প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৭ নভেম্বর ২০২৪ ১৬:১৩ পিএম
মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডা. মাহাথির মোহাম্মদ। ফাইল ফটো
অবাধ তথ্য প্রবাহ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সীমান্তহীন বিশ্ব গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডা. মাহাথির মোহাম্মদ। তিনি বলেছেন, তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে একটি সীমান্তহীন বিশ্ব সৃষ্টিতে অবদান রাখতে হবে। অথচ পশ্চিমা বিশ্ব এটিকে নিষেধাজ্ঞার দিকে পরিচালিত করেছে, যা বিশ্ববাণিজ্যকে প্রভাবিত করছে। তাদের এসব যুদ্ধ জাতিগুলোকে ধ্বংস করবে। শেষ পর্যন্ত মানবজাতির অবসান ঘটাবে বা ধ্বংসসাধন করবে।
গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে শুরু হওয়া তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’ (বিওবিসি) সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে তিনি এসব কথ বলেন। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) উদ্যোগে তৃতীয়বারের এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। চলবে আগামী সোমবার পর্যন্ত।
সম্মেলনে বিশ্বের ৮০টি দেশের দুই শতাধিক আলোচক ও আট শতাধিক ব্যক্তি অংশ নিয়েছে।
সিজিএসের চেয়ার মুনিরা খানের সভাপতিত্বে ও নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় সম্মেলনে উদ্বোধনী বক্তা ছিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ভিডিও বার্তায় বক্তব্য রাখেন মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডা. মাহাথির মোহাম্মদ, বলিভিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ফার্নান্দো কুইরোগা রামিরেজ এবং বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে সশরীরে আসতে না পারার কারণ সম্পর্কে ডা. মাহাথির মোহাম্মদ বলেন, আপনাদের সঙ্গে আমার স্বপ্ন ও চিন্তাকে তুলে ধরতে পেরে আমি আনন্দিত। আমি আপনাদের সঙ্গে মিলিত হতে চেয়েছিলাম কিন্তু কিছু অপ্রত্যাশিত কারণে সরাসরি অংশ নেওয়া সম্ভব হলো না। এখানে আমার অনেক পুরাতন বন্ধু রয়েছে। আসতে পারলে কিছু নতুন বন্ধুর সঙ্গেও পরিচিত হতে পারতাম।
সম্মেলনে কিছু নতুন চিন্তা ও ধারণা তুলে ধরা হবে প্রত্যাশা করে তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি এই ‘বে অব বেঙ্গল করভারসেশনে’ কিছু নতুন চিন্তা ও ধারণা তুলে ধরা হবে। এসব চিন্তা ও ধারণা মানবজাতির উন্নতির পথপ্রদর্শনের জন্য অনুসরণ করা যেতে পারে।
পৃথিবী অশান্তির মধ্যে আছে উল্লেখ করে ডা. মাহাথির মোহাম্মদ বলেন, প্রথমত আমরা পৃথিবী অশান্তির মধ্যে আছে এ কথা বললে কোনোভাবেই অত্যুক্তি হবে না। কেননা পৃথিবীর কিছু অংশে জীবন স্বাভাবিক মনে হলেও সব জায়গায় সেই স্বাভাবিকতা ও শান্তি নেই। কেননা আমরা জানি যে, বিশ্বে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্য একটি শক্তি তলে তলে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে রাশিয়া-ইউক্রেন দ্বন্দ্ব অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
তিনি বলেন, আবার ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের গণহত্যা সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের গণহত্যা অত্যন্ত নৃশংস ও অমানবিক। এটা সম্পূর্ণ নজিরবিহীন ঘটনা। তবে তার চেয়েও খারাপ বিষয় হচ্ছে এটা প্রমাণ করে যে পৃথিবীর বাকি অংশগুলো মানুষের মর্মান্তিক ধ্বংস ঠেকাতে অক্ষম।
ডা. মাহাথির বলেন, দ্বিতীয়ত কথা হচ্ছেÑ যেসব আন্তর্জাতিক সংস্থার দায়িত্ব ও কাজ হচ্ছে দুর্বলদের রক্ষা করা। তারা কাপুরুষতার পরিচয় দিচ্ছে। তারা নিজেদের দায়িত্ব পালনে অক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছে।
আর তৃতীয় বিষয় হচ্ছেÑ এটি মুসলিম জাতির মধ্যে তীব্র অনৈক্যকে উন্মোচন করেছে। এমনকি কিছু নেতা তাদের ফিলিস্তিনি ভাই-বোনদের দুর্দশা উপেক্ষা করার জন্য প্রস্তুত। তারা কার্যকরভাবে হত্যাকারী ইহুদিবাদী শাসনকে সহায়তা করছে বলেও জানান তিনি।
ডা. মাহাথির বলেন, পশ্চিমের শক্তিশালী দেশগুলো গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও স্বাধীনতার স্বঘোষিত অভিভাবক। এসব দেশের ফ্যাসিবাদী, বর্ণবাদী ও ধর্মান্ধ প্রকৃতির পাশাপাশি তাদের ভণ্ডামিও প্রকাশ পেয়েছে। তারা মূলত ফিলিস্তিনে দখলদারিত্ব, তাদের নির্মূলত্ব ও ধ্বংসের জন্য ইসরায়েলকে সমর্থন বজায় রাখছে। ফিলিস্তিনে গণহত্যা চালাতে সহায়তা করছে। এই বমি বমি ভাবটি আসলে চলতেই পারে কিন্তু ইসরায়েলকে তার দুর্বৃত্তায়ন বন্ধে কোনো অবস্থান নিতে দেখা যাচ্ছে না। কারণ তাদেরকে সভ্য বিশ্বের তথাকথিত মহান জাতির দ্বারা সাহায্য করা হয়। ফলে গণহত্যায় উৎসাহিত ইসরায়েলিরা ফিলিস্তিনে নৃশংস হত্যায় থেমে নেই।
তাদের আগ্রাসন লেবাননে প্রবেশ করেছে ও ইরানের চারপাশে প্রদক্ষিণ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই শিকার শিকার খেলা সব সময় পশ্চিমা শক্তিশালী গণমাধ্যম দ্বারা নিশ্চিত করা হয়। ইসরায়েলের অসংখ্য আন্তঃসীমান্ত আক্রমণ ও হত্যাকাণ্ড একপাশে সরিয়ে দেওয়া হয় অর্থাৎ প্রচার করা হয় না। যাদের জমি তারা দখল করছে ও তাদের বিরুদ্ধে ৭০ বছর যাবৎ অত্যাচার করছে। অথচ নিপীড়িতদের দ্বারা যেকোনো প্রচেষ্টাকে তারা সন্ত্রাসী কার্যক্রম হিসেবে প্রচার করছে। ইসরায়েল যে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালায় তা পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো উপেক্ষা করে চলে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ডা. মাহাথির মোহাম্মদ বলেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে আমরা যা প্রত্যক্ষ করছি তা আরও ভয়াবহ। হামাসের হামলা ৭০ বছরের নির্যাতন ও নিপীড়নের প্রতি জবাব। তবে তাদের বিরুদ্ধে প্রচার চালানো হচ্ছেÑ হামাস শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের ওপর ব্যাপক গণ-হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে। ফিলিস্তিনি ও মধ্যপ্রাচ্যের নির্বাচিত দেশগুলোর ওপর এসব হামলা বিশ্বকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তাইওয়ানে আক্রমণ করতে চীনকে উস্কে দিচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এদিকে যুক্তরাষ্ট্রও তাইওয়ানে হামলা চালাতে চীনকে উস্কে দিতে ব্যস্ত। দক্ষিণ চীন সাগরে উত্তেজনা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে পেলোসির তাইওয়ান সফরটি ছিল ইচ্ছাকৃত।
এসব কারণে অবশ্যই মার্কিন অস্ত্র বিক্রি বেড়েছে। ইতঃপূর্বে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো যেভাবে ইউক্রেনে আক্রমণ চালাতে রাশিয়াকে উস্কে দিয়েছিল তা এর থেকে বেশি কিছু আলাদা নয়। এখন রাশিয়ার সক্ষমতা জানতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র।
যুদ্ধের ফলে দরিদ্র ইউক্রেন সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হবে বলেও আশঙ্কা করেন তিনি।
বিশ্বনেতাদের কথা বলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিপজ্জনক না হতে চাইলেও আমি বিশ্বাস করি, জাতীয় নেতা, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সিভিল সোসাইটির উচিত এদের বিরুদ্ধে কথা বলা। পাছে আমরা পরাক্রমশালী দেশগুলোর মধ্যে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ি এমন ভয়ও রয়েছে।
এসব দেশের মধ্যে সংঘাত কমাতে গণমাধ্যমের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, এটা দুর্ভাগ্যজনক যে, প্রভাবশালী প্রকাশনাগুলো বা প্রচার মাধ্যমগুলো এসব দেশ থেকে এসেছে। তাদের পদ্ধতিতে জাতীয়তাবাদী মনোভাব থাকে। তারা ইচ্ছাকৃত বা সক্রিয়ভাবে দ্বি-মেরুকরণ বিশ্ব তৈরিতে অবদান রাখছে। যা আমরা ভেবেছিলাম যে, ঠান্ডা যুদ্ধের মাধ্যমে শেষ হয়ে গেছে। প্রকৃতপক্ষে তা জিইয়ে রাখা হয়েছে। পরবর্তীতে মার্কিন-চীন অচলাবস্থার কারণে সৃষ্ট দ্বি-মেরুকরণের তথ্যপ্রবাহের পরিপ্রেক্ষিতে তা সবকিছুতেই জুড়ে দেওয়া হচ্ছে।
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও মানুষের আন্দোলনকে ধাঁধার সঙ্গে তুলনা করে মালয়েশিয়ার এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও মানুষের আন্দোলন বিষয়টি মূলত তাদের একটি ধাঁধা ছাড়া কিছুই না।