প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ২৩:২৩ পিএম
সাবেক ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদ। ছবি: সংগৃহীত
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা প্রয়াত এইচটি ইমামের ছেলে এবং সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য তানভীর ইমাম ও তার স্ত্রী-সন্তানের ৬৯টি ব্যাংক হিসাব জব্দ করার আদেশ দিয়েছে আদালত। অন্যদিকে পুলিশের আলোচিত কর্মকর্তা ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদ ও তার ভাইয়ের যাবতীয় সম্পদ জব্দ করা হয়েছে।
এছাড়া পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) গাজী মো. মোজাম্মেল হকের সম্পদ জব্দের আদেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে তার স্ত্রী ফারজানা মোজাম্মেল ও মেয়ে গাজী বুশরা তাবাসসুমের নামে থাকা ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশ দিয়েছে আদালত।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এসব জব্দের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
তানভীর ইমাম, তার স্ত্রী মাহিন ইমাম ও মেয়ে মানিজা ইসমত ইমামের নামে থাকা ৬৯টি হিসাবে ২০ কোটি ২৯ লাখ ৭৯ হাজার টাকা রয়েছে। এর মধ্যে তানভীরের নামে ৫৮টি, তার স্ত্রী মাহিনের তিনটি ও মেয়ে মনিজার আটটি হিসাব রয়েছে। এছাড়া তাদের নামে থাকা স্থাবর সম্পদ জব্দেরও আদেশ দিয়েছে আদালত।
দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ মো. জাকির হোসেন গালিবের আদালত শুনানি শেষে এই আদেশ দেয়। জব্দ হওয়া স্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে তানভীর ইমামের নামে গুলশানে দুটি ফ্লোরের ৩০ শতাংশ, যার প্রদর্শিত মূল্য ২৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং উত্তরার ১৫০৮ বর্গফুটের অ্যাপার্টমেন্ট ও তার তিনটি গাড়ি। তানভীরের স্ত্রী মাহিনের বসুন্ধরায় ৬০ লাখ টাকা মূল্যের অ্যাপার্টমেন্ট এবং তাদের মেয়ে মানিজার এক কোটি ২৫ লাখ টাকা মূল্যের বিল্ডিং টেকনোলজি অ্যান্ড আইডিয়াস লিমিটেডের পার্ক প্যানোরোমা প্রকল্প জব্দ করা হয়েছে।
দুদকের সহকারী পরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, দুদকের পক্ষে স্থাবর সম্পদ জব্দ ও অস্থাবর সম্পদ অবরুদ্ধ চেয়ে আবেদন করা হয়। আদালত আবেদন মঞ্জুর করে আদেশ দেন। আবেদনে দুদক বলেছে, তানভীর ইমামের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাবেক প্রধান হারুন অর রশীদ ও তার ভাই এ বি এম শাহরিয়ারের নামে থাকা ১৩০ বিঘা জমি জব্দের আদেশ দিয়েছে আদালত। এর মধ্যে হারুনের নামে ১০০ বিঘা জমি ও তার ভাই শাহরিয়ারের ৩০ বিঘা জমি রয়েছে। এ ছাড়া তাদের ২১টি ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ (অবরুদ্ধ) করা হয়েছে। বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. জাকির হোসেন গালিবের আদালত দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এসব আদেশ দেয়।
জব্দ হওয়া স্থাবর সম্পদের মধ্যে হারুনের নামে ঢাকার উত্তরায় ৭ দশমিক ৪৫ কাঠা জমিতে ৩ কোটি টাকা মূল্যের একটি ইমারত রয়েছে। গুলশানে ১০ দশমিক ৩৬ শতক জমিতে ৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকার আরেকটি ইমারত রয়েছে। এ ছাড়া সেমিপাকা একটি টিনশেড বাড়ি, খিলক্ষেতে একতলা একটি দালান ও সেমিপাকা আরেকটি টিনের বাড়ি রয়েছে। তার নামে উত্তরায় ১০ নম্বর সেক্টরে ৭ তলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় একটি ফ্ল্যাট ও জোয়ার সাহারায় ৬ তলা ভবনের ৬ তলায় আরেকটি ফ্ল্যাট রয়েছে। আশিয়ান সিটিতেও একটি ৫ কাঠার প্লট রয়েছে। একইসঙ্গে হারুনের ১০টি ও শাহরিয়ারের ১১টি ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ (অবরুদ্ধ) করা হয়েছে। পাশাপাশি শাহরিয়ারের তিনটি কোম্পানির শেয়ার ফ্রিজ (অবরুদ্ধ) করা হয়েছে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, দুদকের উপ-পরিচালক মুহাম্মদ জয়নাল আবেদীন পৃথক দুটি আবেদনে স্থাবর সম্পদ জব্দ ও অস্থাবর সম্পদ অবরুদ্ধ চেয়ে আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত আবেদন মঞ্জুর করে।
আবেদনে বলা হয়, আসামি মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ ১৭ কোটি ৫১ লাখ ১৭ হাজার টাকা মূল্যের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনপূর্বক ভোগদখলে রেখেছেন। তদন্তকালে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, আসামি তার মালিকানাধীন ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের চেষ্টা করছে। তা করতে পারলে এ মামলা আদালত কর্তৃক বিচার শেষে সাজার অংশ হিসেবে অপরাধলব্ধ আয় হতে অর্জিত সম্পত্তি সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্তকরণসহ সব উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে।
আবেদনে আরও বলা হয়েছে, আসামি এ.বি.এম. শাহরিয়ার ১২ কোটি ৯৬ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৪ টাকা মূল্যের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনপূর্বক ভোগদখলে রেখেছেন। আসামি মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিবি প্রধানের পদসহ বাংলাদেশ পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে তাকে অপরাধে প্রত্যক্ষ সহায়তা করায় মামলা হয়েছে। তদন্তকালে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, আসামি শাহারিয়ার তার মালিকানাধীন ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের চেষ্টা করছেন।
ডিআইজি মোজাম্মেল ও তার মেয়ের সম্পদ জব্দ
পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) গাজী মো. মোজাম্মেল হকের সম্পদ জব্দের আদেশ দিয়েছে আদালত। একইসঙ্গে তার স্ত্রী ফারজানা মোজাম্মেল এবং মেয়ে গাজী বুশরা তাবাসসুমের নামে থাকা ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে।
দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগরের জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ মো. জাকির হোসেন গতকাল এ আদেশ দেন।
দুদক বলছে, গাজী মো. মোজাম্মেল হকের নামে থাকা ৬৫ বিঘা জমি ক্রোকের আদেশ দিয়েছে আদালত। এর বাইরে মোজাম্মেল হকের স্ত্রীর নামে ২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা মূল্যের ১২টি দলিল ক্রোকেরও আদেশ দেওয়া হয়েছে। মোজাম্মেল হক, তার স্ত্রী ও মেয়ের ৬৭টি ব্যাংক হিসাবে ৪৯৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা জমা হয়েছিল। এসব ব্যাংক হিসাব থেকে ৪৮৫ কোটি ২৬ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। বর্তমানে এসব ব্যাংক হিসাবে ১৭ কোটি ২০ লাখ টাকা জমা রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, গাজী মোজাম্মেল হক ১৯৯৮ সালে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে যোগ দেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে তিনি পুলিশ সদর দপ্তরে ‘ডেভেলপমেন্ট’ শাখায় কর্মরত ছিলেন। অতিরিক্ত ডিআইজি হওয়ার পরও এই শাখায় ছিলেন তিনি। পুলিশের এই শাখার কাজ বাহিনীর জমিজমা দেখাশোনা করা। ১ জানুয়ারি তাকে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এন্টি টেরোরিজম ইউনিটে বদলি করা হয়।
সাবেক মন্ত্রী বিপু ও তার স্ত্রীর সম্পদ জব্দের আবেদন
অর্থ পাচারের মামলায় পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু ও তার স্ত্রী সীমা হামিদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ এবং ব্যাংক হিসাব জব্দের আবেদন করেছে দুদক।
আবেদনে দুদক বলেছে, আসামি সীমা হামিদ ও নসরুল হামিদ বিপু অবৈধ উপায়ে ৬ কোটি ৯৮ লাখ ৫৪ হাজার ৯৬৪ টাকার সম্পদ অর্জন এবং ২০টি ব্যাংক হিসাবে ১২ কোটি ৭৭ লাখ ৮৬ হাজার ৬৯৯ টাকা জমা করেছেন। ১১ কোটি ১৮ লাখ ৪৯ হাজার ৮১৮ টাকার সন্দেহজনক লেনদেন করেছেন তিনি।
এসব অভিযোগে তার নামে মামলা করেছে দুদক। মামলার পর তিনি মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের নামে সম্পদ হস্তান্তরের চেষ্টা করছেন বলে তথ্য রয়েছে। আসামির অবৈধ সম্পদ ও ব্যাংকে থাকা টাকা হস্তান্তর রোধে তা জব্দ করা প্রয়োজন।