দীপক দেব
প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৪ ০৯:৪২ এএম
আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৪ ০৯:৪৩ এএম
ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশ-ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের চলমান টানাপড়েন ও রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই আজ সোমবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত হতে চলেছে দুই দেশের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে বৈঠক। ‘ফরেন অফিস কনসালটেশন’ (এফওসি) নামে পরিচিত বাংলাদেশি ও ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিবের এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকটি একটি নিয়মিত ও স্বাভাবিক কূটনৈতিক কার্যক্রম হওয়ার পরও পরিপ্রেক্ষিতগত একাধিক কারণে এবার এটিকে ঘিরে দেখা পর্যবেক্ষক থেকে শুরু করে সবার মধ্যেই দেখা দিয়েছে অতিরিক্ত আগ্রহ। বিশ্লেষকরা প্রত্যাশা করছেন, এ ফোরামে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রায় সব বিষয় নিয়েই আলোচনা হবে এবং চলমান সংকট থেকে বেরিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এফওসি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের এ সফরকে সম্পর্কের শীতলতার বরফ গলিয়ে দূরত্ব কমিয়ে আনার সূচনা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
আজ সকাল ১০টায় রাজধানীতে এফওসি বৈঠকে নিজ নিজ দলের নেতৃত্ব দেবেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মো. জসিম উদ্দিন এবং ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি। বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের মধ্যে এটিই উচ্চ পর্যায়ের প্রথম বৈঠক। এফওসি বৈঠকে অংশগ্রহণের পাশাপাশি ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রির প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের কথা রয়েছে।
জানা গেছে, আজ সকাল সাড়ে ৮টার পর ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি বিমানবন্দরে অবতরণ করে প্রথমে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনে যাবেন। সেখান থেকে বেরিয়ে তার সকাল ১০টায় এফওসি বৈঠকে অংশগ্রহণ করার কথা রয়েছে। দ্বিপাক্ষিক ওই বৈঠকের পর মধ্যহ্নভোজের বিরতির পর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের সৌজন্য সাক্ষাতের পর বিকাল ৪টায় ঢাকা ত্যাগ করার কথা রয়েছে তার।
কী নিয়ে আলোচনা হতে পারে
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মোহাম্মদ রফিকুল আলম আগেই জানিয়েছেন, ‘দুই দেশের মধ্যকার ‘কমন বিষয়’গুলোই তাদের আলোচনায় আসবে। দুই দেশের আলোচনায় সাধারণভাবে সীমান্ত, বাণিজ্য, কানেকটিভিটি ও পানির মতো বিভিন্ন বিষয় থাকে। তবে এজেন্ডায় শেষ পর্যন্ত কী থাকবে তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট উইং কাজ করছে।’
এদিকে মন্ত্রণালয়ের আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, এফওসি’তে দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনার পাশাপাশি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দুই দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আনার বিষয়ে জোর দেওয়া হবে। ভিসা নিয়ে চলমান জটিলতা কাটানোর জোর চেষ্টাও থাকবে। পাশাপাশি আগরতলায় সহকারী হাইকমিশনে হামলা ও সংখ্যালঘু নির্যাতনের জের ধরে ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশ সম্পর্কে অপতথ্য ও গুজব ছড়ানো বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হতে পারে। এ ছাড়া সীমান্ত হত্যা, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, ভারত থেকে নিত্যপণ্য আমদানি এবং বাংলাদেশ থেকে দেশটিতে রপ্তানির নানা বাধা সরানোসহ অন্যান্য বিষয়ও আলোচনা হতে পারে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে দিল্লিতে সর্বশেষ পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে বৈঠক হয়েছে।
শেখ হাসিনা প্রসঙ্গ না ওঠার সম্ভাবনাই বেশি
এদিকে এফওসি বৈঠকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার প্রত্যর্পণের প্রসঙ্গ আলোচনায় আসবে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয় বলে জানা গেছে। ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘যেহেতু শেখ হাসিনার নামে একাধিক মামলা হয়েছে এবং বিষয়টি এখন আদালত পর্যায়ে, তাই আদালতের কোনো নির্দেশনা না থাকায় প্রসঙ্গটি বৈঠকে না ওঠানোর সম্ভাবনাই বেশি। সম্পর্ক ভালো করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ভারতকে বিব্রত না করার অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের পক্ষ থেকে তাই এখনও এ নিয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।’ তা ছাড়া তিনি জানান, এফওসি বৈঠকে এজেন্ডা নির্ধারণের ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্মতি থাকতে হয়, কোনো দেশ এককভাবে এজেন্ডা ঠিক করতে পারে না।
প্রসঙ্গত, ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিষয়টি আলোচ্যসূচিতে থাকবে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া না গেলেও সেখান থেকে তার বক্তব্য-বিবৃতি দেওয়ার ব্যাপারে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে বহুবার প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা পর্যন্ত এ নিয়ে সাক্ষাৎকারে উষ্মা প্রকাশ করেছেন। তারপরও গত সপ্তাহে শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে আওয়ামী লীগ আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যোগ দিয়েছেন। লন্ডনেও একটি অনুষ্ঠানে তার টেলিফোনে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এ কারণে অনেকে মনে করছেন, ভারতে অবস্থান করে শেখ হাসিনার বিবৃতি দেওয়ার ব্যাপারে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আপত্তির বিষয়টি বৈঠকে উঠতে পারে।
যা বলছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেছেন, ‘আমি এর আগেও বলেছি যে, কোনো সমস্যার সমাধান করতে হলে আগে স্বীকার করতে হবে যে, সমস্যা আছে। আমাদের এটিও স্বীকার করতে হবে, ৫ আগস্টের আগে এবং পরে ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের একটি গুণগত পরিবর্তন হয়েছে। এটা মেনে নিয়ে আমাদের চেষ্টা করতে হবে সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। সে হিসেবে আমি প্রস্তাব করেছিলাম, আমাদের যে ফরেন অ্যাফেয়ার্স কনসালটেশন আছে, আসুন, সেটি শুরু করি।’
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘ভারত যদি আমাদের সবাইকে একসঙ্গে নিতে পারত তাহলে ভারতের সুবিধা হতো। আমাদেরও সুবিধা হতো। কিন্তু সেটা দুঃখজনকভাবে হচ্ছে না। ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপারে ভারতের অবস্থান খুবই ভালো। কিন্তু গত দু-তিন মাসে যে ব্যবসায়িক মন্দা যাচ্ছে, সেটা কি শুধু বাংলাদেশকে এফেক্ট করছে? এই অবস্থা শুধু বাংলাদেশকে এফেক্ট করছে না, ভারতকেও এফেক্ট করছে। পরিমাণটা অত কিন্তু বেশি না, তবে প্রভাব পড়ছে। কলকাতার অর্থনীতি, পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘আমরা আশা করি, এই অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারব। অচলাবস্থা কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো যোগাযোগ স্থাপন। সোমবার (আজ) ভারতের পররাষ্ট্র সচিব আসছেন। আমাদের পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে দেখা করবেন। এটা স্ট্যান্ডিং মেকানিজম, এটা অস্বাভাবিক কিছু না। প্রতি বছর আমাদের একজন যান ওপাশে, পরের বছর ওপাশ থেকে একজন আসেন। এটাকে কনসাল্টেশন বলা হয়, এটা দীর্ঘদিন ধরে চলছে। আমি আশা করব, তারা একটা ফলপ্রসূ আলোচনা করবে।’
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
এ প্রসঙ্গে সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবির বলছেন, ‘এজেন্ডায় যাই থাকুক, সব ধরনের উস্কানি নিরসন করে উত্তেজনা কমিয়ে এনে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে এবারের এই বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘সব মিলিয়েই দুই দেশের মধ্যে ‘সম্পর্কের শীতলতা’ কিংবা ‘উত্তেজনা’ তৈরি হয়েছে। বৈঠকে যদি এই উত্তেজনা কমিয়ে আনতে দুই দেশ একমত হতে পারে, তাহলেও তো সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দিকে অগ্রসর হওয়া যায়। আর সেটিই হওয়া উচিত।’
এ প্রসঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অব.) এম শহীদুল হক বলেন, ‘ভারতের পররাষ্ট্র সচিব যে আসছেন এতেই দুই দেশের মধ্যে একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। যদিও এটা রুটিন সফর। তারপরও ভারত সরকার বাণিজ্য চালিয়ে যেতে যে পলিসি নিয়েছে, সেটাকেও আমি ইতিবাচক হিসেবে দেখি। ইস্যু অনেক আছে। ভারতীয় হাইকমিশনার দুই দিন আগে বলেছেন, একটা ইস্যুতেই যেন সম্পর্ক না আটকে থাকে। আমি আশা করব, সম্পর্ক এগিয়ে নিতে যা যা আমাদের মধ্যে ছিল, সেটার চেষ্টা করবেন দুই দেশের পররাষ্ট্র সচিব। ভারতের যেমন আমাদের দরকার, তেমনি আমাদেরও ভারতকে দরকার। দুই পক্ষ থেকেই ইতিবাচক বার্তা আসবেÑ সেটা আমি আশা করি। এখন অনেক ইস্যু থাকলেও বরফ গলাতে লিস্ট লম্বা করতে চাই না। যোগাযোগটা আগে ঠিক হোক। ভিসাটা চালু হোক। ব্যবসায় যেন বাধা না থাকে।’