প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০২৪ ০০:২০ এএম
আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০২৪ ১০:৩১ এএম
প্রতীকী ছবি
৫ আগস্টের পর থেকে ঢাকার কেন্দ্রীয় এবং দেশের বিভিন্ন কারাগারে কারারক্ষীসহ কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতা, কয়েদি নির্যাতন, টাকার বিনিময়ে দেখভাল, যখন-তখন ভিআইপি বন্দিদের বাইরে স্বজনদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলতে দেওয়া বা গোপনে বিশেষ ব্যবস্থায় সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেওয়াসহ নানান অনিয়মই এখন কারাগারের ভেতরকার প্রচলিত নিয়ম। সবই চলে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে। সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, বিশেষ করে ঢাকার কেরানীগঞ্জ এবং গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে দুর্নীতির বর্তমান চিত্র ভয়াবহ। এমন অবস্থার মধ্যেই বুধবার (৪ ডিসেম্বর) এক ব্রিফিংয়ে কথা বলেছেন কারা অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মোহাম্মদ মোতাহের হোসেন।
কারাগারে গত তিন মাসের পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মহাপরিদর্শক বলেন, বাইরে থেকে শোনা আর মনগড়া সব অভিযোগ ঠিক নয়। এরপরও দুর্নীতি-অনিয়মে জড়িত অভিযোগে চার কারা কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। একজনকে করা হয়েছে সাসপেন্ড। আরও কিছু অভিযোগ তদন্তাধীন।
কাশিমপুর আর কেরানীগঞ্জ কারাগারে থাকা সাধারণ বন্দিদের অনেকেরই অভিযোগ, কারাগারের অনিয়ম নতুন কিছু নয়। কিন্তু গত তিন মাসে অবস্থা আরও বেশি খারাপ। কারা কর্মকর্তা আর রক্ষীদের অনেকেই এখন যেন টাকা ছাড়া কিছুই চেনেন না। শিল্পপতি, ব্যবসায়ীসহ ভিআইপি ও রাজনৈতিক বন্দি বেশি হওয়ার কারণে এখন তাদের চাহিদাও বেড়ে গেছে। বন্দিদের খাবার, স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ, কারাগারে ভালো স্থানে থাকার ব্যবস্থা এবং তাদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়াÑ সবকিছু চলে টাকার বিনিময়ে। দিতে না পারলে কয়েদিদের দুর্বিষহ জীবনযাপন করতে হয়। কারা কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ মদদে দাগি আসামি, শীর্ষ সন্ত্রাসী ও চিহ্নিত আসামিরা কারাগারে বসেই নিয়ন্ত্রণ করছে তাদের বাইরে থাকা সিন্ডিকেট। গণবিরোধী কর্মকাণ্ড চালিয়েও বিত্তশালী বন্দিরা টাকার জোরে রয়েছেন ‘জামাই আদরে’। পক্ষান্তরে সাধারণ বন্দিরা বঞ্চিত হচ্ছেন তাদের সামান্য প্রাপ্য অধিকার থেকে। কারাগারের কিছু অসাধু কর্মকর্তা কথিত ভিআইপি বন্দিদের সব ধরনের অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা করে দিচ্ছেন মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে। কারা অভ্যন্তরে কথিত ভিআইপি বন্দিদের এই সুবিধা করে দেওয়াসহ নানান অনিয়মের নেপথ্যে জড়িত থাকেন ডিআইজি, জেল সুপার এবং জেলাররা পর্যন্ত। বন্দিরা কে কত টাকা দিতে পারছেন, তার ভিত্তিতে এই কর্মকর্তারা নির্ধারণ করে দেন- কে কতটা সুযোগ-সুবিধা পাবেন।
সদ্য কারামুক্ত কয়েক বন্দির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কারাগারে প্রবেশপথেই বন্দিদের দীর্ঘ সময় বসিয়ে রেখে নগদ অর্থ দাবি করা হয়। টাকা পেলে তাদের সঙ্গে ভদ্র আচরণ করা হয়। ভিআইপি সিট বরাদ্দ দেওয়ার নামে কারাসংশ্লিষ্টরা নতুন আসা বন্দির কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়। ভালো সেলে থাকতে হলে হাজতি প্রতি সপ্তাহে পাঁচ হাজার টাকা দিতে হয়। ওয়ার্ড ইনচার্জ ও রাইটার এ টাকার রফা করেন। একজন চিফ রাইটার হতে হলে তাকে ৩০ লাখ টাকা দিয়ে চুক্তিবদ্ধ হতে হয়। বিভিন্ন কারাগারে ডিআইজি প্রিজন, জেলার ডেপুটি জেলার ও কয়েকজন কারারক্ষী মিলে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন জেলখানাগুলোর ভেতর। বন্দিরা বাইরে টেলিফোন করতে চাইলে রক্ষীরাই সেটার ব্যবস্থা করে দেন। প্রতি দুই মিনিটের জন্য এক হাজার টাকা করে দিতে হয়।
বন্দিদের জন্য বরাদ্দ খাবার নিয়ে চলে হরিলুট। অনেকের মতে, এ খাবার খাওয়ার অযোগ্য। যারা খায়, তারা বাধ্য হয় খেতে। যাদের সামর্থ্য আছে তারা কারা ক্যান্টিনে খান। ভালো একটা উদ্দেশ্য নিয়ে করা হলেও কারাগারের এই ক্যান্টিন হচ্ছে অবৈধ আয়ের একটি বড় উৎস। টাকা ছড়ালে এ ক্যান্টিনে সবকিছুই পাওয়া যায়। তবে বাইরের চেয়ে দাম এখানে অনেক বেশি। গরুর গোশত দুই হাজার টাকা কেজি।
সংবাদ সম্মেলনে কারা মহাপরিদর্শক
বুধবার সকালে পুরান ঢাকার কারা অধিদপ্তরে গত তিন মাসের কারাগারের পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে কারা মহাপরিদর্শক সৈয়দ মোহাম্মদ মোতাহের বলেন, দুর্নীতি-অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগে চার কারা কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। আরও কিছু অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চেষ্টা চলছে আরও ভালো করার।
কারাগারে বন্দির সংখ্যা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের ধারণ ক্ষমতা ৪২ হাজার। ৫ আগস্টের আগে বন্দি ছিল ৫৫ হাজার। যদিও গণঅভ্যুত্থানের পর সেই সংখ্যা কমে গিয়েছিল। এখন আবার গ্রেপ্তার চলছে। ফলে বন্দির সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী। এখন এই সংখ্যা ৬৫ হাজার।
কারাগারে কতজন ডিভিশন পেয়েছেন এবং রাজনৈতিক বন্দিদের ডিভিশন দেওয়া হয়েছে কি না- জানতে চাইলে আইজি প্রিজন বলেন, কারাগারে দুই ধরনের ডিভিশন দেওয়া হয়। একটা হলো প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা, আরেকটা হলো যারা সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি। তাদের বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সিদ্ধান্ত দেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অনেকেই এ সুবিধা পেয়েছেন। আবার অনেকের আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তিনি আরও বলেন, কারাগারগুলোতে বিশেষ বন্দিদের সংখ্যাও কম নয়। তবে সকল সময়ের মতো কারাবিধিসহ অন্যান্য বিধিবিধানের আলোকে তাদের নিরাপদ আটক ও প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা হচ্ছে। বিশেষ প্রকৃতির বন্দিদের ওয়ার্ড/সেলে মোবাইল ফোন জ্যামার স্থাপন করাসহ সিসি ক্যামেরা দ্বারা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং প্রতিদিন কয়েকবার তল্লাশি করা হয়।
কারা মহাপরিদর্শক আরও বলেন, কারাবন্দিরা যোগাযোগের ক্ষেত্রে আদালতের আদেশ ছাড়াও সকল প্রকার বিচারাধীন বন্দি প্রতি ১৫ দিনে এবং সাজাপ্রাপ্ত বন্দি ৩০ দিনে আইনজীবীসহ একবারে পরিবারের সর্বোচ্চ পাঁচজন সদস্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেন। এ ছাড়া প্রত্যেক বন্দিই প্রতি ৭ দিনে একবার আইনজীবীসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তিনটি নম্বরে ১০ মিনিটের জন্য কথা বলার সুযোগ পান। শ্রেণিপ্রাপ্ত বন্দিরা দিনে দুইবেলা এবং অন্য সকল বন্দি দিনে একবেলা আমিষ জাতীয় খাবার পান। কারাগারের ভেতরের ক্যান্টিনে পণ্যের দাম ন্যায্যতার সঙ্গে নির্ধারণসহ ক্যান্টিন সুবিধা সবার জন্যই উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিবিশেষে মাসিক সর্বোচ্চ ব্যয় নির্ধারণ করে দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি কারাগারে বন্দিদের মোবাইল ফোন ব্যবহারসহ আয়েশী জীবনযাপন করার বিষয় নিয়ে প্রশ্নের জবাবে কারা মহাপরিদর্শক বলেন, বিশেষ প্রকৃতির বন্দিদের নির্ধারিত এলাকায় মোবাইল ফোন জ্যামার এবং সিসি ক্যামেরা থাকায় মোবাইল ফোন ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। বিধি অনুযায়ী শ্রেণিপ্রাপ্ত বন্দি খাট, চেয়ার-টেবিল, পত্রিকার পাশাপাশি কিছু অতিরিক্ত খাদ্যদ্রব্য পেয়ে থাকেনÑ যা দিয়ে আয়েশী জীবনযাপন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। অপরদিকে কোনো বন্দিকে কারাগারের বাইরে পাঠানোর সময় প্রধান ফটক পর্যন্তই কারা কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ ও দায়দায়িত্ব থাকে। এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তত্ত্বাবধানে বিধি মোতাবেক নিরাপত্তাসহ হাতকড়া/ডান্ডাবেড়ি পরানো, প্রিজন ভ্যান/মাইক্রোবাসে নেওয়া ইত্যাদি পরিচালিত হয়ে থাকে। তবে কয়েকটি গণমাধ্যমে কারাগার ও কারাবন্দিদের নিয়ে ধারণাগত সংবাদ প্রচার করার ফলে জনমনে কারাগার সম্পর্কে নেতিবাচক তথ্য পৌঁছাচ্ছে বলে কারা কর্তৃপক্ষ মনে করে।
তিনি আরও বলেন, কারাগারগুলোতে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সেগুলো হলোÑ কারা অভ্যন্তরের সকল প্রকার তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে। এ ছাড়া অবৈধ দ্রব্যাদির প্রবেশ রোধকল্পে প্রবেশপথে বডিস্ক্যানারসহ অন্যান্য আধুনিক সরঞ্জামাদি স্থাপন করা হয়েছে। কারা অভ্যন্তরে মাদকদ্রব্যের প্রবেশ রোধকল্পে ঝুঁকিপূর্ণ কারাগারগুলোতে ডগ স্কোয়াড মোতায়েন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে। সৎ ও যোগ্যতাসম্পন্ন অফিসার এবং কারারক্ষীদের পেশাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে কারা সদর দপ্তরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কারাগারে পদায়ন করা হয়েছে। অসাধু কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে চাকরি হতে অপসারণ, তাৎক্ষণিক বদলিসহ সকল প্রকার বিভাগীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে। তবে আইনি দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অনেকে আবার অপরাধমূলক কার্যক্রমে জড়িত হচ্ছেন বিধায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে আইনি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কারা মহাপরিদর্শক বলেন, জুলাই ও আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ২ হাজার ২০০ আসামির মধ্যে ১ হাজার ৫০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও ফাঁসির সাজাপ্রাপ্তসহ ৭০০ আসামি এখনও পলাতক। এদের মধ্যে ৭০ জন জঙ্গি ও দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি।
গত তিন মাসে কারাগার থেকে এখন পর্যন্ত ১১ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ আলোচিত ১৭৪ আসামিকে মুক্তি দেওয়া হয় বলেও জানান তিনি।
সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে সাবেক মন্ত্রী ও নীলফামারী-২ (সদর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য কারাবন্দি আসাদুজ্জামান নূরের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এ প্রসঙ্গে সৈয়দ মোতাহের বলেন, কারারক্ষীরা সেখানে উপস্থিত থাকলেও নিশ্চিতভাবে নিরাপত্তার দুর্বলতা ছিল। কারা অধিদপ্তর বিষয়টি খতিয়ে দেখছে, যাতে পরবর্তীকালে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে।
কারাগারের লোগোতে নৌকাসহ অন্যান্য জিনিস রয়েছে উল্লেখ করে মহাপরিদর্শক জানান, কারা অধিদপ্তরের লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।