× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সরেজমিন

সুন্দরী কমছে , ভালো নেই গোলপাতাও

পারভেজ খান, সুন্দরবন থেকে ফিরে

প্রকাশ : ২১ নভেম্বর ২০২৪ ০৯:১০ এএম

সুন্দরী কমছে , ভালো নেই গোলপাতাও

সুন্দরবন নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সুন্দরী গাছ। জনশ্রুতি রয়েছে, এ গাছের নামানুসারেই এ বনের নাম হয়েছে ‘সুন্দরবন।’ কিন্তু সেই সুন্দরী গাছই কমতে শুরু করেছে বনটিতে। সুন্দরবন বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আগামী ২৫ বছর পর এ বনে সুন্দরী গাছ খুঁজে পাওয়াই কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কারণ উজান থেকে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় লবণাক্ততা বাড়ছে সুন্দরবনের পানিতে। পানির তলদেশেও জমছে লবণাক্ত পলি।

এ বনের আরেক সৌন্দর্য গোলপাতার গাছগুলোরও একই হাল। পচতে পচতে মরতে বসেছে গোলপাতা। কারণ গাছটির অপ্রয়োজনীয় পাতা কেটে ফেলার এবং সঠিক সময়ে গাছ পরিষ্কার করার প্রক্রিয়াটি এখন আর কার্যকর নয়। নতুন অঙ্কুরোদ্‌গম ঘটার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অব্যাহত না থাকলে গোলপাতাও হারিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বন ও পরিবেশ গবেষকরা।

সুন্দরবনের এই সুন্দরী গাছ নিয়ে টানা পাঁচ বছর গবেষণা করেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালের বন ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড মিনারেল সায়েন্সেস অনুষদের অধ্যাপক ড. স্বপন কুমার সরকার। গবেষণায় তার সঙ্গে ছিলেন যুক্তরাজ্যের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জেসন ম্যাথিউপউলস ও ড. রিচার্ড রিভ। গবেষণার ফল সম্পর্কে ড. স্বপন কুমার সরকার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ, ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়া বনাঞ্চল সুন্দরবন এখন হুমকির মুখে। সাগর আর বনসংলগ্ন নদীর পানির লবণাক্ততা-সহিষ্ণু গাছগাছালি এখন অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে উদ্বেগজনক হারে কমে আসছে। একই সঙ্গে পলি জমছে বনের ভেতরে। ফলে আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে হারিয়ে যেতে পারে সুন্দরবনের অন্যতম আকর্ষণীয় এবং সবচেয়ে বেশি কার্বন ধারণক্ষম বৃক্ষ সুন্দরী।’ 

গবেষক ড. স্বপন কুমার সরকার জানান, এই গবেষণা থেকে পাওয়া বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ধরে তিনি সুন্দরবনের পানি ও মাটির পরিবেশগত বৈজ্ঞানিক পরিবর্তন নিয়ে নতুন করে গবেষণা শুরু করেছেন। তার মতে, সমুদ্রের আশপাশের নদী ও খালগুলো খনন করে, মিষ্টিপানির প্রবাহ বাড়িয়ে এবং শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহের মাত্রা বাড়িয়ে কিছু সুফল পাওয়া যেতে পারে। তবে প্রকৃতির প্রভাবের ওপর তেমন কিছু করার নেই বলেও জানান তিনি। 

সরেজমিন যা জানা গেল

বাংলাদেশ ও ভারত মিলিয়ে সুন্দরবনের আয়তন প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে বাংলাদেশ অংশে আছে ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের এই বনকে ১৯৯৭ সালে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ইউনেস্কো। গত বুধ ও বৃহস্পতিবার সুন্দরবনের মোংলা, হিরণ পয়েন্ট, হারবাড়িয়া, দুবলার চর ও করমজল এলাকা ঘুরে চোখে পড়েছে সুন্দরী আর গোলপাতা গাছের এই হাল। নদীর নালা বেয়ে চলার পথে মরতে বসা গোলপাতা গাছ কিছু চোখে পড়লেও সুন্দরী গাছ খুঁজে পেতে সময় লাগে। দুই-চারটা যা-ও চোখে পড়ে, সেটা শুকনো এলাকায়।

হিরণ পয়েন্টে এলাকায় কর্মরত ফরেস্ট গার্ড লিয়াকত হোসেন জানালেন, গত ২৪ বছর ধরে তিনি এই বন বিভাগে কাজ করছেন। প্রকৃতিকে ভালোবাসেন বলে কোনো পদোন্নতি নেই জেনেও দীর্ঘ দুই যুগ ধরে তিনি কাজ করছেন। কিন্তু গাছপালার অস্বাভাবিক মৃত্যু তাকে এখন আপনজনের মৃত্যুর মতোই কষ্ট দিচ্ছে।

সুন্দরীদের মতো সুন্দরবনের গোলপাতা গাছও ভালো নেই। সুন্দরবন ঘুরে দেখা গেল, গোলপাতার কূপগুলোয় গাছের মরা পাতায় ভরে উঠেছে। কোনো কোনো গাছে মাইজ পাতা বা মাঝখানের শিশুপাতা বাদে সব পাতাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বন বিভাগের কর্মকর্তা ও বাওয়ালিরা বললেন, ‘পাতা না কাটার কারণেই তা নষ্ট হচ্ছে। এতে গাছের ফল প্রদানের পরিমাণও কমে যাচ্ছে। এতে করে নতুন গাছের জন্ম বা অঙ্কুরোদ্‌গমও হবে না।’ 

হারবাড়িয়া এলাকায় কথা হয় বাওয়ালি হোসেন মিয়ার সঙ্গে। তিনি আক্ষেপের সঙ্গে বললেন, ‘আগে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল বনজীবীরা বছর ধরেই কিছু না কিছু আয় করতে পারতেন। তখন সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের খুলনা রেঞ্জের তিনটি কূপ থেকে গোলপাতা সংগ্রহ করা হতো। এখন এ এলাকায় সেটা কমে গেছে। এ ছাড়া জলদস্যুদের ভয়েও অনেকে ঠিকমতো পাতা কাটতে পারছেন না। তিন দিন আগেও জলডাকাতি হয়েছে। জলদস্যুরা বাওয়ালিদের ধাওয়া করে মোবাইল ও নগদ টাকা কেড়ে নিয়েছে। অনেক সময় দস্যুরা তাদের নৌকা বা নৌকার ইঞ্জিনও লুট করে নিয়ে যায়।’

হোসেন আলী বললেন, ‘আগে উপকূল এলাকার অনেকেই তাদের বাড়ির দেয়াল আর ছাদ তৈরির জন্য গোলপাতা ব্যবহার করতেন। এখন এর প্রচলন কমেছে। অনেক এলাকাকে অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়েছে। তাই গোলপাতার কূপের সংখ্যাও কমেছে। গোলপাতার চাহিদা কমে যাওয়ায় কমেছে বাওয়ালির সংখ্যা। এসব কারণেও অনেক গোলপাতার গাছ থেকে পাতা আর কাটা হচ্ছে না। সেসব পাতা মরছে ও পচে উঠছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ফরেস্ট গার্ড বললেন, ‘যেসব বাওয়ালি গোলপাতা কাটেন বা পরিষ্কার করেন, তাদের কোনো টাকা দেওয়া হয় না। এ কাজ করতে এসে কেউ বিপদে পড়লে তেমন আর্থিক সহায়তাও করা হয় না। তারা শুধু গোলপাতা কেটে নিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু চাহিদা কম বলে তারা এখন সেভাবে তা বিক্রি করতে পারেন না। ফলে তাদের উপস্থিতিও কমে গেছে। বন বিভাগ পরিচ্ছন্নতার পেছনে সামান্য অর্থ ব্যয় করলে এই সংকট কাটতে পারে।’

হারবাড়িয়া শাপলা টাওয়ারের পাশে নৌকা বা ট্রলার ঘাটে বাওয়ালি আলমাস মোক্তার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আর দেড় মাস পরই শুরু হবে গোলপাতা কাটা ও পরিষ্কারের কাজ। প্রতিবছর সাধারণত জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসে তাদের বনের মধ্যে গিয়ে পাতা সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হয়। আর তাই গোলপাতা সংগ্রহের মৌসুমকে সামনে রেখে বাওয়ালিরা এখন নতুন নৌকা তৈরি বা পুরোনোগুলো মেরামতের কাজে ব্যস্ত। চলছে বাওয়ালিদের ভাষায়, শারণের মাস।’ 

বন কর্মকর্তা যা বলছেন

এ প্রসঙ্গে খুলনা বিভাগের সুন্দরবনের পশ্চিম অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) সারওয়ার আলম বলেন, ‘বনে সুন্দরী গাছ আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। যা দিন দিন কমতেই আছে। পানির প্রবাহ কম। পানিতে লবণের পরিমাণ বেশি এবং পলিমাটি জমে মাটি শক্ত হয়ে যাওয়ায় অনেক গাছ মরে গেছে। গাছগুলো পর্যাপ্ত শ্বাস নিতে পারছে না। যেগুলো বেঁচে আছে, সেগুলো বলা যায় শ্বাসকষ্ট নিয়েই বেঁচে আছে। আশপাশের নদীগুলো প্রায়ই খনন করা হয়, যাতে প্রবাহ বাড়ে এবং মিষ্টিপানির পরিমাণও বৃদ্ধি পায়। এতে করে কিছুটা সুফল পাওয়া যায়।’ 

গোলপাতার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘এই গাছেরও একই অবস্থা। বাওয়ালি কমে গেছে এবং নেই বললেই চলে। ফলে গাছ পরিষ্কার বা পাতা সংগ্রহে সংকট দেখা দিয়েছে। ওরা এখন পাতা নিয়ে কোথাও সেভাবে বিক্রি করতে পারেন না। আগে যে অঞ্চলে দুই শতাধিক নৌকা পাতা সংগ্রহ করত, এখন করে মাত্র ২০-৩০ টা। যারা পাতা কাটে তাদের কোনো টাকা দেওয়া হয় না, বরং তাদের কাছ থেকেই রাজস্ব কর আদায় করা হয়। তাই তারাও উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন।’

ক্ষতির শিকার অন্য গাছও

সুন্দরী গাছ নিয়ে করা গবেষণা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ইকোলজিক্যাল সোসাইটি অব আমেরিকা থেকে প্রকাশিত ইকোলজিক্যাল মনোগ্রাফস জার্নালে ছাপা হওয়া ‘সলভিং দ্য ফোর্থ-কর্নার প্রবলেম : ফোরকাস্টিং ইকোসিস্টেম প্রাইমারি প্রোডাকশন ফ্রম স্পেশিয়াল মাল্টিস্পেসিস ট্রেইট-বেজড মডেলস’ শীর্ষক নিবন্ধে বলা হয়, সুন্দরবনের লবণাক্ততা ও পলি জমার পরিমাণ বর্তমানের চেয়ে আর ৫০ শতাংশ বাড়লে বনের কার্যক্ষমতা বা উর্বরতা ২৯ শতাংশ কমে যাবে। গাছের গড় উচ্চতা কমে যেতে পারে ৩৬ শতাংশর মতো। শুধু তা-ই নয়, সুন্দরী গাছের পাতার খাদ্য উৎপাদন ক্ষমতাও ব্যাপকভাবে কমবে। শুধু সুন্দরী গাছই নয়, অতিরিক্ত লবণাক্ততা আর পলি জমতে থাকায় গেওয়া, গরান, পশুর, বাইন, সিংড়া ও কেওড়াসহ সুন্দরবনের অন্য গাছগুলোরও ক্ষতি হচ্ছে। তবে অন্য গাছের তুলনায় সুন্দরীর লবণাক্ততা সহ্য করার ক্ষমতা কম বলে এই প্রজাতি সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়বে।

ড. স্বপন কুমার সরকার বলেন, গত চার দশকে সুন্দরবনের লবণাক্ততা ৬০ শতাংশ বেড়েছে। আর প্রতিবছর ৯৬ হাজার টন পলি জমছে সুন্দরবনে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বেড়ে লবণাক্ততা বাড়ছে এবং পলি জমছে। ভারতের ফারাক্কা বাঁধের কারণে মিঠাপানির অসম বণ্টনও এ সমস্যার জন্য অংশত দায়ী বলে জানান তিনি। সংকট কাটাতে বৈশ্বিক উষ্ণতা কমিয়ে সমুদ্রের পানি বৃদ্ধির হার সীমিত রাখার ওপর জোর দেন এ গবেষক। একই সঙ্গে তিনি নদী শাসন করে শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে পানির সুষম বণ্টনের তাগিদ দেন।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা