অন্তর্বর্তী সরকার
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২৪ ১১:৩৯ এএম
আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২৪ ১২:১০ পিএম
ফাইল ফটো
সরকারকে সহযোগিতা না করার অভিযোগের বিষয় নিয়ে সচিবালয়ে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত ঘটেছে। এ নিয়ে বিভিন্নজনের মধ্যে বাড়ছে অসন্তোষও। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে বিদায় নেওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের সাজানো প্রশাসনে ঘাপটি মেরে বসে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে অসহযোগিতা করছেন-অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার এমন বক্তব্যের পর ইস্যুটি নতুনভাবে সামনে চলে এসেছে। এতে প্রশাসনযন্ত্রে নড়াচড়া শুরু হয়ে গেছে বলেও সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন।
তারা আরও বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত থাকা কর্মকর্তাদের বঞ্চিত রেখেই নতুন সরকারের আমলেও আগের সুবিধাবাদীদের বহাল রাখতে যে চক্রটি তৎপর ছিল তাদেরও টনক নড়তে শুরু করেছে। কোণঠাসা ও বঞ্চিত কর্মকর্তারা নতুন করে চেষ্টা করছেন নিজেদের উপযুক্ত জায়গা ফিরে পেতে।
অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে গত ১৫ বছরে প্রশাসনে দলীয় মতাদর্শের লোকবল নিয়োগ দিয়েছিল শেখ হাসিনা সরকার। এ নিয়ে নানা সময়ে সমালোচনা হলেও তা গায়ে মাখেনি। এতদিন বিএনপিসহ সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো প্রশাসনের বিতর্কিত আমলাদের সরিয়ে পদোন্নতিবঞ্চিত ও বিভিন্ন সময়ে নির্যাতিত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসানোর আহ্বান জানালেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, মূলত এসব কারণেই অন্তর্বর্তী সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনায় নানান প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
এদিকে প্রশাসনের অসহযোগিতা নিয়ে জানতে চাইলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলাদের কাছ থেকে। তারা বলছেন, গণ-কর্মচারীদের পরিচালনার জন্য উপদেষ্টাদেরও সক্ষমতা বা টেকনিক থাকতে হবে। সেটা প্রয়োগ করতে না পারলে দায় আমলাদের ওপর বেশি দেওয়া যাবে না। অপর একজন বলেছেন, উপদেষ্টার যে অভিযোগ সেটা অমূলক নয়। আগের সরকারের চিহ্নিত কিছু জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে শুরুতেই বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়ে দিলে বাকি যারা থাকতেন তারা চাকরি হারানোর ভয়ে হলেও সরকারকে সহযোগিতা করতেন। কিন্তু এ কাজে বিলম্ব হওয়ার কারণে তারা সরকারকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অসহযোগিতা করার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে এটা কাম্য নয়।
সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে বলে উপদেষ্টা যে মন্তব্য করেছেন, সেটা একেবারে ভুল নয় বলে মন্তব্য করেছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের কাজ করবেন, তা যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন। আইনগতভাবে ন্যায়নীতির আলোকে ওই সরকারকে তারা সহযোগিতা করবেনÑ এটাই কাম্য। কিন্তু নানা দোদুল্যমানতার কারণে অনেকে এই সরকারকে সহযোগিতা করতে চাইছেন না। এটা গর্হিত অপরাধ। এসব আমলাকে চিহ্নিত করে এবং যাদের চাকরির মেয়াদ ২৫ বছর হয়েছে তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়ে প্রশাসনকে নিরপেক্ষ করতে পারে সরকার।
তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যর্থ হলে জনগণ কিন্তু আপনার বা আমার কাছে জবাব চাইবে না। মানুষ তাদের কাছেই (বর্তমান সরকার) জবাব চাইবে। বলবে, আপনারা পারছেন না। তিনি বলেন, সরকার নীতিনির্ধারণ করবে যেকোনো কাজের। সেটা বাস্তবায়ন করবেন প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা। সেখানে যদি গাফিলতি থাকে এবং ঘাটতি থাকে, তাহলে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে। তাই সরকার পরিচালনার জন্য যা যা করা প্রয়োজন সেই আলোকে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। উপদেষ্টা (আসিফ মাহমুদ) যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটা আমলাদের সতর্ক করার জন্যই দিয়েছেন বলে আমি মনে করি।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সরকারের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, জনপ্রশাসনে যারা আছেন, তারা বাধ্য সরকার বা উপদেষ্টাদের সহযোগিতা করতে। না করাটা মিস কন্ডাক্ট। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সরকারকে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে সহযোগিতা না করলে তাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেওয়া যেতেই পারে। কারণ দেশের স্বার্থ সবার আগে। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন হয় জনগণের টাকায়। অনেকেই আগের সরকারের সুবিধাভোগী ছিলেন। এখন হয়তো ভাবছেন, চাকরি আছে কি নেই! এমন দোদুল্যমানতা থেকেও সরকারকে সহযোগিতা না করার বিষয়টি ঘটে থাকতে পারে। এদের বিরুদ্ধে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এমনকি প্রশাসনকে ঢেলে সাজানো উচিত। অন্যথায় এই সরকার সংস্কারের যে চিন্তা করছে তা সফল করতে পারবে না।
প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সিনিয়র সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান বলেন, আমলারা সহযোগিতা করছেন নাÑ এটা সরকারের উপদেষ্টারা অনুভব (ফিল) করছেন। তাদের অনুভূতিটা ব্যক্ত করছেন। এই মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে দুটি কথা বলা যায়। প্রথমটি, প্রশাসনে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে বলে উপদেষ্টা যা বলেছেন সেটি নাগরিকরা গ্রহণ করবেন না। আপনি সরকার পরিচালনা করছেন, আপনার একটা পলিসি আছে। আমলাদের সহযোগিতা পাওয়া আপনাকেই নিশ্চিত করতে হবে। আমলারা সহযোগিতা করছেন নাÑ এমন কথা আমরা অতীতেও শুনেছি। এটা নতুন কোনো বিষয় নয়। নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী কিংবা এমপিরা প্রায়ই অভিযোগ করে বলতেন, সচিব বা ডিসি-এসপিরা তাদের কথা শুনতে চান না। আমলারাই দেশ চালাচ্ছেন। বিগত দিনে এসব অভিযোগ শোনার পরও প্রশাসন তাদের দায়িত্ব পালন করে গেছে। প্রত্যকের একটা দায় ও দায়িত্ব আছে। যার যার দায়দায়িত্ব তাদের। উপদেষ্টা পরিষদ, মন্ত্রিপরিষদ বা যে পরিষদ থাকুক, যখন তারা দায়িত্বে থাকেন তাদের প্রশাসনযন্ত্র পরিচালনা করার একটা টেকনিক থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, উপদেষ্টা পরিষদ কীভাবে চালাবেন সেটি আপনি কিংবা আমি ঠিক করে দিতে পারব না। কৌশল করে হলেও প্রশাসনের সহযোগিতা আদায় করতে হবে। আর গণ-কর্মচারীদের দায়িত্ব হলো সরকারে যিনি বা যারাই থাকবেন, তাদের নির্দেশনা ও নীতি অনুযায়ী সেটা বাস্তবায়নের চেষ্টা করবেন। এটা পরিষ্কার ব্যাপার। এর মধ্যে ঝামেলা থাকা মানে আপনি আপনার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারছেন না অথবা করছেন না।
অপর এক প্রসঙ্গে এই সাবেক আমলা বলেন, গণ-কর্মচারীরা যদি দায়িত্ব পালন না করেন, তাদের জন্য একটা কন্ডাক্ট রুলস আছে। সেখানে অদক্ষতা, অসহযোগিতা, তাদের ব্যর্থতা ও দায়বদ্ধতার জন্য শাস্তি পেতে হবে। নতুন লোক নিয়োগ দিয়ে ১৭ লাখ গণ-কর্মচারীর চাপ সামলানো সম্ভব নয়। শুধু বাংলাদেশ না, পৃথিবীর কোথাও বদলানো যায়নি।
এদিকে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে জানিয়ে উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া হুঁশিয়ারি করে বলেছেন, অসহযোগিতা করলে সিস্টেম ভেঙে নতুন লোক নিয়োগ দেওয়া হবে। শনিবার সকালে চট্টগ্রাম বিভাগ ও জেলার বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এ কঠোর বার্তা দেন।
এ সময় তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা এমন কিছু নিয়মনীতি গড়ে তুলেছেন যেগুলোর কারণে আপনাদের বিরুদ্ধে হাতও দেওয়া যায় না। আমরা কিন্তু ওসব নিয়মনীতির তোয়াক্কা করব না। নিয়মনীতি মেনে কিন্তু বাংলাদেশে অভ্যুত্থান হয়নি। সরকার পরিচালনাও কিন্তু নিয়মনীতি মেনে হবে না।’ কার্যত এই বক্তব্যের পর প্রশাসনে নতুন করে ঝড় উঠেছে। বিগত সরকারের সুবিধাভোগী আমলারা নতুন করে আতঙ্কের মধ্যে পড়েছেন।