আইনশৃঙ্খলা
পারভেজ খান
প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০২৪ ০৮:৩৬ এএম
আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২৪ ০৯:২৫ এএম
যৌক্তিক-অযৌক্তিক নানা দাবি আর তুচ্ছ সব বিষয় নিয়ে আন্দোলনের নামে কথায় কথায় অরাজক অবস্থা সৃষ্টি করা হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই রাজধানীসহ দেশের কোথাও-না কোথাও কিছু-না কিছু একটা ঘটেই চলেছে। শান্ত পরিবেশ হঠাৎ করে চরম অশান্ত হয়ে উঠছে। পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, সংঘাত, ক্রোধ, আক্রোশ, প্রতিহিংসা সব যেন একযোগে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বিশেষ করে শিক্ষাঙ্গনের চিত্র একেবারেই করুণ। যেকোনো ইস্যু নিয়েই শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে তুলকালাম কাণ্ড বাধিয়ে দিচ্ছে। বেশ কিছুদিন ধরে পোশাক শিল্পের শ্রমিকরা তাদের দাবিদাওয়া নিয়ে যখন তখন রাস্তায় নেমে যাচ্ছেন। গত কয়েকদিন রাজধানীকে অচলাবস্থা সৃষ্টি করে রাখেন ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকরা। এরকম আরও নানা ঘটনায় দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়ছে। এমনকি এসব বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন কি নাÑ এমন প্রশ্নও উঠেছে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন চরম। নিয়মিত আন্দোলন, সড়ক অবরোধ, সচিবালয় ঘেরাও, যৌক্তিক থেকে অযৌক্তিক নানা দাবিতে উত্তেজনা সৃষ্টি, সড়ক অবরোধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর, মালামাল লুট এখন রোজকার ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংঘাতের জেরে বন্ধও হয়ে গেছে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বন্ধ হচ্ছে প্রাথমিক ভর্তি কার্যক্রমও। রাজধানীর কবি নজরুল সরকারি কলেজ এবং সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সর্বশেষ পুরান ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
চলমান এসব ঘটনায় উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা। অতিষ্ঠ জনজীবন। যানজট বেড়ে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। এ ছাড়া পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে এমন পরিস্থিতির প্রভাব গিয়ে পড়ছে প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত দেশের প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থীর ওপর। প্রভাব পড়ছে বাজারদরেও। অনেকেই মনে করছেন, সরকারের এক ধরনের দুর্বলতা বা সিদ্ধান্তহীনতা এবং অতি সতর্ক মনোভাব ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা পরিস্থিতিকে আরও উস্কে দিচ্ছে। আবার কারও কারও মতে, একটি বিশেষ মহল এই সরকারকে বিপাকে ফেলতে শিক্ষার্থীদের উস্কানি দিচ্ছে। নেপথ্য থেকে কলকাঠি নেড়ে এবং ছদ্মবেশে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে মিশে গিয়ে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে একটি মহল। সরকারের পক্ষ থেকেও বক্তব্য এসেছে, দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলা এসব সংঘাতের পেছনে কারও ইন্ধন আছে কি না খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ গণমাধ্যমকে বলেন, শুধু তো শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছে না; শিক্ষার্থী আছে, শ্রমিক আছে, শিক্ষকরাও নানা দাবিতে আন্দোলন করছেন। তারা সড়ক আটকাচ্ছেন। এগুলোর সমাধান কী করে হবে? আমি তো একা সমাধান করতে পারছি না।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তোমাদের ন্যায্য দাবি আমার কাছে নিয়ে এসো, সেগুলো পূরণ করা হবে। ন্যায্য দাবি আমরা সমাধান করব। কিছু দাবি আছে যেগুলো ন্যায্য না, সেগুলো মানব না। ন্যায্য দাবি না হলেও রেললাইন অবরোধ করা হচ্ছে, যাত্রীদের আক্রমণ করা হচ্ছে। এগুলো করলে জনগণই তাদের বিরুদ্ধে যাবে।’
শিক্ষার্থীদের সহিংসতা নিয়ে গত সোমবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ লিখেছেন, ‘শত চেষ্টার পরও, বসে সমাধান করার আহ্বান জানানোর পরও শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে জড়ানো থেকে আটকানো গেল না। অ্যাগ্রেসিভনেস ও প্রস্তুতি দেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও স্ট্রিক্ট অ্যাকশনে যায়নি। কোনো প্রকার অ্যাকশনে গেলেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং ছাত্রদের মধ্যে সংঘর্ষ ও রক্তপাত হতো। একত্রে দেশ গড়ার সময়ে সংঘর্ষের মতো নিন্দনীয় কাজে জড়ানো দুঃখজনক। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
শুধু সরকারের উপদেষ্টারা নন, দেশের বিশিষ্টজনরাও শান্তি বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান গতকাল মঙ্গলবার সিলেটে এক কর্মশালায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে দেওয়া বক্তব্যে, দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার লক্ষ্যে একটি চক্রের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, সম্প্রতি বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে সংঘাত-সংঘর্ষ হয়েছে, সরকার তার প্রতি নজর রাখছে। আমরা ছাত্র-ছাত্রীদের কোনো ধরনের সংঘর্ষে না জড়িয়ে শান্ত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। এ ধরনের সংঘাতের পেছনে কোনো ইন্ধন আছে কি না আমরা খতিয়ে দেখছি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ দেশের অন্য যেকোনো অঙ্গনে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির যেকোনো চেষ্টা কঠোর হাতে দমন করা হবে।
সরকারের এই অতি নমনীয়তা আর পুলিশের ব্যর্থতা যখন নানাভাবে সমালোচিত হচ্ছে তখন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘যারা আন্দোলন করছে, তারা আমারই ভাই, কার ওপর কঠোর হব। আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি। কারও রাস্তায় নামার প্রয়োজন নেই। রাস্তা ব্লক না করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এসেও দাবি জানাতে পারে। তাদের প্রতিনিধি গিয়ে আমাদের সঙ্গে সমস্যা নিয়ে আলাপ করতে পারে। বিভিন্ন কলেজের সমস্যা নিয়ে ছাত্র প্রতিনিধিরা নিজেদের মধ্যে আলাপ করতে পারে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বলা হচ্ছে, পুলিশের ব্যর্থতার কারণে এসব ঘটনা বেড়েই চলেছে এবং পুলিশ দমন করতে পারছে না। পুলিশ পারছে না, এটা সত্য। কিন্তু কেন পারছে না, সেটাও ভেবে দেখা উচিত। এ ধরনের আন্দোলন কঠোর হাতে দমন করতে হয়। কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে তাদেরকে ধৈর্য ধরতে বলা হচ্ছে। কেউ যদি আন্দোলনের নামে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, অস্ত্র লুট করে তখন কঠোর না হয়ে বিকল্প কোনো পথ থাকে না। ভাই হলেও কি কেউ আইনের ঊর্ধ্বে?’
তিনি আরও বলেন, একটা অস্থিরতা শেষে আবার নতুন করে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। তবে এটাও সত্য যে, কোমলমতি শিক্ষার্থীরা আবেগে চলে। তারা বুঝতে পারছে না যে, তারা কত বড় ভুল করছে। পাশাপাশি একটি মহল তাদের ভুল পথে চলতে প্ররোচিত করছে। এই শিক্ষার্থীদের ঠেলে দিচ্ছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দিকে। তারা যেটা করছে বা তাদেরকে দিয়ে যেটা করানো হচ্ছে, এটা তো কোনো ছাত্র আন্দোলনের চরিত্র হতে পারে না। এদেরকে দমন করা পুলিশের জন্য কঠিন কোনো কাজ নয়। কিন্তু এতে করে যে কঠোরতা দেখাতে হবে, সেটা তারা দেখাতে চায় না। কেননা এই ছাত্ররাই আজকে নতুন বাংলাদেশের সৃষ্টি করেছে। এদেরকে দমাতে হলে সরকারকে কৌশলী মনোভাব নিয়ে এগোতে হবে। যারা নেপথ্য থেকে কলকাঠি নাড়ছে, তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
বিশিষ্টজনরা যা বলছেন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বিগত পনেরো বছর কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা রাষ্ট্রকাঠামোয় গেড়ে বসায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে গোটা সমাজে। কর্তৃত্ববাদী আচরণ সমাজের নানা অংশে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষত সাধারণ মানুষের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর প্রবণতা বেড়েছে। এই ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে মানুষ মবে রূপান্তর হচ্ছে। যখনই তারা মবে রূপ নিচ্ছে তখন কোনো যুক্তির ধার ধারছে না। তারা যে জনদুর্ভোগ বাড়াচ্ছে কিংবা কারও ক্ষতি করছে, তা-ও তাদের বোধের মধ্যে নেই। বিষয়টি সামাজিক ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক। শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি দুঃখজনক।
তিনি আরও বলেন, জননিরাপত্তা কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক অবস্থার ব্যাপারে সরকারকেই সুরাহা সন্ধান করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে ভালো নয় তা অস্বীকারের পথ নেই। সরকারের এসব ব্যাপারে উদাসীন থাকার অবকাশ নেই। সমাজে যে বিশৃঙ্খলা মাথাচাড়া দিচ্ছে তার সমাধানেও গণতান্ত্রিক মতাদর্শ প্রতিষ্ঠায় সব রাজনৈতিক পক্ষকে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে। না হলে অরাজকতা আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক, ড. জোবাইদা নাসরীন বলেন, জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এই সরকারের দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। এরই নজির বিগত কদিন রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকদের আন্দোলন, স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। ডেমরায় শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের ঘটনার দায় সরকার এড়াতে পারে না। বিগত কর্তৃত্ববাদী সরকারের আমলে এসব ঘটনার ক্ষেত্রে বরাবরই দায় এড়াতে দেখেছি। বিশেষত এক্ষেত্রে অদৃশ্য পক্ষের দিকে দোষ চাপানোর প্রবণতাই ছিল বেশি। অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষেত্রেও আমরা দেখছি বিদ্যমান বিশৃঙ্খলার দায় অন্য কোনো অদৃশ্য পক্ষের ওপর চাপিয়ে নিজেদের দায় এড়ানোর চেষ্টা চলছে। এগুলো কর্তৃত্ববাদের লক্ষণ।
তিনি আরও বলেন, সরকারের ব্যর্থতার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। বরং রাষ্ট্রের সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকারকে আরও সক্রিয় পরিকল্পনা ও ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে যারা দাবিদাওয়া কিংবা প্রতিবাদ করছেন, তাদের সঙ্গে আলোচনার পথ তৈরি করতে হবে। কিন্তু এক্ষেত্রেও সরকারকে কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যাচ্ছে না। ফলে এই সমস্যা এখন সামাজিক ও জননিরাপত্তার জন্য বাড়তি বিড়ম্বনায় পরিণত হয়েছে। সরকারকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে, না হলে সমাজের সর্বত্র বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়বে এবং তা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ থাকবে না।
ছাত্রদের নানা অন্যায্য দাবির কাছে মাথা নত করেছে সরকারÑ এমন মন্তব্য করে ঢাবির আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্রিয় না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। ছাত্রদের উচিত ছিল পড়াশোনায় ফিরে যাওয়া। কিন্তু পড়াশোনায় ফিরে না গিয়ে ছাত্রদের একটি অংশ রাজনীতি বা রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রে বেশি আগ্রহী হয়েছে। ছাত্রদের অন্যায্য দাবির কাছে সরকারের নতিস্বীকার করা ঠিক হয়নি। দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে শিক্ষার্থীদের আরও বিনয়ী হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ।
সম্প্রতি যা ঘটল
গত রবিবার রাজধানীর সেন্ট গ্রেগরি হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ এবং ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ইনস্টিটিউট হাসপাতালসহ পাঁচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘবদ্ধভাবে হামলা চালানো হয়েছে। সংঘবদ্ধ হয়ে হামলা চালায় কমবেশি ৩৫টি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। ব্যাপক ভাঙচুর করে তারা।
সূত্রাপুর থানার ওসি সাইফুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সেন্ট গ্রেগরি, ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ, ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট, সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও কবি নজরুল কলেজে হামলা ও ভাঙচুর হয়েছে। পরিস্থিতি শান্ত করতে গেলে পুলিশের ওপর হামলা হয়। দুজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। একটি অস্ত্রের ম্যাগাজিনও খোয়া গেছে।
হামলাকারী বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের দাবি, ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে আক্রান্ত হয়ে ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের শিক্ষার্থী অভিজিৎ হালদার গত ১৬ নভেম্বর ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে ভর্তির পর ১৮ নভেম্বর মারা যান। তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ২০ ও ২১ নভেম্বর হাসপাতাল অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগÑ ওইদিন ন্যাশনাল মেডিকেলে অভিজিৎকে ভুল চিকিৎসা দেওয়া হয়। হামলাকারীদের মধ্যে ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজ, ঢাকা কলেজ, ঢাকা আইডিয়াল কলেজ, সিটি কলেজ, গিয়াসউদ্দিন কলেজ, সরকারি তোলারাম কলেজ, ইম্পেরিয়াল কলেজ, বোরহানউদ্দিন কলেজ, বিজ্ঞান কলেজ, লালবাগ সরকারি কলেজ, উদয়ন কলেজ, আদমজী, নটর ডেম, রাজারবাগ কলেজ, নূর মোহাম্মদ, মুন্সি আব্দুর রউফ কলেজ, সিদ্ধেশ্বরী কলেজ, গ্রিন লাইন পলিটেকনিক, ঢাকা পলিটেকনিকসহ রাজধানীর প্রায় ৩৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়। সংঘর্ষে অন্তত ৪০ জন আহত হয়েছে।
এই হামলার জেরে গত সোমবার দুপুরে ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজে পাল্টা হামলা চালায় কবি নজরুল সরকারি কলেজ ও সোহরাওয়ার্দী কলেজের ছাত্ররা। তারা কলেজের ভবনে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে, জানালার গ্লাস ভাঙচুর করে। এ সময় পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এ ঘটনায়ও আহত হয়েছে বেশ কয়েকজন।
গত ১৮ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত তিতুমীর কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় করার দাবিতে মহাখালী রেল ও সড়কপথ অবরোধ করে আন্দোলন করে শিক্ষার্থীরা। এ সময় চলন্ত ট্রেনে ইটপাটকেল ছোড়া হলে ট্রেনে থাকা শিশুসহ কয়েকজন আহত হয়। বিক্ষোভকারীরা দুটি আন্তঃনগর ট্রেন আটকে দেয়। এতে ঢাকার সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
গত ২৪ নভেম্বর তেজগাঁওয়ে বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স) ও ঢাকা পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে আহত হয়েছে শতাধিক শিক্ষার্থী। বুটেক্সের আজিজ হল ও ঢাকা পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের লতিফ হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে। সংঘর্ষের কারণ সম্পর্কে নানা তথ্য পাওয়া যায়। কেউ বলছে, টং দোকানে সামান্য কথাকাটাকাটি থেকে এর সূত্রপাত। আবার কেউ বলছে, পরিকল্পিতভাবে একপক্ষ হামলা করেছে।
গত ২০ নভেম্বর সামান্য বাসে ওঠা নিয়ে বাগ্বিতণ্ডার জেরে রাজধানীর সায়েন্সল্যাব এলাকায় সংঘর্ষে জড়ায় ঢাকা কলেজ ও সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরা। ওই ঘটনায় কার্যত অচল হয়ে পড়ে পুরো রাজধানীর সড়কপথ। প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে চলা এই সংঘর্ষের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করতে হয়। সংঘর্ষে উভয়পক্ষের অন্তত ৩০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়। এর ঠিক দুদিন আগেই সরকারি তিতুমীর কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দাবিতে রেললাইন অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা। ব্যাহত হয় রেল যোগাযোগ।
গত ২১ নভেম্বর হলের সিট বরাদ্দের জেরে চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে শিক্ষার্থীদের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে অচল হয়ে পড়ে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম। কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের অনেক এলাকায়ই নানা দাবি অথবা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নিয়ে আন্দোলনে মাঠ গরম করছে শিক্ষার্থীরা। কমিটি নিয়ে বিরোধের জেরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের দুইপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে গত ২৩ নভেম্বর। এ সময় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে।
এ ছাড়া ২০১৭ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তি বাতিল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নেওয়া ঢাকা কলেজ, ইডেন সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ এবং মিরপুরের সরকারি বাঙলা কলেজ দীর্ঘদিন ধরে তাদের দাবিতে রাজপথ অস্থির করে রেখেছে। তাদের দাবি, এই সাত কলেজের জন্য স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে সাত কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করার আট বছর পর এসে এখন এসব কলেজের শিক্ষার্থীরা বলছে, সরকারের ওই সিদ্ধান্ত ছিল সম্পূর্ণ অপরিকল্পিত। ফলে যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে কলেজগুলোকে অধিভুক্ত করা হয়েছিল, তা আট বছরেও অর্জন করা সম্ভব হয়নি।
উচ্চ আদালতের একটি সিদ্ধান্তকে ঘিরে কদিন আগে ঢাকা মহানগরে ইজিবাইক, রিকশাসহ ব্যাটারিচালিত যানবাহন চলাচলের দাবিতে সমাবেশ আর বিক্ষোভ করে অচলাবস্থা তৈরি হয় রাজধানীতে। তাদের আন্দোলনে ঢাকার সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। গঠন হয় ‘রিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা-ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদ’। এখনও তাদের বিষয়ে চূড়ান্ত ফয়সালা হয়নি। তবে এক মাসের জন্য হাইকোর্টের আদেশের ওপর স্থিতাবস্থা দেওয়ায় আপাতত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে বিনা সুদে লাখ টাকা ঋণের ‘প্রলোভন দেখিয়ে’ সারা দেশ থেকে গত সোমবার হাজার হাজার মানুষ এনে শাহবাগে জমায়েতের চেষ্টা করে ‘অহিংস গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশ’ নামে একটি সংগঠন। এই সংগঠনের সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব মাহবুবুল আলম চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সংগঠনটির ‘আহ্বায়ক’ মোস্তফা আমীনসহ কয়েকজনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে। পুলিশের ধারণা এই সমাবেশের পেছনেও একটি রহস্য রয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, একটি বিশেষ মহল এসব আন্দোলনের নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছে, অর্থ জোগাচ্ছে।
সার্বিক বিষয়ে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার যে টাকা লুটপাট করেছে, সেই টাকা এখন গুজব ছড়ানোসহ এ ধরনের সহিংস কাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহার হচ্ছে। দেশে এবং দেশের বাইরে এই সরকারের বিরুদ্ধে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র প্রতিদিনই আছে। ফ্যাসিস্ট সরকার যে টাকা লুটপাট করেছে, সে টাকা এখন ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে।
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, পুলিশ অবশ্যই কঠোর হবে। তবে নিপীড়কের ভূমিকা প্রত্যাশা করি না। আমরা উভয়সংকটের মধ্যে আছি। আমরা কখনই চাই না পুলিশ জনগণের বিপক্ষে, ছাত্রদের বিপক্ষে দাঁড়াক, আন্দোলনে গুলি চালাক।