সিপিডির গবেষণা
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৫ নভেম্বর ২০২৪ ০৯:০৬ এএম
ছবি: সংগৃহীত
আয়বৈষম্য কমিয়ে দেশে খানাপ্রতি জীবনযাপনের ব্যয় বৃদ্ধি, দারিদ্র্যের হার কমানো এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও উৎপাদন গতিশীল করতে আয়হীন ও স্বল্প আয়ের পরিবারপ্রতি মাসিক ৪ হাজার ৫৪০ টাকা নগদ ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। এতে দারিদ্র্য ৬ দশমিক ১২ শতাংশ কমে যাবে বলে সংস্থাটির গবেষণায় উঠে এসেছে।
রবিবার (২৪ নভেম্বর) রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশে ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকামের (ইউবিআই) কার্যকারিতা মূল্যায়ন’ শীর্ষক এক সংলাপে এ প্রস্তাব তুলে ধরে সিপিডি। সংলাপে ইউবিআইয়ের কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. তৌফিকুল ইসলাম খান।
প্রস্তাবে বলা হয়, জাতীয় পর্যায়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে ১ কোটি ৪৭ লাখ ২৫ হাজার পরিবারের জন্য ৮০ হাজার ২১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা দরকার হবে। এই অর্থ চলতি মূল্যে মোট জাতীয় উৎপাদন বা জিডিপির ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ অর্থের সমান। এর ফলে দারিদ্র্য কমবে জাতীয় পর্যায়ে ৬ দশমিক ১৩ শতাংশ, দারিদ্র্যপীড়িত ৩৬ জেলায় ৩ দশমিক ৭২ শতাংশ, জলবায়ুর প্রভাবজনিত ৩৪ জেলায় ৩ দশমিক ০৭ শতাংশ এবং অতি দারিদ্র্যপীড়িত ১১ জেলায় ১ দশমিক ৪৬ শতাংশ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো এবং শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রধান ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
মুক্ত আলোচনায় বক্তব্য দেন সিপিডির ট্রাস্টি বোর্ড চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সিপিডির বিশেষ ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান।
বক্তারা বলেন, গত ৫ আগস্ট পরিবর্তনের মূল চেতনা ছিল দেশে বৈষম্যমুক্ত একটি কল্যাণমূলক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এখন আয়বৈষম্য কমানোর সময় এসেছে। তাই সর্বজনীন ন্যূনতম আয় একটি সময়োপযোগী প্রস্তাবনা। অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিনির্ধারকরা এটি আগামী অর্থবছর থেকে বাস্তবায়ন করতে চাইলে আসছে জানুয়ারি থেকেই কাজ শুরু করতে পারেন। বক্তারা বিগত সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বাবদ বিপুল অর্থব্যয়কে ‘ত্রুটিপূর্ণ ছিল’ বলে সমালোচনা করেন।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমরা এমন একটা সমাজ গড়ব, যেখানে মানুষ উন্নয়ন ও বিকাশের নিশ্চয়তা পাবে। সেই নিশ্চয়তার অন্যতম বিষয় হলোÑ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া, জীবনধারণের ন্যূনতম উপকরণ যেগুলো আছে, সেগুলোকে নিশ্চয়তা দেওয়া। আমাদের সংবিধানেও প্রতিটি নাগরিককে সামাজিক, আর্থিক ও মানবিক নিরাপত্তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া আছে।’
দেশের নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের সংস্কার নিয়ে আলোচনা চলছে। আমাদের কাছে মনে হয়েছে এটিই এখন সময়; এ রকম প্রতিশ্রুতিশীল ধারণাকে জনগণের সামনে নিয়ে আসা। সব নাগরিকের জন্য পর্যায়ক্রমে একটি ন্যূনতম আর্থিক নিশ্চয়তা আমরা দিতে পারি কি না তা এই গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।’
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমাদের দারিদ্র্য কমেছে। কিন্তু বৈষম্য বেড়েছে। দারিদ্র্য এমন অবস্থায় আছে যদি হঠাৎ একটা শক আসে, তাহলে দেখা যায় অনেক মানুষ আবার দরিদ্র হয়ে যায়। সামাজিক নিরাপত্তায় অনেক দুর্বলতা আছে। ভাতা অনেকেই পায় না। আবার দীর্ঘদিন ধরে ভাতার পরিমাণ না বাড়ায় এর কার্যকারিতা হারায়। আমাদের আর্থিক সক্ষমতা খুব একটা ভালো না। ট্যাক্স জিডিপি রেশিও অনেক কম।’
সাবেক মন্ত্রী আমীর খসরু বলেন, ‘অর্থ পাচার ও দুর্নীতি মোকাবিলা করা এখন প্রধান সমস্যা। এ সমস্যা আদৌ নিয়ন্ত্রণ বা কমানো সম্ভব কি নাÑ এ নিয়ে অনেক সংশয় রয়েছে। তবে রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি থাকলে এ ধরনের কার্যক্রম চালানো সম্ভব।’
তিনি বলেন, ‘দুর্নীতির কারণে অর্থের অপচয় বন্ধ করতে পারলে রিসোর্সের কোনো সমস্যা হবে না। মানুষকে সেবা দিলে কর আদায় অনেক সহজ হয়ে যায়।’
তিনি আরও বলেন, স্বৈরাচার সরকার পতনের পর বাংলাদেশের মানুষের মনোজগতে বড় পরিবর্তন এসেছে। যেসব রাজনৈতিক দল বা নেতা এ পরিবর্তন বুঝতে পারবেন না, তাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বিবেচনায় বিএনপি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতের ওপর। আমরা ইউনিভার্সাল হেলথ কেয়ারের কথা বলেছি। এটা ইউকের মডেলে করা। বাংলাদেশের চিকিৎসার খরচ আফগানিস্তানের চেয়েও বেশি। এ মডেল বাস্তবায়ন হলে মানুষের খরচ অনেক কমে আসবে। আর এতে আয়বৈষম্য কমবে। চাকরিপ্রত্যাশীদের জন্য পড়াশোনা শেষে এক বছর পর্যন্ত রাষ্ট্র থেকে ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থার বিষয়টি বিএনপির সংস্কার প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত আছে বলে জানান আমীর খসরু।
অনুষ্ঠানে ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রহমান বলেন, ‘ইউবিআই যেসব দেশে আছে, সেখানে ট্যাক্স টু জিডিপি রেশিও অন্তত ১০ শতাংশের বেশি। বাংলাদেশে উন্নতি হওয়ার পরে মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ ট্যাক্স জিডিপি রেশিও বেড়েছে। এই রেশিও দিয়ে অর্থায়ন সম্ভব কি না, সেটার পাশাপাশি অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ তো আছেই।’
তিনি বলেন, ‘এটা যেহেতু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছবে, এখানে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নেওয়া জরুরি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এটার একটা রোডম্যাপ তৈরি করতে পারে।’
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘২৪ লাখ মানুষ কর দেয়, অথচ ১ কোটির ও বেশি মানুষের ক্রেডিট কার্ড আছে। বিরাট একটা অংশের মানুষ কর দিচ্ছে না, এটা বিবেচনায় আনতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘পাচার ও দুর্নীতি মোকাবিলা করতে পারব কি না, এটাই প্রধান সমস্যা। এটা মোকাবিলা করা গেলে ন্যূনতম মজুরি ও বাস্তবায়ন করা সম্ভব।’