বিচার বিভাগ সংস্কার
পারভেজ খান
প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৪ ০৯:৫৭ এএম
আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৭:০৯ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
দেশের উচ্চ ও অধস্তন আদালতে মামলাজট দিন দিন বেড়েই চলেছে। ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানপূর্ব পরিস্থিতিতে পুলিশি তদন্ত ও আদালতের নিয়মিত কাজ যেমন ব্যাহত হয়েছে, তেমনি অভ্যুত্থান পরবর্তীকালে সারা দেশে মামলার হিড়িক পড়েছে। ফলে এই মামলাজট আরও বেড়েছে। সব মিলিয়ে এখন দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে শুরু করে অধস্তন বা নিম্ন আদালতে সিদ্ধান্ত বা রায়ের অপেক্ষায় ঝুলে থাকা মামলার সংখ্যা অর্ধকোটি ছুঁইছুঁই। এর মধ্যে ২০১৪ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ১০ বছরে সারা দেশে করা শুধু ফোজদারি মামলার সংখ্যাই ২০ লাখ ৮৩ হাজার ৩৭৮টি। স্বল্পসংখ্যক আদালত ও বিচারক দিয়ে যে গতিতে বিচারকাজ চলছে, তাতে শুধু জট বেঁধে থাকা এই মামলাগুলোর বিচারকাজই আগামী ৫০ বছরেও শেষ হবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
এই সংশয় থেকে পরিত্রাণের পথ খুঁজছে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন। তাদের মতে, একটু আন্তরিক ও সচেষ্ট হলে এবং কাজের ফরম্যাটে কিছু পরিবর্তন আনলেই এই জট থেকে বের হয়ে আসার পথ খুঁজে পাওয়া যাবে। এক্ষেত্রে তারা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন আরও বিচারক নিয়োগের ওপর। পাশাপাশি তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি’ (এডিআর) ব্যবস্থাকে সংশোধিত আইনে যুক্ত করে সেটিকে প্রবর্তনের ওপর। আদালত ও কমিশন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রসঙ্গত, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন ইতোমধ্যে বিচার বিভাগের নানা সমস্যা চিহ্নিত করতে, সেগুলো দূর করার উপায় খুঁজতে এবং মামলাজট থেকে উত্তরণের পথ নির্ধারণে নিজেদের মধ্যে একাধিকবার বৈঠক করেছেন। সম্প্রতি এক বৈঠক শেষে কমিশনপ্রধান বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমান বলেছেন, ‘বিচারকাজে যেন বিলম্ব না ঘটে এবং বিচারপ্রার্থীর খরচ যেন কম হয়Ñ বিষয়টি নিশ্চিতে সুপারিশ করব।’
মামলা রুজু করতে এসে একজন বিচারপ্রার্থীকে বিবিধ খাতে খরচ করতে হয়, যা কমানোর বিষয়টিও ভাবছে কমিশন। দেশের আর্থিক অবস্থা ভালো হলে সরকারই বাদীর খরচ চালাবে। যে মামলায় হেরে যাবে, তাকেই ওই খরচের ভার বহন করতে হবে। কোনো মামলা দায়েরের পর সমন ইস্যু করা হলে ওই সমন জারি করতে বাদী ও আদালতের কারণে অনেক সময় দীর্ঘসূত্রতা হয়। তা নিরসনে সুপারিশ করা হবে। কমিশনের বৈঠকে এসব নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা হয়েছে।
সংস্কার কমিশনের সদস্য বিচারপতি এমদাদুল হক বলেন, ‘বিদ্যমান মামলাজট কীভাবে কমানো যায়, সে বিষয়ে সংস্কার কমিশনের সুপারিশ থাকবে। কী কারণে মামলার এ বিশাল জট, তাও নিরূপণ করা হবে। বিচার বিভাগকে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার প্রস্তাব করা হবে।’
আদালত সূত্রমতে, গত ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক করা হয়। তখন মামলার সংখ্যা ছিল ১৬ লাখের মতো। যে সংখ্যাগত ২০২৩ সালে এসে দাঁড়ায় প্রায় ৪৪ লাখে। চলতি বছরে তা আরও বেড়েছে। এই জট দূর করতে গত সরকারের সময় বিচার-সংশ্লিষ্ট কিছু আইন সংশোধনের সুপারিশ করা হলেও অবহেলা ও উদাসীনতায় সেগুলোর বেশিরভাগই বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। মামলার তুলনায় আদালত, এজলাস আর বিচারকের সংখ্যা অপ্রতুল। সবার আগে এই জটিলতা দূর করা না গেলে এই জট বাড়তেই থাকবে। বিশেষ করে ভূমি-সংক্রান্ত অনেক মামলা রয়েছে, যেগুলো ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলছে। এক আদালতে রায় হলে আপিল শেষে সেটা গিয়ে বর্তাচ্ছে উচ্চ আদালতে। এভাবেও সময় বেড়ে যাচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সাঈদুল মুনিম পিয়াস প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘শত বছরের পুরোনো আইন দিয়ে নানা অসুবিধার মধ্যে বিচারকাজ চলছে। পুরোনো আইনগুলো সংশোধন করে যুগোপযোগী করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সরকারকে সংশোধিত আইনে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর ব্যবস্থা যুক্ত করতে হবে। যেসব মামলা বাদী-বিবাদীদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যায়, সেগুলো এডিআরের আওতায় নিষ্পত্তি করতে হবে। বিশেষ করে মীমাংসাযোগ্য এবং জমি-সংক্রান্ত বিরোধের মামলাগুলোর ক্ষেত্রে এটি বেশি প্রযোজ্য হতে পারে। আমি অন্তত এই জট থেকে বের হওয়ার জন্য এর কোনো কার্যকর বিকল্প দেখছি না। একই সঙ্গে আদালত ও বিচারকের সংখ্যাও বাড়াতে হবে।’
ব্যারিস্টার সাঈদুল মুনিম বলেন, ‘তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতিবছর গড়ে সোয়া লাখ মামলার জট তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে বিচারকের সংখ্যা একটু বেড়েছে বলে মামলা নিষ্পত্তি গত এক দশকে কিছুটা বেড়েছে। তবে এই হার মামলা দায়েরের তুলনায় কম। মামলা দায়েরের বা রুজুর ক্ষেত্রেও পুলিশ এবং আদালতকে আরও সতর্ক হতে হবে। সবার আগে খেয়াল রাখতে হবে, মামলা দায়েরের আগেই সেটি কোনো প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করা যায় কি না। পাশাপাশি আরেকটি বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে, কেউ যাতে মিথ্যা মামলা দিয়ে কাউকে হয়রানি করার সুযোগ না পায়। এ ব্যাপারে আদালতের চেয়ে পুলিশের আরও বেশি ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে। মামলা রুজুর আগেই একটা প্রাথমিক তদন্ত করে নিলে বা স্থানীয় গণপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে আপস-মীমাংসা করা গেলে এক্ষেত্রে ভালো সুফল পাওয়া যাবে। এটাও এক ধরনের বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি। আইনেও যার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।’
ব্যারিস্টার সাঈদুল মুনিম বলেন, ‘বিপক্ষ-পক্ষের মধ্যকার বিরোধ নিষ্পত্তিতে ‘আপস-মীমাংসা’ একটি গুরুত্বপূর্ণ পন্থা হিসেবে বিবেচিত। এটাকে ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি’ নামেও অনেক সময় অভিহিত করা হয়। এ ব্যবস্থায় পক্ষদের মধ্যকার বিরোধ একদিকে যেমন দ্রুত নিষ্পত্তি হয় তেমনি কোনো পক্ষের মামলায় হেরে যাবার আশঙ্কা থাকে না। ফলে এর প্রভাবও হয় সুদূরপ্রসারী। বাংলাদেশে ‘আপস-মীমাংসা’র জন্য আইনে বিভিন্ন পদ্ধতির উল্লেখ রয়েছে। এক্ষেত্রে কোড অব সিভিল প্রসিডিউর (সংশোধন) আইন, ১৯০৮ এর ৮৯ এ, ৮৯ বি, ৮৯ সি ধারা, অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ এর ২২, ২৩, ২৪, ২৫ ধারা, পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩ এর ১১ এবং ১৫ ধারা এবং শ্রম আইন, ২০০৬ এর ২০৯, ২১০ এবং ২১৩ ধারার কথা বলা যেতে পারে।’
জট নিরসনের উপায় নিয়ে আরেক সিনিয়র আইনজীবী শফিক আদনান বলেন, ‘বিদ্যমান ফৌজদারি ও দেওয়ানি বিচার ব্যবস্থা শত বছরের পুরোনো। দেওয়ানি কার্যবিধির বয়স ১১৬ বছর, ফৌজদারির ১২৬ বছর। সাক্ষ্য আইনের বয়স ১৫২ বছর। পুরোনো এই বিচার ব্যবস্থাই আসলে বর্তমান প্রেক্ষাপটে দ্রুত বিচার নিশ্চিতের ক্ষেত্রে অন্তরায়। বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত করতে হলে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি শতাব্দীপ্রাচীন আইন সংস্কার ও নতুন আইন করা প্রয়োজন। ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের কিছু ধারা সংশোধন করাও জরুরি।’
অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ আতাউর রহমান এ বিষয়ে বলেন, ‘মামলাজট নিরসনে আটটি পক্ষকে আন্তরিক হতে হবে। এ পক্ষগুলো হচ্ছেÑ পুলিশ, সাক্ষী, প্রসিকিউশন, বিচারক, দুই পক্ষের আইনজীবী এবং মামলার বাদী ও বিবাদী। একই সঙ্গে মামলা অনুপাতে পর্যাপ্ত বিচারক নিয়োগ জরুরি।’
অবসরপ্রাপ্ত এই জেলা জজ বলেন, ‘বিচারকাজ ঝুলে থাকার একটি বড় কারণÑ আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগ থেকে সময়মতো সাক্ষীদের কাছে সমন বা নোটিস না পৌঁছানো। কারও বা কোনো পক্ষের হয়ে টাকার বিনিময়ে প্রসিকিউশন-সংশ্লিষ্টরা এটি করে থাকেন। আবার কখনও অবহেলা বা গাফিলতির কারণেও এটা ঘটে। সাক্ষীকে হাজির করার দায়িত্ব পুলিশের, সেটিও ঠিকমতো করা হয় না। আইনে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, সাক্ষীদের যাতায়াত খরচ আদালত বা সরকারের দেওয়ার কথা। কিন্তু বলা থাকলেও তা দেওয়া হচ্ছে না। বিভিন্ন মামলায় সাক্ষীকে বাদী বা বিবাদী তাদের নিজ তাগিদেই খরচ বহন করে আদালতে আনেন। কিন্তু ফৌজদারি মামলায় সাক্ষী পাওয়া কঠিন। কারণ একটি ঘটনার প্রায় চার-পাঁচ বছর পর পুলিশ সেটির চার্জশিট দেয়। তখন সাক্ষীকে আদালতে হাজির করতে চাইলে দেখা যায়, তারা স্থান পরিবর্তন করেছেন বা তাদের খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না। নিরাপত্তার কারণেও অনেকে সাক্ষী দিতে আসেন না। এসব কারণেও মামলার জট বেঁধে যায়।’
বিগত সরকারের শেষের দিকে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি ও জট কমিয়ে আনার ব্যাপারে আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে একটি প্রতিবেদন দাখিল করেছিল আইন কমিশন। ওই প্রতিবেদনে মামলাজটের পাঁচটি মূল কারণ উল্লেখ করা হয়। সেগুলো ছিলÑ পর্যাপ্ত বিচারক না থাকা, বিশেষায়িত আদালতে পর্যাপ্ত বিচারক নিয়োগ না হওয়া, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা, জনবলের অভাব এবং দুর্বল অবকাঠামো। ওই প্রতিবেদনে জরুরি ভিত্তিতে বিভিন্ন পর্যায়ে চার বছরে কমপক্ষে পাঁচ হাজার বিচারক নিয়োগ এবং আদালতে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য সুপারিশ করা হয়। উল্লেখ্য, এ ধরনের সুপারিশ এর আগেও একাধিকবার এসেছে। বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি ৯৪ হাজার ৪৪৪ জন মানুষের বিপরীতে বিচারকের সংখ্যা মাত্র একজন। বিদ্যমান নানা আইনি জটিলতা এবং পারিপার্শ্বিক অনেক কারণে তৈরি এই জটিলতা অসহনীয় ও উদ্বেগজনক।
কমিশন সূত্রমতে, তারা এই মামলাজট কাটিয়ে উঠতে যেসব পরামর্শ দেবেন বলে প্রাথমিকভাবে ভেবেছেন, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ বিচারকদের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং একই সঙ্গে তাদের সাপোর্টিং স্টাফ বাড়ানো; বিচার ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজেশন করা; সহকারী জজসহ প্রত্যেক বিচারকের জন্য একজন করে দক্ষ স্টেনোগ্রাফার নিয়োগ; বিচারকদের নিজ হাতে ১৬৪ ধারায় সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করার পরিবর্তে ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করা; কর্মদিবসের সময়কাল পরিবর্তন, অহেতুক আদালত মুলতবি ঘোষণা না করা; বিচারকদের কর্মস্থল ত্যাগ এবং এজলাসে ওঠা-না ওঠার ব্যাপারে আরও বেশি আন্তরিক হওয়া; দেওয়ানি মামলা, অর্থঋণ মামলা ও পারিবারিক মামলাগুলো বিচারের ক্ষেত্রে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির বিধানকে গুরুত্ব দেওয়া; আপিল মামলাসহ দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলায় উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানির পর দ্রুত রায় দেওয়া; সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করা এবং ফৌজদারি মামলা পৃথক তদন্তের স্বার্থে একটি পৃথক স্থায়ী অনুসন্ধানী এজেন্সি গঠন। এতে করে পুলিশের ওপর তদন্তের চাপ অনেকটা কমবে।