× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পথশিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রেরই এখন ‘পুনর্বাসন’ জরুরি

ফারহানা বহ্নি

প্রকাশ : ২০ নভেম্বর ২০২৪ ০১:০৬ এএম

আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০২৪ ১০:৫২ এএম

পথশিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রেরই এখন ‘পুনর্বাসন’ জরুরি

এগারো ভাই-বোনের মধ্যে কামাল হচ্ছে নবম। বাবার ছোট একটা দোকান ছিল, তবে তা দিয়ে সবার মুখে খাবার জুটত না। থাকতেও হতো ঘিঞ্জি ঘরে। তবে কামাল চেয়েছিল পড়াশোনা করবে। যেখানে খাবারের টাকাই থাকে না, সেখানে লেখাপড়ার খরচ আসবে কোথা থেকে? তাই একদিন বাড়ি থেকে পালিয়ে চলে আসে ঢাকায়। এ পথ সে পথ ঘোরার পর তার ঠিকানা হয় কমলাপুর পথশিশু পুনর্বাসনকেন্দ্র। ২০১৯ সাল থেকে সেখানেই আছে কামাল। কেন্দ্রে অন্যদের চেয়ে সে-ই বয়সে বড়। তবে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা শেষ করার পর এক বছর হলো তার পড়ালেখা বন্ধ রয়েছে। খোঁজখবর নিচ্ছিল কোথায় ভর্তি হওয়া যায়? তখনই পথে দেখা হয় কামালের সঙ্গে। এই কেন্দ্রে থাকার পেছনে তার একটাই উদ্দেশ্য, পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়ানো।

কামাল বলে, বাড়িতে এখন আর একদমই যেতে ইচ্ছা করে না। পুনর্বাসনকেন্দ্রে পড়াশোনার সুযোগ আছে, সেটা বাড়িতে নেই। কিন্তু এক বছর ধরে আমার পড়া বন্ধ। কর্তৃপক্ষ খোঁজ নিতে বলেছে কোথায় ভর্তি হব। কোথাও ভর্তি নিলেও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না।

কেন্দ্রের পরিবেশ নিয়ে জানতে চাইলে কামাল বলে, আমাদের এখানে ফ্যানগুলো অনেক আস্তে ঘোরে। রাতে যখন গরম বেশি পড়ে তখন খুব কষ্ট হয়। মাঝে এক মাসের মতো টয়েলেটের লাইনে পানি ছিল না। করোনার সময় তালা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে, এখনও তালা দিয়ে একটা রুমে বন্দি করে রাখা হয়। গত বছর গোপালগঞ্জে একটা পিকনিকে নিয়ে যায় আমাদের। তারপর থেকে আবার সেই একটা রুমের ভেতর দিন কাটছে এই শিশুদের। এক মাস আমাদের দাঁত ব্রাশ করার পাউডার দেয়নি। তখন ঘরের মেঝের ফুটো হয়ে যাওয়া জায়গা থেকে বালি তুলে এনে দাঁত পরিষ্কার করেছি। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কমলাপুরের এই কেন্দ্রে মেয়েদের টয়েলেটে গত এপ্রিল থেকে লাইট নেই। ছয় মাস হয়ে গেলেও ঠিক করা হয়নি। দেড় মাস পানি ছিল না এই কেন্দ্রে। শিশুরা টয়েলেটে পানি ব্যবহার করতে না পেরে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। শুধু তাই নয়, ছয় মাস ধরে ছেলেশিশুদের টয়েলেটের দরজা নষ্ট ছিল। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রটির কর্মকর্তারা জানান, ফান্ডে টাকা না থাকার কারণে এগুলো ঠিক করা সম্ভব হয়নি। 

পথশিশু পুনর্বাসনকেন্দ্রের আরেক বাসিন্দা দশ বছর বয়সি জেসমিন। নিজের বয়সটা ঠিকঠাক বলতে না পারলেও কতদিন এই কেন্দ্রে আছে সেটা চট করে জানিয়ে দিলÑ এক বছর পাঁচ মাস। জেসমিন বলে, আমি তো বাড়ি থেকে পলাইয়া আইসা পড়ছি। বাবা নেই। মার সঙ্গে সৎ বাবার কাছে থাকত সে। সেই বাবার মারধর সহ্য করতে না পেরে ছয় বছর বয়সে ঢাকায় চলে আসে।

জেসমিন আরও বলে, সেন্টারে থাকলে পড়ালেখা করতে পারি। কিন্তু জেলখানার মতো আটকাইয়া রাখে। বাথরুমের লাইট নাই, রাত্রিবেলা উষ্ঠা (হোঁচট) খাই। টিভিও অনেক দিন ধইরা নাই। 

কেন্দ্রের আরেক শিশু ইয়াসিন। এক মাস টয়েলেটে পানি না থাকায় একবার পালিয়ে গিয়েছিল সেন্টার থেকে। তারপর আবার ফিরে এসেছে। 

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে পথশিশু পুনর্বাসন প্রকল্পে চলতি বছরের বাজেট দেওয়া হয়েছে ৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। রাজধানীতে পথশিশুদের পুনর্বাসনের জন্য এমন কেন্দ্র আছে দুটি। একটি কমলাপুরে, অন্যটি কারওয়ান বাজারে। কমলাপুর কেন্দ্রে রয়েছে ৭৭ জন শিশু। এর মধ্যে ১৬টি মেয়ে, বাকিরা ছেলে। আর কারওয়ান বাজার কেন্দ্রের ৭৫ শিশুর সবাই ছেলে। তবে বাজেট ঘাটতির কারণে এই শিশুদের সবরকম সুবিধা দেওয়া যাচ্ছে না বলে জানান দায়িত্বরত ব্যক্তিরা।

এই প্রকল্পে দুর্নীতি, অবহেলা ও অনিয়মের অভিযোগ জানিয়ে এর কর্মীরা মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। চিঠিতে বলা হয়, শিশুদের চিকিৎসা প্রদানে চরম অবহেলা করা হয়েছে। কর্মীদের ব্যক্তিগত টাকা থেকে চিকিৎসা খরচ চালাতে হয়। যখন তারা চিকিত্সার জন্য তহবিল চান, তখন প্রোগ্রামের হিসাবরক্ষক মো. তৌফিকুল ইসলাম তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন। শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা এখানে থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা মিলছে না। পরিবারের কাছে শিশুদের হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও গাফিলতি রয়েছে। শিশুদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সামগ্রী কম দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। পুনর্বাসন কেন্দ্র ও আউটরিচ স্কুলের মেরামতের বিষয়েও গুরুত্ব নেই।

কারওয়ান বাজার কেন্দ্রেরও বেহাল দশা

সরেজমিন কারওয়ান বাজার কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, কেন্দ্রটি বাইরে থেকে তালা দেওয়া। ভেতরে শিশুদের সঙ্গে একজন নারী হাতে একটি লাঠি নিয়ে বসে আছেন। কেউ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। কেউবা খালি গায়ে। কারও কারও গায়ে অপরিষ্কার পোশাক। তালা দেওয়া গেটের বাইরে থেকে দুজনের সঙ্গে কথা হয়। তাদের একজনের নাম জীবন। বেশ কিছুদিন আগে চোখে আঘাত পেয়েছে সে। আরেক শিশুর ছোড়া রাবারের আঘাতে দীর্ঘদিন চোখে ব্যথা ছিল। ডাক্তারের কাছে নেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে জীবন বলে, ‘অনেক দিন পর নিয়ে গেছে। এখন এই চোখে আর দেখি না। বেশি করে সবজি খেতে বলছে ডাক্তার।’

প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ধর্ম শিক্ষক শফিকুল ইসলাম বলেন, আমি কয়েক দিন বলেছি শিশুটিকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে। তাড়াতাড়ি নিয়ে গেলে শিশুটির এই অবস্থা হতো না। 

কারওয়ান বাজার পথশিশু পুনর্বাসনকেন্দ্রের একটি ভিডিও পাওয়া যায়। সেখানে দেখা যায়, রাজন নামের একটি শিশু কাঁদছে। মারের আঘাতে তার শরীর ফুলে গেছে। রাজন কাঁদতে কাঁদতে বলে, রাতে উঠে লাইট জ্বালানোর কারণে আমাকে অনেক মেরেছে। শুধু তাই নয়, অভিযোগ আছে এই কেন্দ্রে শিশুদের একটি করে সাবান দেওয়ার কথা থাকলেও সেই সাবান কেটে অর্ধেক করে দেওয়া হয়। 

দীর্ঘদিন শিশুদের কেন ‘বন্দি’ করে রাখা হয় তা জানতে চাইলে কারওয়ান বাজার কেন্দ্রের চিলড্রেন রিহ্যাবিলিটেশন কনসালটেন্ট আফরোজা আকতার বলেন, কারওয়ান বাজারে আগে একটি পার্ক ছিল। সেটা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে শিশুদের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয় না। আরও কিছু তথ্য জানতে চাইলে তিনি পরিচালকের অনুমতি ছাড়া কিছু বলতে পারবেন না বলে জানান। শিশু জীবনের চোখ নষ্ট হওয়ার পেছনে কেন্দ্রের গাফিলতি নেই জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা সঙ্গে সঙ্গেই তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেছি। এ ছাড়া এখানে শিশুদের মারধর করা হয় না। দুষ্টুমি করলে চড়, থাপ্পড় দেওয়া হয়, এর বেশি কিছু না। জীবনের চোখে আঘাত লেগেছে কয়েকবার। ওর চোখে কাটার দিয়ে আঘাত লেগেছে। আর শিশুরা সাবান নষ্ট করে ফেলে বলে ১৫ দিন অন্তর অর্ধেকটা করে সাবান দিয়েছিলাম।

দায়িত্বরতরা দুষছেন একে অপরকে 

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মাহবুবুর রহমান বলেন, বাথরুমে এক মাস পানি না থাকার বিষয়ে দায়িত্বরতরা সময়মতো জানাননি। কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক এসব সমাধান করবেন। যেদিন আমি জেনেছি সেদিন আমি কাজগুলো করেছি। চিকিৎসা বাবদ টাকা দেওয়া হয় না, এটা আমার জানা মতে সত্যি না। তাৎক্ষণিক টাকাটা পাওয়া যায় না। আমাদের সরকারিভাবে বিল করা লাগে। তারপর টাকা আসে। তাই আমি নিজের পকেট থেকেও দেই, স্টাফদের পকেট থেকেও খরচ করতে বলি। পরে ফান্ড হলে টাকাটা তাদের দিয়ে দেওয়া হয়। 

শিশুদের কেন কারিগরি প্রশিক্ষণ দীর্ঘদিন দেওয়া হয়নি জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই প্রশিক্ষণের জন্য অষ্টম শ্রেণি পাস করতে হয়। আগে বাজেট বেশি ছিল। এখন সেই পরিমাণ বাজেট নেই। কোন খাত থেকে বাজেট ম্যানেজ করতে পারি, সেটা নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। কারিগরি সব ধরনের প্রশিক্ষণ চাইলেই দিতে পারব না। যে যেটার জন্য উপযুক্ত তাকে সেটা দিতে হবে। শিশুদের তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করার দায়িত্বও কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপকের। আমার ম্যানেজার কখনও বলে না এই ছেলে বা মেয়েগুলো থাকতে চায় না। কিন্তু পরে কেন অভিযোগ করে জানি না। আমাদের যে ৯টা স্কুল আছে তা ভিজিট করি, আমাদের পক্ষে যতটুকু সম্ভব হয়। 

কেন্দ্রের সমস্যাগুলো সময়মতো জানানো হয় না এই অভিযোগ সত্যি না দাবি করে কমলাপুর কেন্দ্রের চিলড্রেন রিহ্যাবিলিটেশন কনসালটেন্ট কামরুন্নাহার রত্না বলেন, গত জুনে পরিচালক নিজে কারওয়ান বাজার কেন্দ্রের যাবতীয় সমস্যা নিয়ে মিটিং করেছেন। তিনি নিজেই তার আগে কমলাপুর শেল্টার হোম ভিজিট করেছেন। তিনি মিটিংয়ে বলেছেন, শেল্টার হোমের নানা ধরনের সমস্যা রয়েছে সেগুলো মেটানো জরুরি। তারপর থেকে আমরা সবকিছু মেরামত করার জন্য বারবার লিখিত ও মৌখিক চাহিদাপত্র দিয়ে আসছি। এ ছাড়া বাথরুমের পানির সমস্যা নিয়ে সহকারী পরিচালক আবুল কালাম আজাদকে জানিয়েছি। কিন্তু ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও সমস্যাগুলোর সমাধানে কোনো উদ্যোগ নেননি। ব্যক্তিগত উদ্যোগে আমি শিশুদের সুরক্ষার কথা ভেবে এর আগে ইলেক্ট্রিক্যাল জিনিসপত্র মেরামত করেছি। নবম শ্রেণিতে দুজন শিক্ষার্থীকে ভর্তি করানোর বিষয়ে বলা হলে পিডি, এপিডি জানান বাজেট নেই। মিটিংয়ে শিশুদের বাইরে ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার কথা জানালেও আমাকে বলা হয় বাজেট নেই। স্কুল ভিজিট করি পকেটের টাকা খরচ করে। সেই টাকা চাইতে গেলে হিসাবরক্ষক নানাভাবে হেনস্থা করেন। শিশুদের চিকিৎসার টাকা সব সময় পকেট থেকে দিতে হয়। গত জুলাই মাসে চিকিৎসার জন্য যা খরচ করেছি তা এখনও পাইনি। হিসাবরক্ষক তৌফিকুল ইসলাম কর্তৃপক্ষের প্রভাব খাটিয়ে চাপ প্রয়োগ করেন শিশুদের সাবান কেটে দেওয়ার জন্য। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তিনি অর্থ আত্মসাৎ করেন। 

কেন্দ্রের যাবতীয় সমস্যা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির সহকারী পরিচালক আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, আমরা নতুন এসেছি। এ প্রোগ্রামের সবকিছু এখন ঠিক হয়ে যাবে।

নানা অভিযোগের বিষয়ে হিসাবরক্ষক তৌফিকুল ইসলাম নিজেকে নিম্নপদস্থ দাবি করে বলেন, আমার কাজ শুধু হিসাব-নিকাশ রাখা। এর বেশি কিছু জানি না। অন্যান্য সমস্যা নিয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। দুই কেন্দ্রের ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব এসব কেন্দ্রে কোনো সমস্যা হলে সরাসরি পরিচালককে জানানোর।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা