সাইফ বাবলু ও রেদওয়ানুল হক
প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৫ ০৯:১৬ এএম
গ্রাফিক্স : প্রবা
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির চাঞ্চল্যকর ঘটনায় নতুন করে বিশদ তদন্তের আগ্রহ প্রকাশ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত ১ জানুয়ারি মামলার নথিপত্র চেয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডিকে একটি চিঠিও দিয়েছে সংস্থাটি।
দুদক সূত্র জানিয়েছে, দুদকের মানি লন্ডারিং শাখার সহকারী পরিচালক সৈয়দ আফনান আরা কেয়া স্বাক্ষরিত ওই চিঠির মাধ্যমে আলোচিত এ মামলা দুদকের এখতিয়ারভুক্ত অপরাধ হওয়ায় সিআইডির কাছে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র চাওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সিআইডি এখনও নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি বলে জানা গেছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, মামলাটি দুদকের মাধ্যমে তদন্ত হওয়া উচিত। তবে জড়িতদের মুখোশ উম্মোচনে যৌথভাবে তদন্ত হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মামলাটি নিয়ে দুদক ও সিআইডির মধ্যে একধরনের লড়াই চলছে। সিআইডি চাইছেÑ মামলার তদন্ত তাদের মাধ্যমে শেষ হোক। অন্যদিকে দুদক চাইছেÑ তাদের তফসিলভুক্ত অপরাধ হওয়ায় সিআইডি এ মামলার নথিপত্র দুদকের কাছে হস্তান্তর করুক। গতকাল বৃহস্পতিবার এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি বা সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়নি।
প্রসঙ্গত, অভিযোগ রয়েছেÑ রিজার্ভ চুরির ঘটনায় শুরুতে তৎকালীন গভর্নরের বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা, মামলা করতে গড়িমসি, ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল ধারায় মামলা করা, বিদেশি অপরাধীদের নাম বাদ দেওয়া, সঠিক সংস্থাকে দিয়ে তদন্ত না করানো এবং তদন্তকাজে হস্তক্ষেপ করে মূল অপরাধীদের বাদ দেওয়ার মতো নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সিআইডি গত ৯ বছরেও তদন্ত শেষ করতে পারেনি। বিগত সরকারের শীর্ষ মহলের হস্তক্ষেপ থাকায় তদন্ত বাধাগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। যদিও ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তদন্ত নতুন গতি পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাসহ ১৪ ব্যক্তিকে নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। সাতজনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চুরির ঘটনাটি আলোড়ন তুলেছিল সারা বিশ্বে। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুইফট ব্যবস্থা কাজে লাগিয়ে ৩৫টি ভুয়া বার্তার মাধ্যমে ফেডারেল রিজার্ভের নিউইয়র্ক শাখায় বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে ১০০ কোটি ডলার চুরির চেষ্টা চালায় অপরাধীরা। এর মধ্যে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার লোপাট করতে সক্ষম হয় তারা। এ অর্থের মধ্যে শ্রীলঙ্কায় যায় ২ কোটি ডলার, যে অর্থ অবশ্য উদ্ধার করা হয়েছে, তবে বাকি ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার আরসিবিসি ব্যাংক হয়ে ফিলিপাইনের বিভিন্ন ক্যাসিনোয় ঢুকে যায়। চুরি যাওয়া অর্থের মধ্যে এখন পর্যন্ত সব মিলিয়ে ৩ কোটি ৪৬ লাখ ডলার উদ্ধার করা হয়েছে; বাকি ৬ কোটি ৬৪ লাখ ডলার এখনও পাওয়া যায়নি।
রিজার্ভ চুরির ঘটনাটি শুরুতে গোপন রাখে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। ঘটনার ৪১ দিন পর কর্তৃপক্ষ তাদের সুইফট সিস্টেম হ্যাক করে রিভার্স চুরি করা হয়েছে বলে একটি মামলা করে। ৫৪ ধারায় করা মামলাটিতে চুরির ৩৭৯ ধারাও দেওয়া হয়। এ মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। আলোচিত এ ঘটনার পর গণমাধ্যমগুলো ফলাও করে নানা সময়ে নানান প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও মূল ঘটনা ও ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা আড়ালেই থেকে যায়।
সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে চাইলে সিআইডির প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. মতিউর রহমান শেখ গত বুধবার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘রিজার্ভ চুরির ঘটনায় হওয়া মামলাটি হস্তান্তরের জন্য সিআইডিকে একটি চিঠি দিয়েছে দুদক। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘মামলাটি সিআইডি দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত করছে। এখন যে পর্যায়ে রয়েছে, তাতে সিআইডি মামলাটির তদন্ত শেষ করতে সক্ষম। তবে আমরা দুদকের সঙ্গে তদন্তের বিষয়ে আলোচনা করব। প্রয়োজনে যৌথভাবে তদন্ত হতে পারে।’
দুদকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় সিআইডির তদন্তে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার জড়িত থাকার বিষয়ে তথ্য উঠে এসেছে। কোনো তদন্তে যখন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা সরাসরি উঠে আসে, তখন এ ধরনের মামলা তদন্তের জন্য দুদকের এখতিয়ারভুক্ত হয়ে পড়ে। আলোচিত মামলাটি তদন্তে দুদকই উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান।’
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘এখানে রিজার্ভ চুরির ঘটনা উল্লেখ করে মামলা করা হয়েছে। কিন্তু রিজার্ভ চুরি হয়নি। হ্যাকিং করে অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ বাংকের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ব্যবহৃত কম্পিউটার বা ল্যাপটপে থাকা তথ্য হ্যাক করার পেছনে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের গাফিলতি অথবা সহযোগিতা ছিল। তাই ওইসব ব্যক্তি দায় এড়াতে পারেন না। দুদক মনে করছেÑ রিজার্ভ সরিয়ে ফেলতে এ ধরনের নাটক সাজানো হয়েছে। এর সঙ্গে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কারও যোগসূত্র রয়েছে। ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এমন ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারেন।’
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যাংক থেকে বাংলাদেশের রক্ষিত ডলার সরিয়ে নেওয়ার অপরাধের পেছনে একটি দীর্ঘ পরিকল্পনা ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরাপত্তার সিস্টেমে ২০০৯ সালে যে কাজ করা হয়েছে, সেখানে ফিলিপাইনের সাইবার টিম ছিল। মূলত তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরাপত্তা সিস্টেমের গোপনীয়তা সম্পর্কে ফিলিপাইনের টিমগুলো জেনে যায়। ২০১৫ সালের দিকে পরিপূর্ণ পরিকল্পনা করে ২০১৬ সালের দিকে তা বাস্তবায়ন করা হয়।
অভিযুক্ত সাবেক গভর্নরসহ ১৪ কর্মকর্তা
সিআইডিকে রিজার্ভ চুরির মামলা তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার পর তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বর্তমানে অতিরিক্ত ডিআইজি) রায়হান উদ্দিন খানকে তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ করা হয়। তদন্তে নেমে ওই কর্মকর্তা জানতে পারেনÑ এই অপরাধে বিদেশি নাগরিকদের সহযোগিতা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কতিপয় কর্মকর্তা। এ মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে ফিলিপাইন, চীনসহ কয়েকটি দেশেও গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সে সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের নাম উঠে আসায় তদন্তে নতুন মোড় নেয়। আওয়ামী লীগ সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের জড়িত কর্মকর্তাদের নাম বাদ দিয়ে মামলার চার্জশিট দিতে চাপ প্রয়োগ করা হয়। তাতে রাজি না হওয়ায় ওই কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেন সিআইডির তৎকালীন প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মোহাম্মদ আলী মিয়া।
সূত্র জানিয়েছে, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লা আল ইয়াছিনকে এ মামলার দ্বিতীয় তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ করা হয়। তার তদন্তে মোট ১৪ জনের সংশ্লিষ্টতা উঠে আসে। এদের মধ্যে সাতজনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। বিশ্বস্ত সূত্রে তাদের মধ্য থেকে ছয়জনের নাম পাওয়া গেছে। তারা হলেনÑ বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান, মেইন্টেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী পরিচালক দিপঙ্কর কুমার চৌধুরী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ম্যানেজিং ডিরেক্টর আনিস এ খান ওরফে আনিসউদ্দিন আহমদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক এসএম রেজাউল করিম, সাবেক নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা, অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং ডিপার্টমেন্টের (এবিডি) ডিলিং রুমের সহকারী পরিচালক শেখ রিয়াজ উদ্দিন। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মেজবাউল হক (যিনি রিজার্ভ হ্যাকের আলামত নষ্টের দায়ে অভিযুক্ত), সাবেক একজন ডেপুটি গভর্নরসহ সাত কর্মকর্তাকে নজরদারিতে রেখেছে গোয়েন্দারা।
সিআইডির তদন্তসংশ্লিস্ট সূত্র জানিয়েছে, রিজার্ভ সরানোর ঘটনা জেনেও পুরোপুরি গোপন রেখেছিলেন তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমান। অভিযোগ রয়েছেÑ তিনিসহ সংশ্লিস্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের বাঁচাতে মামলা করার সময় চুরির ধারা ৩৭৯ বসানো হয়। যাতে মামলাটি অন্য কোনো সংস্থায় না পাঠিয়ে সিআইডিকে দিয়েই তদন্ত শেষ করা যায়। তখন সরকারের দায়িত্বশীলরা চেয়েছিলেন একটি ফরমায়েশি প্রতিবেদনের মাধ্যমে ঘটনাটি চাপা দিতে।
সিআইডির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ঘটনা অনুযায়ী এটি দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধের মধ্যে পড়ে। কারণ রিজার্ভ সরানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ছিল। হ্যাকিংয়ের ঘটনায় তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৪ ধারা মামলায় উল্লেখ করা হলেও ৫৬ ধারা উল্লেখ করা হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৪ কর্মকর্তার নাম আসার পর সরকার পতনের কয়েক দিন আগে তাদের নাম বাদ দিয়ে চার্জশিট দিতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বর্তমানে পুলিশ সুপার) আবদুল্লাহ আল ইয়াছিনকে চাপ দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা শাখার (বিএফআইউ) তৎকালীন প্রধান মাসুদ বিশ্বাস। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তা আর সম্ভব হয়নি।
মামলাটি যে কারণে দুদকের এখতিয়ারভুক্ত
দুদকের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রিজার্ভ চুরির মামলা হলেও ঘটনা ছিল ভিন্ন। অর্থাৎ এখানে চুরির ধারা দেওয়া হলেও মামলায় চুরির কোনো উল্লেখ নেই। লন্ডারিং হয়েছে, হ্যাকিং হয়েছে। হ্যাকিং করে রিজার্ভে থাকা ডলার লন্ডারিং করা হয়েছে। এ ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সহযোগিতা ছিল। মূলত চীন থেকে রিজার্ভ সিস্টেম হ্যাক করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে টাকা ফিলিপাইনে পাঠানো হয়েছে। এখানে অসৎ উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা ঘটনাটি ঘটিয়েছেন। ফলে এটির তদন্ত করার এখতিয়ার দুদকের। সিআইডি এ মামলা চার্জশিট দিলে আসামিরা পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। আবার বিদেশি যে দুজন ব্যক্তির বিষয়ে অভিযোগ রয়েছে, তাদের নামেও কোনো মামলা করেনি বাংলাদেশ ব্যাংক।