্রে সুবিধাগুলো নিশ্চিত করতে হবে। সব বৈষম্য নিরসন করা সম্ভব নয়। তবে নিরসনের চেষ্টাটা মহৎ চেষ্টা। সেই চেষ্টা করে যেতে হবে। যারা সমতার দিকে যেতে চান তারা সেই লড়াইটা করবে। আন্দোলন সংগ্রাম হবে।
জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ১৯৫২ সালের আন্দোলনই বুনে দিয়েছিল স্বাধিকারের বীজ, যা থেকে আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা এবং সবশেষ জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান। ভাষা নিয়ে এই আন্দোলনের শুরুটা হয়েছিল কিন্তু সরকারি চাকরিতে বাংলার ছাত্ররা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হবে কি না সেই আশঙ্কা থেকে। এটা ছিল বৈষম্য। কিন্তু বৈষম্য নিরসন হয়নি, বেড়েছে। জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হয়নি। ধীরে ধীরে বৈষম্য বেড়েছে।
ভাষাবিজ্ঞানী অধ্যাপক আবুল মনসুর মুহম্মদ আবু মুসা বলেন, বারবার স্বৈরাচার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তাই বারবার পতনের আন্দোলনে মানুষ পথে নেমেছে। স্বৈরাচার বলতে বলতে মানুষ নিজেই স্বৈরাচার হয়ে যায়। এটা সামাজিক ব্যাপার। মানুষ বাড়লে সমস্যা বাড়বে। যুক্তিহীন সমালোচনা না করে যৌক্তিক সমালোচনা করতে হবে। সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।