ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২৪ ১৪:৪৮ পিএম
সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। ফাইল ফটো
সারা দেশের রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে নিজের সংসদীয় আসনের লোকদের ঢালাও নিয়োগ দিয়ে বিধি লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বিরুদ্ধে। স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার লোকদের অবৈধভাবে নিয়োগ দেন। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের এই প্রভাবশালী মন্ত্রীর সম্মতিতেই তার একান্ত সচিব (পিএস) এম মাসুম ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা তাদের আত্মীয়-স্বজনকে নির্বিচারে সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে চাকরি দিয়েছেন। এ অনিয়মে তাদেরকে সহযোগিতা করেছে আইজিআর (নিবন্ধন অধিদপ্তর) অফিস। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সূত্র জানায়, চক্রটি নিয়োগবিধির তোয়াক্কা যেমন করেনি, তেমনি অনুসরণ করেনি জেলা কোটা। বলতে গেলে, দেশের ৬৩ জেলাজুড়েই নিয়োগ পেয়েছেন শুধু কসবার লোক। এভাবে সাবেক আইনমন্ত্রীর আমলে অনিয়ম যেন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় আইন মন্ত্রণালয়ে। প্রথা ভেঙে কর্মচারীদের এক কর্মস্থল থেকে অন্য কর্মস্থলে বদলি করা হয়। জন্মতারিখ কমিয়ে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে চাকরি দেওয়া হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লোকজনকে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আনিসুল হকের আমলে দেওয়া অবৈধ নিয়োগ বাতিলের দাবি জানাতে শুরু করেছেন বঞ্চিত বিভিন্ন জেলার মানুষ।
উল্লেখ্য, সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে কর্মচারী পদে সরাসরি নিয়োগের বিধান নেই। এমনকি বদলির সুযোগও নেই। কিন্তু আইনমন্ত্রী হয়েও এক্ষেত্রে আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়েছিলেন আনিসুল হক ও তার সহযোগীরা। এখানেও অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে সাবেক আইনমন্ত্রীর পিএস মাসুম তার ভাতিজা খন্দকার তুহিনকে স্মারক নং-২৪০০(৪)-এর মাধ্যমে ২০১৫ সালের ৩ মার্চ ঢাকা জেলার ডেমরা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সহকারীর পদে বদলি করেন। আর ২০১৬ সালের ১০ জানুয়ারি সাভার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সহকারী পদে বদলি করা হয় মো. রাসেল মিয়াকে। এ রকম আরও অনেক নজির রয়েছে।
জানা যায়, সাবেক মন্ত্রীর এলাকা কসবার লোক হওয়ার সুবাদে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই জাল এনআইডি তৈরি করে অফিস সহায়ক পদে ময়মনসিংহের গৌরীপুরে ২০১৮ সালে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে চাকরি পান শাহজালাল ভূইয়া। পরে আইবাস সিস্টেমে বেতন প্রদান চালু হলে ধরা পড়ে যায় এনআইডি জালিয়াতির ঘটনা। মন্ত্রীর মায়ের গৃহকর্মীর ছেলে হওয়ার সুবাদে শাহজালাল এখনও চাকরি করছেন ময়মনসিংহ রেকর্ড রুমে। তবে তিনি বেতন পাচ্ছেন না।
শুধু রেজিস্ট্রি অফিসই নয়, কসবা ও আখাউড়া উপজেলার কয়েক হাজার লোককে দুর্নীতির মাধ্যমে বিভিন্ন আদালতে জারিকারক, পেশকার ও কম্পিউটার অপারেটর পদে বিধি লঙ্ঘন করে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে সাবেক আইনমন্ত্রীর বিরুদ্ধে। রেজিস্ট্রেশন বিধিমালা ৩০৭(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সহকারীর শূন্য পদে পদোন্নতিতে কর্মরত স্থায়ী মোহরার ও টিসি মোহরার-এর মধ্যে থেকে জ্যেষ্ঠতার (গ্রেডেশন) তালিকা থেকে শূন্যপদ পূরণের বাধ্যবাধকতা আছে। সাবেক আইনমন্ত্রী ও তার সহযোগীরা ফরমায়েশি আইন বানিয়ে নিজস্ব লোকদের অবৈধভাবে নিয়োগ দিয়ে গেছে। একইভাবে আত্মীয়তার সুবাদে শূন্যপদ পূরণ না করেই ঢাকার পল্লবী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে মো. সামিউল ইসলামকে, ধানমন্ডি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে মো. তামজিদ হাসান মিশুকে এবং শ্যামপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে মো. ইমতিয়াজ আলমকে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে সরাসরি নিয়োগ করা হয়।
দেশের প্রবীণ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ জেডআই খান পান্না এ বিষয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এটা অন্যায় ও গর্হিত অপরাধ। সব জেলাকে বাদ দিয়ে একটি জেলার লোকজনকে সারা দেশের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিয়োগ দেওয়া অবৈধ ও অসাংবিধানিক। যদি এ ধরনের অপরাধ করে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়, সেটি যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
জানা গেছে, জেলা ও উপজেলা কোটার শর্ত লঙ্ঘন করে আনিসুল হক কেবল সাব-রেজিস্ট্রি অফিসেই তার সংসদীয় আসনের কয়েক হাজার লোককে পুনর্বাসন করেছেন। এক্ষেত্রে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া যায় এমন পদকে বেছে নেওয়া হয়েছে। এই নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে প্রায় ১০০ কোটি টাকার (প্রতিটি পদের বিপরীতে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা) মতো বাণিজ্য হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। লোভনীয় পদগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ড রুম, অফিস সহকারী, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর, মোহরার, টিসি মোহরার, উমেদার ও নকলনবিশ।
অভিযোগ উঠেছে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক দায়িত্ব পান এবং ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে এসব নিয়োগ বাণিজ্য সম্পন্ন করেন। বিগত শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত রেজিস্ট্রি অফিসে তার কথাই ছিল শেষ কথা। এই সময়কালে আনিসুল হকের কোটায় নিবন্ধন অধিদপ্তরের (নিয়োগ শাখা) অফিস সহকারী পদে মো. সাখাওয়াত হোসেন নিজাম, অফিস সহকারী মো. সাদ্দাম হোসেন, মো. আবুল হোসেন ও শাহরিয়া সুলতানা সূচি (আনিসুলের সাবেক ব্যক্তিগত সহকারী রাশেদুল কায়সার ভূইয়া জীবনের ছোট ভাইয়ের স্ত্রী)। সাবেক আইনমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী আলাউদ্দিন বাবুর বেয়াই ইমতিয়ার আলমকে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে রাজধানীর শ্যামপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে, ধানমন্ডি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে জয়নাল আবেদীনকে ও পল্লবী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে মো. সামিউল ইসলামকে নিয়োগ দেওয়া হয়। অপর ব্যক্তিগত সহকারী সোহাগের আত্মীয় মো শরিফ মিয়াকে জেলা রেজিস্ট্রার, নরসিংদী অফিসে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে, ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রি অফিসের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর শাহিন মিয়াকে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা রেজিস্ট্রার অফিসে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে আয়েশা আক্তারকে নিয়োগ দেওয়া হয়। নেত্রকোণা জেলা রেজিস্ট্রার অফিসের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মো. শরিফুল ইসলাম, টাঙ্গাইল জেলা রেজিস্ট্রার অফিসের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাহমুদ হক ও মৌলভীবাজার জেলা রেজিস্ট্রার অফিসের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. মোজাম্মেল হকও নিয়োগ পান আইনমন্ত্রীর সুপারিশে।
এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ জেলা রেজিস্ট্রার অফিসের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মো আবু সাইদ সুপারিশপ্রাপ্ত হন আনিসুলের বাসার বাবুর্চির ভাতিজা হিসেবে। তা ছাড়া ফরিদপুর ও লক্ষ্মীপুর জেলা রেজিস্ট্রার অফিসের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাহমুদুল হাছান খাদেম ও রানা খলিফা চাকরি পান আইনমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ আখাউড়ার সাবেক মেয়র তাজদিকুল খলিফার ভাগনি ও ভাতিজা পরিচয়ে। চাঁদপুর ও নোয়াখালী জেলা রেজিস্ট্রার অফিসের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর সুমাইয়া কায়সার মুক্তি ও ইয়াছিন কাউছার ভুইয়া আনিসুলের সাবেক ব্যক্তিগত সহকারী রাশেদুল কায়সার ভুইয়া জীবনের চাচাতো ভাইয়ের স্ত্রী ও চাচাতো ভাইয়ের প্রভাবে চাকরি পান। কুমিল্লা ও রাজবাড়ী জেলা রেজিস্ট্রার অফিসের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর সুমাইয়া আক্তার ও শাকিল আহমেদ ও সাবেক আইনমন্ত্রীর ভাতিজার স্ত্রীও তার কোটায় চাকরি পান। তার সাবেক পিএস এম মাসুমের দুজন ভাতিজা খন্দকার কামরুল হাসান ও মারুফ রেজাকে দিনাজপুর ও নীলফামারীর জেলা রেজিস্ট্রার অফিসে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর এবং ভাগনে মুন্নাকে অফিস সহায়ক পদে পাবর্তীপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে চাকরি দেন। আইনমন্ত্রীর প্রভাব খাটিয়ে নিজ আত্মীয়দের এভাবেই নিয়োগ দেন সংসদের এই বিতর্কিত কর্মকর্তা।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর শাখা হচ্ছে রেকর্ড রুম। সেই পদেও চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, হবিগঞ্জ, জয়পুরহাট ও খুলনা বিভাগে ডজন ডজন কর্মচারীকে অবৈধ পন্থায় নিয়োগ দিয়েছিলেন আনিসুল হক। চট্টগ্রামের সদর রেকর্ড রুমে শাহাদাৎকে, চট্টগ্রামের নানুসুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ইবনে জাবীর ইসলামকে, রাঙ্গুনিয়ায় দরুদ হোসেনকে, গাছবাড়িয়ায় মাঈনুল হোসেন সোহেলকে, কুমিল্লার সদর দক্ষিণে আবদুল জলিলকে, গুণবতীতে মোমিনুল ইসলাম মোস্তফাকে, ব্রাহ্মণপাড়ায় সেলিম মিয়াকে, মুরাদনগরে মুন্না আক্তারকে, বানিয়াচংয়ে সুমী আক্তারকে, হবিগঞ্জের জলসুখায় শেখ আজহার উদ্দীনকে, বাহুবলে ছোটন মিয়াকে ও চুনারুঘাটে অমল দেবকে, জয়পুরহাট জেলা রেজিস্ট্রার অফিসে মো. সাকিবকে, খুলনা সদরে আশ্রাফুল আলমকে এবং রূপসা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের আল আমিনকে রেকর্ড রুমে নিয়োগ দেওয়া হয়। এদের মধ্যে শুধু গাছবাড়িয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ড রুমে নিয়োগ পেয়েছেন মাঈনুল হোসেন সোহেল, যার বাড়ি চট্টগ্রামে। বাকি সবাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আইনমন্ত্রীর সংসদীয় এলাকার। পদে পদে অনিয়মের মাধ্যমে এসব নিয়োগের বৈধতা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
জানতে চাইলে নিবন্ধন অধিদপ্তরের সাবেক আইআরও মোস্তাক আহমেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সাবেক আইনমন্ত্রী কোন বিধির আলোকে তার নিজের জেলার শত শত কর্মচারীকে নিয়োগ দিয়েছিলেন তা বলতে পারব না। তবে জেলা কোটা অনুসরণ না করা এক ধরনের অপরাধ। বর্তমান কর্তৃপক্ষ বিষয়টি খতিয়ে দেখে অনিয়ম পেলে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে। তাহলে আগামীতে আর কেউ এভাবে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে লোকবল নিয়োগ দেওয়ার সাহস দেখাবে না।