প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪ ২১:৩২ পিএম
সংবিধান সংস্কার কমিশনের কাছে খাদ্যের অধিকারকে সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেন, ‘কৃষিকে পানি থেকে বা পানিকে কৃষি থেকে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। বরং একসঙ্গে কাজ করতে হবে। একটি দেশের মানুষের প্রধান চাহিদাই হচ্ছে খাদ্য। করোনায় মানুষ বা রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণী স্থান থেকে অস্থিরতা শুরু হলো ধান কাটবে কে, শ্রমিক কোথায় পাওয়া যাবে। এখন যেহেতু সংবিধান সংস্কার কমিশন কাজ করছে, তাদের কাছে এ দাবি তুলতে হবে— খাদ্যের অধিকারকে সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া দরকার।’
বুধবার (১৮ ডিসেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ এগ্রিকালচার রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএআরএফ) আয়োজিত ‘কৃষি খাতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
বিএআরএফের সভাপতি রফিকুল ইসলাম সবুজের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক কাওসার আজমের সঞ্চালনায় এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান। প্রধান আলোচক ছিলেন এফবিসিসিআই ও বাংলাদেশ সীড এসোসিয়েশনের (বিএসএ) সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএসএর মহাসচিব কৃষিবিদ ড. মো. আলী আফজাল। বক্তব্য রাখেন কৃষিবিদ খন্দকার রাশেদ ইকবাল ও শেখ ফজলুল হক মনি।
উপদেষ্টা রিজওয়ানা আরও বলেন, ‘আমরা হাইব্রিড যুগে পৌঁছে গেছি। খাদ্য বলেন আর যা কিছু বলেন আমাদের সবকিছু বেশি করে উৎপাদন করতে হবে। রাষ্ট্রও অধিক পরিমাণ খাদ্য উৎপাদনে পুশ করছে। আমাদের অধিক খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনেও মনোযোগ দিতে হবে।’
রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে- বাংলাদেশে আগে প্রতি হেক্টরে ৮ দশমিক ৫ কেজি কেমিক্যাল ফার্টিলাইজার ব্যবহার করা হত; বর্তমানে তা ৭০০ কেজিতে পৌঁছেছে। এটি একটি ভয়ংকর অবস্থা। ২০০৫ সালে ১২ হাজার মেট্রিক টন কীটনাশক আমদানি করা হয়েছিল, কিন্তু ২০২০ সালে তা ২৭ হাজারে টনে উন্নীত হয়। অর্থাৎ আমরা দ্বিগুণের বেশি কীটনাশক আমদানি করছি। এ সব কীটনাশক আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে। বাংলাদেশের প্রতি হেক্টর জমিতে যেখানে ৯৮ টাকার কীটনাশক লাগার কথা থাকলেও বর্তমানে তা লাগছে ৮৮২ টাকার। এর সবকিছু খাদ্যচক্রের মাধ্যমে আমাদের শরীরে যাচ্ছে। তাই শুধু খাদ্য ফলালাম এটাতে হবে না। বরং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে জোর দিতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘কৃষি জমি সুরক্ষা আইনসহ বেশকিছু নীতিমালা চূড়ান্ত হওয়ার পথে। এগুলো চূড়ান্ত হলে আমরা আমাদের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় একটা বড় পরিবর্তন আনতে পারব।’
কৃষি সচিব এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, ‘আমরা খামারি নামের একটি অ্যাপ তৈরি করছি, যেখানে জমির পরিমাণ অনুযায়ী মাটির উর্বরতা বিবেচনায় নিয়ে কোন ফসল ভাল ফলবে, কতটুকু সার লাগবে, কি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে এবং সর্বোপরি আবহাওয়া উপযোগী একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে চাষাবাদের ক্ষেত্রে। দ্রুতই এই অ্যাপটির কার্যক্রম শুরু হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাজ এত ব্যাপক, সারাদেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্ব যে মন্ত্রণালয়ের হাতে, তাদের জন্য প্রতি বছর যে বরাদ্দ থাকে সেটা অনেক বড় একক প্রকল্পের চেয়েও কম। এই জায়গায় পরিবর্তন দরকার।’
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘একেক দেশে কৃষি উৎপাদনের প্যাটার্ন একেক রকম। উন্নয়নশীল দেশে উৎপাদনে যারা জড়িত তারা নিজের জন্য খাবার রাখেন। আমাদের দেশেও। বাকীটা বিক্রি করেন। অধিকাংশ ফার্মার শিক্ষিত নন। কৃষিতে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ। এটা আবহাওয়া ও বিভিন্ন বিষয়ের উপর নির্ভরশীল। এ কারণে প্রাচীন পদ্ধতিতে তারা চাষাবাদ করেন। নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করতে চান না। তারা সাহস করেন না।’
কৃষি উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতি বছর ০.৪ শতাংশ হারে জমি কমছে। আরও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ কারণে সব অংশীদার মিলে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কাজ করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অধিক কৃষি উৎপাদনের পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্যও ধরে রাখতে হবে। উৎপাদন দুইভাবে বাড়ানো যায়। এক হলো জমি বাড়ানো, আর অন্যটি হলো উৎপাদনশীলতা বাড়ানো। জমি বাড়ানোর যেহেতু সুযোগ কম একারণে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে।’
ক্লাইমেট স্মার্ট এগ্রিকালচার অ্যান্ড ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক খন্দকার মুহাম্মদ রাশেদ ইফতেখার বলেন, ‘বৈশ্বিক জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টিপাতের অসম বন্টন, উচ্চ তাপমাত্রার আবির্ভাব, বন্যা ও আকষ্মিক বন্যার কারণে শস্য বিন্যাসের উপর প্রতিনিয়ত প্রভাব পড়ছে। বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার দীর্ঘসূত্রতা যেখানে তিন ফসল হওয়ার কথা বা চার ফসল হওয়ার কথা সেখানে দুই ফসল বা তিন ফসল হচ্ছে। এ ছাড়া ফসলে পোকামাকড় ও রোগের প্রাদুর্ভাবের প্রতিনিয়ত স্বরূপ পরিবর্তন হচ্ছে।’