প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৭:১২ পিএম
বিদ্যুৎখাতে বছরে ৩২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া সম্ভব না বলে মন্তব্য করেছেন বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. ফাওজুল কবির খান। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে মোট ৫২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, মাথাপিছু ভর্তুকির পরিমান ৩ হাজার টাকা।
শনিবার (৭ ডিসেম্বর) ডিসিসিআই অডিটরিয়ামে জ্বালানির দাম ও সরবরাহ নিশ্চয়তা শীর্ষক সেমিনারে তিনি এই মন্তব্য করেন।
এই সেক্টরের ব্যবসায়ীদের প্রতি প্রশ্ন রেখে ফাওজুল কবির খান বলেন, প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ গড়ে বিক্রি করছি ৮.৯৫ টাকা দরে, আর কিনছি ১২ থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত। কেন বেশি দামে কেনা হলো, কারা চুক্তি করেছেন, কেন করেছেন! বাংলাদেশে ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করেছেন, তারা কি মনে করেননি, এত বেশিদাম কেন নিচ্ছি, তারা কি জাতিকে ক্ষতিপূরণ দিবেন?
তিনি বলেন, পুরনো ধারনা আইপিপি বিদ্যুৎ কেন্দ্র আর করা হবে না। আমরা মার্চেন্ট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দিকে যাচ্ছি, আপনারা নিজেরা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করবেন, নিজেরা গ্রাহক ও দাম ঠিক করবেন, বিইআরসিকে শুধু অবহিত করতে হবে। দশ-বিশ শতাংশ সরকার কেনার অপশন থাকবে, যাতে আর্থিক ঝুঁকি না থাকে।
বিগত সরকারের নীতির সমালোচনা করে জ্বালানি উপদেষ্টা বলেন, প্রতিযোগিতা নির্বাসিত হয়েছে, ওমুকের সঙ্গে পরিচয় ছিল আপনি বিদ্যুৎ কেন্দ্র পেয়ে গেলেন। এখন আর সেই সুযোগ নেই, উন্মুক্ত ছাড়া কোনো কেনাকাটা হবে না। ইতোমধ্যেই এর সুফল পেতে শুরু করেছি। চার-পাঁচ জনের জায়গায় ১২ জন পাচ্ছি এতে ৩২ শতাংশ সাশ্রয় হয়েছে। এলএনজি উন্মুক্ত করে দিয়েছি। জানালা-দরজা বন্ধ করে দমবন্ধ অবস্থায় ফেলা হয়েছিল, আমরা সব খুলে দিয়েছি, আপনি ভালো ব্যবসায়ী হলে ব্যবসা করতে পারবেন। এখানে কোনো পরিচয়ের দরকার হবে না।
গ্যাসের ঘাটতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট, সরবরাহ দিচ্ছি ৩ হাজারের কম। এখানে ১ হাজারের মতো ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। ভোলাতে উদ্বৃত্ত গ্যাস রয়েছে একটি মাত্র কোম্পানিকে দেওয়া হলো সিএনজি করে আনতে। আমরা এটি উন্মুক্ত করে দেব, সেখান থেকে সিএনজি কিংবা এলএনজি করে আনতে পারেন। সৌরি বিদ্যুতের ৪০টি প্রজেক্টের পর্যায়ক্রমে দরপত্র হবে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার প্রচুর পরিমাণে পতিত জমি রয়েছে। আমরা জমি দেব, লাইন করে দেব, আপনারা এসে শুধু প্রকল্প করবেন।
তেল-গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করার কথা জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, ৪৮ কূপ খনন প্রকল্প চলমান রয়েছে। আগামী ২ বছরে আরও ১০০টি করা হবে।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় কিছু আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, আমি এক সময় আমলা ছিলাম, এখন নিজের ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করতে হচ্ছে। একটি নির্দিষ্ট অংকের বেশি হলে থার্ডপার্টি কনসালটেন্ট নিয়োগ দিতে হবে, সময় লাগবে ১ বছর। অথচ থার্ডপার্টির কাছে কোনো তথ্য নেই। আমি আধা সরকারি পত্র দিয়েছি, পেট্রোবাংলা নিজে করবে। তাতে আমাদের অর্থ ও সময় সাশ্রয় হয়। এখানে ব্যবসায়ীদেরকেও আওয়াজ তোলার আহ্বান জানান তিনি।
উপদেষ্টা বলেন, মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনছেন, আপনাদের অভিযোগ সত্য মন্ত্রণালয় কাজগুলো করতে ব্যর্থ হয়েছে। আবার যখন দেখা হবে আমাদের তখন যেনো এই কথাগুলো বলতে না পারেন, সে ব্যবস্থা করতে হবে।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ম. তামিম বলেন, জ্বালানির দাম কোনোভাবেই প্রেডিক্ট করার সম্ভব না, দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানির দাম কখনই সঠিক হয়নি। বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট উৎপাদনে খরচ পড়ছে (২০২৩-২৪) ১১.৫১ টাকা, আর বিক্রি (পাইকারি) করা হচ্ছে ৭.০২ টাকা দরে। আবার গ্যাসের দরেও ঘাটতি রয়েছে। এভাবে ঘাটতি রেখে একটি সেক্টর চলতে পারে না। শুধুমাত্র ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় কয়লাভিত্তিক প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৬.৫ টাকা থেকে বেড়ে ৯.১৭ টাকা হয়েছে।
ম. তামিম তার সুপারিশে বলেন, আদানি ছাড়া ভারত থেকে অন্য যে বিদ্যুৎ আসছে সেগুলোর দাম অনেক কম। বাংলাদেশে উৎপাদিত কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গড় খরচ পড়ছে ১২.৪৬ টাকা, আর একই সময়ে আদানিকে দিতে হয়েছে ১৪.৮৩ টাকা করে। এটার দাম বেশি হবে কেনো, ওই চুক্তিটি রিভিউ করা উচিত। সৌর বিদ্যুতের গড় দর পড়ছে ১৬.৪৮ টাকা, ওই চুক্তিগুলোও রিভিউ হওয়া দরকার।
তিনি বলেন, গ্যাস সংকট আরও প্রকট হতে পারে। বিবিয়ানার উৎপাদন আরও কমে যেতে পারে, তার জন্য প্রস্তুতি রাখা উচিত। এফএসআরইউ আরও লাগবে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত সেমিনারে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন- ডিসিসিআই প্রেসিডেন্ট আশরাফ আহমেদ, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন প্রমুখ।