সীমান্তে উত্তেজনা
দীপক দেব
প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০২৫ ১১:২৭ এএম
প্রবা গ্রাফিক্স
ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের নানা উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ডের জেরে দেশের সীমান্ত এলাকায় প্রায়ই চরম উত্তেজনা দেখা দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে সীমান্তে ভারতের কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অশান্ত পরিস্থিতি কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না। প্রতিনিয়ত কোনো না কোনো ইস্যুতে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়াতে দেখা যাচ্ছে বিজিবি-বিএসএফকে। এমনকি দুই দেশের নাগরিকরাও এতে জড়িয়ে পড়ছে, গত শনিবার যার সর্বশেষ নজির দেখা গেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের চৌকা সীমান্তে। সেখানে দল বেঁধে ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে গাছ কাটার ঘটনায় রুখে দাঁড়ায় এলাকাবাসী। দুই পক্ষের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের সময় টিয়ার শেল নিক্ষেপ ও সাউন্ড গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটায় বিএসএফ।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের উত্তেজনাকর পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের সাবেক কূটনীতিবিদরা। চলমান উত্তেজনা নিরসনের লক্ষ্যে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে একটি জোরালো ও স্পষ্ট বার্তা দেওয়ার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় বাসিন্দাদের শান্ত রাখার বিষয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।
প্রতিবেশী দুই দেশের সীমান্ত নিয়ে সৃষ্ট চলমান সংকটে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতকে সুস্পষ্ট বার্তা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবির। গতকাল রবিবার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, এই মুহূর্তে সমস্যা নিরসনের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে স্পষ্টভাবেই বার্তা দিতে হবে। বলতে হবেÑ তোমরা দুই দেশের যৌথ সীমান্তে যে উদ্যোগ নিয়েছো তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এর মধ্য দিয়ে জনগণের মধ্যেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে। যেকোনো সময় একটা বিপদ সৃষ্টি হতে পারে, যা কারও জন্যই গ্রহণযোগ্য নয়। এজন্য এই কাজ থেকে তোমরা বিরত থাকো। এটা ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে স্পষ্ট করে দেওয়া দরকার। এ ছাড়া তাদের আরও বলে দিতে হবেÑ এসব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে আমরা তা প্রতিহত করার জন্য প্রস্তুত রয়েছি। অপ্রয়োজনীয় কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে তারা যেন বিষয়টি উপলব্ধি করে সেটা তাদের জানিয়ে দিতে হবে মনে করেন সাবেক এই রাষ্ট্রদূত।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে তুলতে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষার পরামর্শ দিয়েছেন সাবেক এই কূটনীতিক। পাশাপাশি জনগণ যেন শান্ত থাকে, এর জন্য বিজিবি ও জেলা প্রশাসনকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার কথা বলেছেন এম হুমায়ুন কবির।
আরেক সাবেক কূটনীতিক ও রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ সীমান্তবর্তী জনগণকে শান্ত করার পাশাপাশি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবিকে আরও তৎপর থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, যেহেতু তাদের (ভারত) সঙ্গে আমাদের একটা সমস্যা চলছে, সেজন্য আমাদের জনগণকে বুঝতে দেওয়া প্রয়োজন যে, তারা নিরাপদ আছেন। বিজিবির সদস্যরা উপস্থিত থাকলে বিষয়টা উপলব্ধি করা সহজ হয়। তা না হলে বিপরীত পাশে থাকা বিএসএফ বা তাদের নাগরিকরা যা ইচ্ছা তা-ই করার চেষ্টা করবে। সেক্ষেত্রে আমাদের লোকেরা কিছুটা হলেও অসহায় হয়ে যায়। এ ছাড়া দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের আশঙ্কাও থাকে। চিন্তা করতে হবে, তাতে কার কী লাভ! সুতরাং সেটা যাতে না হয় এবং দুই পক্ষের সাধারণ মানুষ যেন তাদের অধিকারগুলো ঠিকভাবে ভোগ করতে পারে, জমিজমা চাষ করতে পারে, এজন্য বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ হওয়া উচিত। দুই পক্ষের মধ্যে নানা কারণে সমস্যা হতে পারে, তা থেকে গণ্ডগোল হতে পারে, কিন্তু বড় ধরনের কিছু যেন না হয়Ñ সেই চেষ্টা সবার করতে হবে। এ ছাড়া উত্তেজনা তৈরি হয়Ñ এমন কিছু করা থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে। বিশেষ করে গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। উত্তেজনা তৈরি করেÑ এমন কিছু করা কারও জন্যই ভালো হবে না।
প্রসঙ্গত, গত বছর জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন সৃষ্টি হয়। এখনও তা অব্যাহত। সাম্প্রতিককালে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে ভারতের পক্ষ থেকে সীমান্তের শূন্যরেখায় কাঁটাতারের বেড়া স্থাপনের কাজ শুরু করাকে কেন্দ্র করে। এই ঘটনায় ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করে প্রতিবাদ জানানো হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের ঘটনায় বাংলাদেশের গভীর উদ্বেগের বিষয়টি ভারতের হাইকমিশনারকে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে অননুমোদিতভাবে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং এ-সংক্রান্ত অন্যান্য কার্যক্রম সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা ও বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে। পররাষ্ট্র সচিবকে উদ্ধৃত করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, যথাযথ অনুমোদন ছাড়া কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণকাজ দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সহযোগিতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের চেতনাকে ক্ষুণ্ন করছে।
অন্যদিকে সীমান্তে চুক্তি লঙ্ঘন করে সীমান্তের পাঁচ স্থানে বেড়া নির্মাণের চেষ্টার অভিযোগ তুলে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করার পরদিনই দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার নুরুল ইসলামকে তলব করে ভারত।
এই অবস্থার মধ্যে আবার উত্তেজনা তৈরি হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার চৌকা সীমান্তে। গত শনিবার দুপুরে উপজেলার বিনোদপুর ইউনিয়নের চৌকা ও কিরণগঞ্জ বিজিবি সীমান্ত ফাঁড়ির মাঝামাঝি এলাকায় উত্তেজনা দেখা দেয়। ভারতীয় নাগরিকদের হামলায় কমপক্ষে পাঁচ বাংলাদেশি আহত হয়েছে। দুই দেশের মানুষের পায়ের চাপায় ওই এলাকায় অন্তত সাত বিঘা জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে এই ঘটনায় বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক হয়েছে।
বিজিবি বলেছে, আম ও বরই গাছ কেটে নেওয়ার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছে বিএসএফ। তবে সীমান্তে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে বিএসএফ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী গতকাল রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘দেশের সীমান্ত সুরক্ষিত আছে। সীমান্তের নিরাপত্তা জোরদার করতে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। রক্ত ঝরলেও সীমান্ত সুরক্ষিত থাকবে। আমাদের পাশে এখন জনগণ আছে। সীমন্তের নিরাপত্তা নিয়ে আগে কোনো ব্যবস্থা বা পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এখন সেটা করা হচ্ছে বলেই সমস্যা সামনে আসছে। বিজিবি সবসময় সতর্ক আছে। সীমান্ত সম্পূর্ণরূপে সুরক্ষিত। এই সীমান্তের ওপারের কেউ আসতে পারবে না। রক্ত ঝরবে, কিন্তু সীমান্ত সুরক্ষিত থাকবে।’