আলজাজিরার প্রতিবেদন
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৫ ১২:০১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। উভয় দেশের রাজনীতিতে সাধারণ ভারতবিরোধী মনোভাব কাজ করছে। যা ঢাকা ও ইসলামাবাদের পূর্ব বৈরিতার চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে বলে মধ্যপ্রাচ্যের গণমাধ্যম আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা
হয়, গত মঙ্গলবার পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান স্টাফ অফিসার
লেফটেন্যান্ট জেনারেল এসএম কামরুল হাসান পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের
সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তাদের মধ্যে টেবিল বৈঠকে দুই দেশের পতাকা সাজানো ছিল। সেনা অফিসার
পাকিস্তানের অন্য সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করলেও এই সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের
সেনাপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ।
কামরুল হাসান
ও আসিম মুনিরের মধ্যকার গত মঙ্গলবারের বৈঠকের বিষয়ে মন্তব্য করে পাকিস্তানি সামরিক
বাহিনীর মিডিয়া শাখাগুলো দেশ দুটিকে ‘ভ্রাতৃত্বপূর্ণ দেশ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। বিংশ
শতাব্দীর অন্যতম রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীনতা
অর্জনের ৫৪ বছর হলেও এর আগে এ রকম সম্পর্ক দেখা যায়নি।
বাংলাদেশের সাবেক
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের বেশ টানাপড়েন
পড়ে। কিন্তু আগস্টে ছাত্র-জনতার গণবিক্ষোভের পর হাসিনা ক্ষমতা থেকে উৎখাত হন এবং প্রতিবেশী
ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন এবং এরপর থেকেই বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কে ঘনিষ্ঠতা
দেখা যাচ্ছে।
পাকিস্তানি সামরিক
বাহিনী বলছে, আসিম মুনির ও
কামরুল হাসানের বৈঠকে দুই দেশের সামরিক সম্পর্ক জোরদারের কথা উঠে আসে। এই সম্পর্ককে
যেকোনো বহিঃশক্তির বাধা থেকে সুরক্ষা করার জন্য তাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
মুনির ও কামরুল হাসানের এই বৈঠক ছিল দুই দেশের সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের সর্বোচ্চ বৈঠকগুলোর
মধ্যে অন্যতম।
গত মাসে মিসরের
রাজধানী কায়রোতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জোট ডি-৮-এর আন্তর্জাতিক শীর্ষ সম্মেলনে পাকিস্তানের
প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান মুহাম্মদ ইউনূস বৈঠক
করেন। এর আগে সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সাইডলাইনেও তারা বৈঠক করেছিলেন।
আগামী মাসে পাকিস্তানের
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ২০১২ সালের পর এই প্রথম বাংলাদেশ সফরে আসছেন বলে ধারণা
করা হচ্ছে। যা দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে পারে বলে মনে করছেন
বিশ্লেষকরা।
ইসলামাবাদ ও ঢাকার
মধ্যে ঐতিহাসিক বৈরিতার উৎপত্তি ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ
থেকে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী এবং তার সহযোগী মিলিশিয়ারা (আল বদর, আল শামস) বাঙালি
বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। স্বাধীনতাকামী লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করেছিল তারা।
দুই লাখ নারী ধর্ষিত হয়েছিল।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর
সমর্থনে, হাসিনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার আওয়ামী লীগ দল মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব
দেয়। পরে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন এবং জাতির পিতা উপাধি লাভ করেন। ১৯৭৪ সালে
পাকিস্তান ত্রি-পাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা স্বীকার করলেও ইসলামাবাদ
ও ঢাকার মধ্যকার অমীমাংসিত সমস্যাগুলো রয়েই যায়। সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিলোÑ পাকিস্তানের
আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়া, বাংলাদেশে অবস্থানরত উর্দুভাষী লোকদের সরিয়ে নেওয়া ও দুই দেশের
পূর্ববর্তী সম্পদের বণ্টন।
কায়রোতে শাহবাজ
শরিফের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ড. মুহাম্মদ ইউনুস বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের
এসব সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানান। ইউনূস বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যকার সমস্যাগুলো বারবার
উঠে আসে। আমি চাই আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কথা চিন্তা করে এসব সমস্যা সমাধান হোক।’
জবাবে শরিফ বলেন, ‘আমি এসব দেখছি।’
বাংলাদেশে নিযুক্ত
পাকিস্তানি সাবেক রাষ্ট্রদূত আশরাফ কোরেশি আলজাজিরাকে বলেন, ‘স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের
প্রতি নয়াদিল্লির যে পূর্ণসমর্থন, তা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে টানাপড়েন তৈরি করবে। যে
কারণে ঢাকা প্রশাসনকে নতুন করে কৌশল অবলম্বন করতে হবে।’
আশরাফ কোরেশি
আরও বলেন, ‘ভারত হাসিনাকে নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বের সম্মুখীন। ভারত হাসিনাকে ছাড়তে পারে
না একটি কারণে; তা হলো ভারত সমর্থকদের ছাড়তে দ্বিধা করে নাÑ এমনটি সবাই ভাববে বলে।’
গত মাসে অন্তর্বর্তী
সরকার দিল্লির কাছে হাসিনাকে প্রত্যাবর্তনের অনুরোধ করে। হাসিনা তার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার
আগে বিক্ষোভকারীদের থামাতে নিজের যে পেশিশক্তি প্রদর্শন করে তা মানবাধিকার লঙ্ঘন। ভারত
সরকার ইউনূস সরকারের এ অনুরোধের কোনো প্রতিক্রিয়া করেনি। উল্টো বাংলাদেশে সংখ্যালঘু
হিন্দুদের অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগকে দৃঢ়ভাবে
প্রত্যাখ্যান করেছে এবং জানিয়েছে ভারতীয় মিডিয়ার উস্কানিতে প্রতিবেশীদের মধ্যে এসব
উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ-পাকিস্তান
সম্পর্কে যে সময়ে ঘনিষ্ঠতা দেখা যাচ্ছে, ঠিক সে সময়ে দেখা যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ায় বড়
ধরনের ভূরাজনৈতক পরিবর্তন। যার অন্যতম উদাহরণ হলো ভারতের সঙ্গে আফগান তালেবান শাসকদের
সম্পর্কের উন্নতি। ভারত তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি না দিলেও ইতোমধ্যে দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তারা
আফগান সরকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। গত সপ্তাহে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিসরি
দুবাইয়ে ভারপ্রাপ্ত আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির সঙ্গে দেখা করেন। যা
ভারত ও তালেবানের মধ্যে সরাসরি সর্বোচ্চ পর্যায়ের সাক্ষাৎ।
ভারতের সঙ্গে
তালেবানের কূটনৈতিক সম্পর্ক পাকিস্তানকে ক্ষুব্ধ করেছে। পাকিস্তান অভিযোগ করেছে, টিটিপি
যোদ্ধাদের আফগানিস্তানের মাটিতে আশ্রয় ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। যে অভিযোগ তালেবান
অস্বীকার করে। গত মাসে আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বিমান হামলার পরপরই ইসলামাবাদ ও কাবুলের
মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করে ।
সাবেক পাকিস্তানি
কূটনীতিক বুরহানুল ইসলাম বলেছেন, ‘‘শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর পাকিস্তান ও বাংলাদেশের
মধ্যে সম্পর্কের উন্নতিকে ‘নতুন অধ্যায়’ হিসেবে দেখা যেতে পারে।’’
তিনি আরও বলেন
‘সম্ভবত বাংলাদেশ পাকিস্তানের কাছ থেকে সামরিক সহায়তা এবং নিরাপত্তা চাইছে। আমি আশাবাদী
যে দুই দেশ এখন সঠিক পথে এগোচ্ছে এবং তাদের সামরিক নেতৃত্ব পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক
উন্নত করতে বেশ ভূমিকা রাখবে।’
তিনি মনে করেন,
গণঅভ্যুত্থানের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ হোঁচট খেলেও বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্রমাগতভাবে
বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে উৎসাহ প্রদান করতে পারে।
২০২১ সাল থেকে
৬ শতাংশ বৃদ্ধির হার নিয়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশগুলোর
মধ্যে একটি। অন্যদিকে পাকিস্তান গত বছর মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পরিচালনা করে
যথেষ্ট পিছিয়ে রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ অপরিবর্তিত রয়েছে। সরকারি
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে পাকিস্তানের রপ্তানিমূল্য ৬৬১ মিলিয়ন ডলার পণ্য এবং
আমদানি দাঁড়িয়েছে ৫৭ মিলিয়ন ডলার। বাণিজ্য এমন একটি
ক্ষেত্র যা আগামী দিনে বড় পরিবর্তন দেখতে পারে।
বুরহানুল ইসলাম
আরও বলেন, ‘একটি সময় যখন দুই রাজধানীর মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট ছিল না, কূটনৈতিক ব্যস্ততা
ছিল এবং লোকেরা ভিসা পেতে অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছিল, ঠিক সে সময় যেকোনো শর্তের শিথিলতা
গুরুত্বপূর্ণ হবে। পাকিস্তান সরকার সম্পর্ক উন্নয়নের বিরাট একটি সুযোগ পাচ্ছে এবং
সেটি উন্নয়নে সর্বাত্মক চেষ্টা করবে।’