সেলিম আহমেদ
প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০২৪ ১৪:২৪ পিএম
আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২৪ ১৪:৩৯ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশেও। এই নির্বাচনে কে জিতবে আর বাংলাদেশের রাজনীতি-অর্থনীতিতে কার বিজয় কী প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে যেমন বোদ্ধাদের, তেমনি সাধারণ মানুষের চায়ের কাপেও ঝড় উঠছে প্রতিদিন। বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এ ব্যাপারে তেমন কোনো দ্বিমত নেই যে, যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতাসীন ডেমোক্র্যাট পার্টির এবারের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কমলা হ্যারিস জিতলে দেশটির পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা নেই। তবে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প জিতলে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বিশেষত বৈশ্বিক রাজনীতির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তন আসতে পারে। তবে তাদের ধারণা, বাংলাদেশের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গিতে তেমন কোনো পরিবর্তন আসবে না। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানবাধিকার। ডেমোক্র্যাটরা এই মানবাধিকার পরিস্থিতির আলোকেই কোনো দেশের ক্ষেত্রে পররাষ্ট্রনীতির প্রয়োগ ঘটিয়ে থাকে। রিপাবলিকানরা এ সূচকটিকে ডেমোক্র্যাটদের মতো গভীর মাত্রায় প্রয়োগ না করলেও গুরুত্বের দিক দিয়ে ওপরেই রাখে।
কিন্তু তারপরও বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে এ নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক আগ্রহের কারণ, গত জুলাইয়ে দেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের যে পরিবর্তন এসেছে, তাতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে দ্রুততম সময়ে সমর্থন দিয়েছে পশ্চিমা সরকার। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক সরকারের সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সম্পর্ক বহু পুরোনো। যুক্তরাষ্ট্রের এই নির্বাচনের মধ্যদিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলে এবং রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প বিজয়ী হলে এই সম্পর্কে ভাটা পড়তে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সরকার পরিবর্তনে তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে তেমন কোনো পরিবর্তন না ঘটলেও ভারতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে, যার ফলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গিতে বাহ্যিকভাবে না হলেও খানিকটা পরিবর্তন আসতে পারে।
সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস এবং রিপাবলিকান প্রার্থী সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি নির্বাচনী লড়াই হবে। আজ মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হবে। তবে বিজয়ী কে তা জানতে কয়েকদিন সময় লাগতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে শুরু থেকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন মার্কিন ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন। ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস নির্বাচনে জিতলে সেই সমর্থন অব্যাহত থাকবে। কারণ তিনি জো বাইডেনের নীতির ধারাবাহিকতাই রক্ষা করবেন।
তবে ট্রাম্প এলে এ ক্ষেত্রে কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে। বাংলাদেশকে নিয়ে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এক্স বার্তায়ও এর আভাস মিলেছে। তিনি তার এক্স বার্তায় লিখেছেন, ‘আমি বাংলাদেশে হিন্দু, খ্রিস্টান ও অন্য সংখ্যালঘুদের ওপর বর্বরোচিত সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। দেশটিতে দলবদ্ধভাবে তাদের ওপর হামলা ও লুটপাট চালানো হচ্ছে। বাংলাদেশ এখন পুরোপুরিভাবে একটি নৈরাজ্যকর অবস্থার মধ্যে রয়েছে।…’ আওয়ামী লীগের পতনের পর ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও ভারত সরকারও জোরেশোরে এই দাবি তুলছে। এ ছাড়াও ট্রাম্প আরেক এক্স বার্তায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বন্ধু পরিচয় দিয়ে তিনি লিখেছেন ‘আমার প্রশাসনে আমরা ভারতের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করব। আমার বন্ধু প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গেও আমাদের অংশীদারত্ব বাড়বে।’
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকের মধ্যে এ ধারণাও রয়েছে, বাংলাদেশকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই এক্স বার্তা দিলেও তার মূল টার্গেট হলো ডেমোক্র্যাট কমলা হ্যারিসের ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সপক্ষে নিয়ে আসা। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রে মেক্সিকানদের পরেই দ্বিতীয় অভিবাসী ভোটার ব্লক হিন্দু ভোটার। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ৫২ লাখ হিন্দু জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভোটারের সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ। এরা সচরাচর ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়ে থাকে। তবে এবারের জরিপ বলছে, প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হলেও কমলা হ্যারিসের জনপ্রিয়তা হিন্দু ভোটারদের মধ্যে কম। কার্নেগি এনডোম্যান্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন পরিচালিত জরিপ বলছে, ২০২০ সালের নির্বাচনে বাইডেন যেখানে ৬১ শতাংশ হিন্দু ভোট পেয়েছেন, কমলা তার ৪ শতাংশ কম ভোট পাবেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, ট্রাম্প এই এক্স বার্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েছেন। তারা জানাচ্ছেন, ট্রাম্পের এ বক্তব্য ইউএসএ হিন্দু ফেডারেশনের খসড়া করা। তারা আসন্ন নির্বাচনে তাকে ভোট দেওয়ার প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে এ বিষয়ে ট্রাম্পকে বক্তব্য দিতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
তা ছাড়া এটিও লক্ষণীয়, এবার ট্রাম্পের নির্বাচনী ট্রান্সজিশন টিমের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির ভাতিজা রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র ও ডোমোক্র্যাট দল পাল্টে ট্রাম্পকে সমর্থন জানানো সাবেক কংগ্রেসওম্যান তুলসি গ্যাবার্ড, যিনি ডানপন্থি কট্টর হিন্দুবাদী হিসেবে পরিচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ঢেউ বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতি-বিশ্লেষক এম হুমায়ুন কবির বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারকে বাইডেন প্রশাসন যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা কমলা হ্যারিস ক্ষমতায় এলে কিছুটা বাড়তে পারে। একইভাবেই টেকসই গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারলে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছ থেকেও সহযোগিতা পাওয়া যাবে। বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর প্রতি ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা লক্ষ করা যায়। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ। ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় যে প্রশাসনই দায়িত্বে আসুক না কেন, বাংলাদেশের সঙ্গে তারা সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে।’
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশের ওপর মার্কিন নির্বাচনের বড় আকারের প্রভাব পড়ার কথা নয়। তবে ট্রাম্প যদি প্রেসিডেন্ট হন তিনি ভারত ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বড় সম্পর্ক গড়তে ইচ্ছুক। তিনি যদি আসলেই ভারতের দিকে বেশি মনোযোগী হন, তাহলে বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের সঙ্গে সম্পর্কে কিছু ভাটা পড়তে পারে।’ তিনি বলেন, ‘ডেমোক্রেটিকদের সঙ্গে ড. ইউনূসের সম্পর্ক অনেক পুরোনো। তারা এখন বাংলাদেশকে পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে। ট্রাম্প হয়তো সেই সম্পর্ক নাও রাখতে পারেন।’
সরকার পরিবর্তনের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আসতে পারে কি নাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সেটা নির্ভর করে অনেক সময় প্রেসিডেন্টের ওপর। ট্রাম্প জিতলে ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে নতুন কোনো তরঙ্গ সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ ট্রাম্প বারবার বলছেন, তিনি ক্ষমতায় থাকলে ইউক্রেন যুদ্ধ হতো না… ইত্যাদি ইত্যাদি। ট্রাম্প একজন আনপ্রেডিক্টেবল রাজনীতিক। গতবার ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার কিম জং আনের সঙ্গে সীমান্তে গিয়ে দেখা করেছেন। সুতরাং তিনি কী করবেন তা বলা মুশকিল।’
এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল্লা হিল কাফি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফলাফলে ফরেন পলিসির খুব একটা পরিবর্তন হয় না। তবে রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নেই। যখন যেভাবে সম্পর্ক করা প্রয়োজন সেভাবে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই যেমনÑ স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংলাদেশের পক্ষে ছিল রাশিয়া ও ভারত। যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে। এখন আবার বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভালো সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে।’
তবে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফলাফল বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো বৈরিতা তৈরি করবে না বলে মনে করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। গত শনিবার সরকারের প্রেস সচিব শফিকুল আলম এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘একজন বিশ্বনেতা হিসেবে অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে উভয় দলের (যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টি ও ডেমোক্রেটিক পার্টি) জ্যেষ্ঠ নেতাদের অত্যন্ত ভালো সম্পর্ক রয়েছে। দুই দলেই তার বন্ধু আছে। সম্পর্ক অনেকটাই নির্ভর করে ব্যক্তিগত যোগাযোগের ওপর। অধ্যাপক ইউনূস একজন বিশ্বনেতা। সুতরাং কমলা হ্যারিস বা ডোনাল্ড ট্রাম্প, মার্কিন নির্বাচনে যিনিই জয়ী হোন না কেন, আমাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হবে না।’
বাংলাদেশে হিন্দু, খ্রিস্টানসহ সংখ্যালঘুদের ওপর ‘বর্বরোচিত সহিংসতার’ নিন্দা জানিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক্স বার্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয় এবং লবিস্টরা এই ইস্যুকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে।’