প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৫ ১৩:৪৩ পিএম
আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২৫ ১৪:৪১ পিএম
অন্তর্বর্তী সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। ফাইল ছবি
অন্তর্বর্তী সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেছেন, শ্বেতপত্রের পরামর্শগুলো মূল্যায়ন করে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
শনিবার (১৮ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে 'শ্বেতপত্র এবং অতঃপর: অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, সংস্কার ও জাতীয় বাজেট' শীর্ষক সিম্পোজিয়ামে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘বিগত সরকারের দেওয়া টিসিবিতে এক কোটির কার্ডের মধ্যে ৩৭ লাখ ছিল ভুয়া। সেই শূন্যস্থান পূরণ করা হচ্ছে। টিসিবি বছরে ১২ হাজার কোটি টাকার পণ্য কেনে। দীর্ঘদিন পণ্যের মূল্য সংযোজন করা হয়নি। এখানে রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত থাকায় এ কাজ হয়েছে।’
শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, ‘গত ডিসেম্বর ব্যাংকগুলো প্রচুর লাভ করেছে। তাদের হিসেব নিতে হবে। আর আমাদের জিডিপির গ্রোথ আসলে কত তা নির্ধারণ করতে না পারলে নীতিগ্রহণে সমস্যা হবে। এজন্য আমাদের ক্লিয়ার মেন্যুফেস্টোর দরকার আছে।’
বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন,‘শ্বেতপত্রের পরামর্শগুলো মূল্যায়ন করে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।’
শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির সভাপতি ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের সভাপতিত্বে সিম্পোজিয়ামের প্রথম অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ছাড়াও অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী সভাপতি চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন।
রাজনীতি ও নির্বাচনের তুলনায় অর্থনৈতিক সংস্কার গুরুত্ব পাচ্ছে না বলে শুভেচ্ছা বক্তব্যে অভিযোগ করেন ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
তিনি বলেন, ‘বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাজনীতি ও নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে যতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, সেই তুলনায় অর্থনৈতিক সংস্কার গুরুত্ব পাচ্ছে না। সরকার বিগত সরকারের বাজেট নিয়েই কাজ করছে, তারা নতুন কোন দিক নির্দেশনা দিচ্ছে না।’
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের দায়িত্ব নেওয়ার পর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার একটি জাতীয় শ্বেতপত্র কমিটি গঠন করেছিল। কমিটি নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন তুলে ধরেছে। গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত 'বাংলাদেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক অবস্থার শ্বেতপত্র: একটি উন্নয়ন আখ্যানের ব্যবচ্ছেদ' নামের সেই শ্বেতপত্র নিয়ে দেশ-বিদেশে প্রচুর আলোচনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এটি নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এ শ্বেতপত্রের সুপারিশসমূহ কিভাবে আগামীদিনে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায় সে সম্পর্কে সমাজের বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে শ্বেতপত্রের সুপারিশসমূহ বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবেলা করার সম্ভাব্য কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ নিয়ে উল্লেখিত সিম্পোজিয়ামে আলোচনা হবে। সিম্পোজিয়ামে আগামী জাতীয় বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে শ্বেতপত্র কমিটির সদস্যগণ ও বিশিষ্ট আলোচকবৃন্দ তাদের মতামত তুলে ধরছেন।’
তিনি বলেন, ‘এ সিম্পোজিয়ামের পরামর্শ বাজেটে ও রাষ্ট্রীয় কাজে নীতি প্রণয়নে সহযোগিতা করবে।’
বর্তমান অর্থনীতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘চলতি অর্থবছরের বাজেটে দেশে প্রবৃদ্ধির হার কমছে। এখন পর্যন্ত যে তথ্য পাওয়া গেছে তাতে কমের হিসেব এসেছে। এটি বছর শেষেও বাড়ার সুযোগ নেই।’
সরকারের নতুন করে শতাধিক পণ্য ভ্যাট আরোপকে অবিবেচক কাজ উল্লেখ করে ড. দেবপ্রিয় বলেন, ‘অবিবেচকভাবে ভ্যাট আরোপ করা হলো। সরকার প্রত্যক্ষ করকে বাদ দিয়ে পরোক্ষ করের দিকে গেছে। এটি খুবই দুঃখের বিষয়। আগামী বাজেটে হয়ত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় বাড়বে কিন্তু কারা সেটি পাবে তা নির্ধারণ করা হলো না।’
কৃষক আমন ধানের দাম পাচ্ছে না উল্লেখ করে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘আমন মৌসুমে উল্লেখযোগ্যভাবে ফলন হলেও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে কিন্তু
আমন ধানের মূল্য কৃষক পাচ্ছে না। সরকারের মজুদ তেমনভাবে বাড়ছে না।’
তিনি বলেন, ‘খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের ব্যাপারে ফ্যামিলি কার্ড, টিসিবিসহ বিভিন্ন বিষয় এ মজুদের সঙ্গে যুক্ত।’
তিনি বলেন, ‘গত সরকার তথ্য উপাত্তকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছিল। আমরা বর্তমান সরকারের কাছে এর স্বচ্ছতা চেয়েছিলাম কিন্তু তা এখনও হয়নি। ব্যাংকিং খাতে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ রয়েছে। জ্বালানিখাতেও কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ রয়েছে।’
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের সরকার অর্থনৈতিক উত্তরাধিকার কোন পর্যায়ে রেখে যাবে তার দিক নির্দেশনা থাকা দরকার।’
তিনটি দিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দুর্নীতি ও অপশাসন দূর করতে হবে; বিরাজমান সামাজিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে হবে। এখানে ব্যক্তি ও সামাজিক নিরাপত্তার দরকার এবং সুসংহত অর্থনীতি গড়ে তোলার মতো কোন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না, এ খাতে উদ্যোগ নিতে হবে।’
বিনিয়োগের জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা দরকার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারের অর্থনৈতিক মেনুফেস্টো নেই। তাদেরকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে তার কোনো দিকনির্দেশনা নেই।
বর্তমান সরকার সংশোধিত বাজেট দেয়নি, আগের বাজেটেই কাজ করছে। অথচ আগের বাজেটের তথ্য উপাত্ত নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। নির্বাচন ও সংস্কার নিয়ে বিরোধ তৈরি করা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সুসংহত সংস্কারের জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, ‘নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে অনেকদিন ধরে কথা হচ্ছে কোন পরিবর্তন নেই। এক কোম্পানিকে ট্যাক্স ফ্রির সুযোগ দেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বাজেটে একটি খাতকে অগ্রাধিকার না দিয়ে অন্যান্য খাতকেও সুযোগ দিতে হবে। মেগা প্রজেক্টের কারণে বেসরকারি পর্যায়ে বিনিয়োগে ভাটা পড়েছে। এজন্য ১০০ অর্থনৈতিক জোনের বদলে ৫টি করা হচ্ছে।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক উমামা ফাতেমা বলেন, ‘গত ১৫ বছরের উন্নয়নের গাল-গল্প কতটা ফাঁকা তা দেখা যাচ্ছে। জরিপের ভিত্তিতে বাজেট দেওয়া হলেও প্রকৃত চিত্র ভিন্ন। দেশের খুব ধনী ও গরীব মানুষের মধ্যবর্তী মানুষরা আরো খারাপ হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে কী ধরনের চুক্তি হয়েছে তা জনসম্মুখে তুলে ধরার দাবি করা হলেও সরকার তা দিচ্ছে না। এটি চীন ও রাশিয়ার সঙ্গের চুক্তিও প্রকাশ করতে হবে। গত ১৫ বছরে বিনিয়োগকে শুকিয়ে মারা হয়েছে। সাত লাখ কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। সেখানকার ৪০ শতাংশ আমলারা আত্মসাৎ করেছে। তাদের দুর্নীতির কারণে জেলে দেওয়ার বদলে পদন্নোতি দিচ্ছে ও মহার্ঘ্য ভাতা বাড়িয়ে নিয়েছে।’
সিম্পোজিয়ামের দ্বিতীয় অধিবেশনে অতিথি থাকবেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী।
তৃতীয় অধিবেশনে প্রধান অতিথি থাকবেন অন্তর্বর্তী সরকারের সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণলায়ের উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ ও সম্মানিত অতিথি থাকবেন প্রধান উপদেষ্টার এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ।
সমাপনী অধিবেশনে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশের সহযোগিতায় শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি ২০২৪-এর উদ্যোগে সিম্পোজিয়ামটির আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানটি সকাল সাড়ে ৯টায় শুরু হয়ে চলবে বিকাল ৫টা পর্যন্ত।
সিম্পোজিয়ামে শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি ২০২৪-এর অন্যান্য সদস্যদের পাশাপাশি সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, রাজনৈতিক, সামাজিক ও ব্যক্তিখাতের নেতৃবৃন্দ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, সমাজসেবী, মানবাধিকারকর্মী, শিক্ষক, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীদের প্রতিনিধি, ছাত্র ও যুবসমাজের নেতৃবৃন্দ সহ সমাজের বিভিন্ন অঙ্গনের গবেষক ও নীতি বিশ্লেষকরা অংশ নিয়েছেন।