নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৫ নভেম্বর ২০২৪ ০৯:২২ এএম
ছবি: সংগৃহীত
দ্বিতীয়বার বিয়ে করার পর প্রায়ই স্বামীর শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। তবে আত্মীয়স্বজন মামলা করতে চাইলেও রাজি না স্ত্রী তাসমিমা (ছদ্মনাম)। তিনি বলেন, থানা-মামলা এসব করে কী হবে? আমার ছোট একটা বাচ্চা আছে তাকে দেখতে হয়। এসবের মধ্যে না গিয়ে পারিবারিকভাবে মিটমাট করে নিলেই হয়। এ ছাড়া আমার দ্বিতীয় বিয়েতেও সংসার ভাঙলে লোকে বলবে আমারই দোষ। যদি মিটমাট করে সংসার থাকে তাতেই ভালো।
একদিকে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার নারীরা যেমন মামলা করতে চান না অপরদিকে অনেকে মামলা করলেও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। আবার যারা করছেন তারাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। কখনও প্রভাবশালী হওয়ার কারণে জামিনও পেয়ে যাচ্ছেন নির্যাতনকারীরা।
স্বামীর হাতে নির্যাতনের শিকার হন রয়া তাসনিম। তিনি জানান, মাথা ও মুখে এখনও আঘাতের দাগ আছে। মুখের বাঁ পাশের কপাল থেকে ঠোঁটের নিচ পর্যন্ত কেটে ফেলে। গলা চেপে ধরত। এক মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর সুস্থ হয়ে মামলা করি। পরে তাদের তালাক হয়ে যায়।
তাসনিম বলেন, গত ২২ মে উত্তরা পশ্চিম থানায় রনিসহ তিনজনের নাম উল্লেখ করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করি। মামলা করলেও জামিন পেয়ে গেছে। আমি এখনও বিচারের আশায় আছি। মামলা করার পরপর হুমকি দিত। এখন সেটা কমেছে। সন্তানের খবরও সে রাখে না। ভরণপোষণের কোনো টাকাও দেয় না। কতদিন এভাবে চলবে জানি না। এসব ঘটনার মধ্য দিয়েই আজ ২৫ নভেম্বর সারা বিশ্বে উদযাপন করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য, ‘নারী-কন্যার সুরক্ষা করি, সহিংসতামুক্ত বিশ্ব গড়ি।’ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে আজ থেকে আগামী ১০ ডিসেম্বর বিশ্ব মানবাধিকার দিবস পর্যন্ত ১৬ দিনের আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষও পালিত হবে। বাংলাদেশের নারী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এ উপলক্ষে বিস্তারিত কর্মসূচি নিয়েছে।
বিচারহীনতাই সহিংসতা বাড়াচ্ছে বলে মনে করেন উই ক্যানের নির্বাহী সমন্বয়ক জিনাত আরা হক। তিনি বলেন, নির্যাতনের শিকার নারীদের মাত্র তিন শতাংশ বিচারের জন্য আসে। সেখানেও আবার বিচার পাওয়া প্রক্রিয়াটা সহজ নয়। এত প্রক্রিয়া পার হয়ে ভুক্তভোগীর পরিবার চায় না আর মামলা এগিয়ে নিতে। আবার এগিয়ে নিলেও প্রভাবশালীদের কাছে হার মানতে হয়। অনেক মামলাই সফলতার মুখ দেখে না। যে পরিবার বা যারা নির্যাতনের শিকার হয় তারাও নানারকম সমস্যায় পড়ে। মামলা হলে নিরাপত্তাহীনতা তো আছেই, সামাজিকভাবেও তাদের হেয় করা হয়।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন ২ হাজার ৯৪৮ নারী। যাদের মধ্যে ২২২ জন কন্যশিশু। নির্যাতনের শিকার হওয়াদের মধ্যে মামলা হয়েছে ১ হাজার ৩৩৪টি। অর্থাৎ নির্যাতনের শিকার হওয়াদের মধ্যে মামলা করেছেন মাত্র ৪৫ শতাংশ বাকি ৫৫ শতাংশই মামলা করেন না।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রামের আওতায় পরিচালিত ১৪টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) তথ্যসূত্রে জানা যায়, গত ২৩ বছরে সেখান থেকে শারীরিক ও যৌন নির্যাতন এবং দগ্ধ হওয়ার ঘটনায় ৬২ হাজারের বেশি নারী ও শিশু সহায়তা পেয়েছে। যেখানে মামলা হয়েছে মাত্র ১৯ হাজার ৪৪১টি। ৩ শতাংশ ক্ষেত্রে রায় হয়েছে এবং সাজা কার্যকর হয়েছে ১ শতাংশের কম।
দীর্ঘদিন মামলা চলার কারণে ভুক্তভোগীর অনেকেই সর্বস্বান্ত হয়ে যায় বলে জানান বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন আইনজীবী এলিনা খান। তিনি বলেন, অনেক সময় নিম্ন আদালতে দীর্ঘদিন মামলা পরিচালনার পর তা উচ্চ আদালত কিংবা সুপ্রিম কোর্টের দৃষ্টিগোচর হয়। তত দিনে ভুক্তভোগীদের অনেকেই সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন। দেশের অধিকাংশ মানুষই বিপাকে পড়ে আদালতের শরণাপন্ন হয়। তারা এই যন্ত্রণা থেকেই মুক্তি পেতে চায়। বিচার পাওয়া যে তাদের অধিকার এমন বোধ তাদের মধ্যে কম কাজ করে।