অন্তর্বর্তী সরকার
আরমান হেকিম
প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর ২০২৪ ০৯:৪৫ এএম
আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৪ ১১:২২ এএম
বিশ্বব্যাংকের ঋণে দেশের ছয়টি সিটি করপোরেশন ও ৮১টি পৌরসভার অবকাঠামোর উন্নয়নে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প নিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। এ প্রকল্পের অধীনে এসব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় নাগরিক সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি পার্ক, লাইব্রেরি নির্মাণ ও জলাধার তৈরি করা হবে।
তবে অবকাঠামোগত উন্নয়নমূলক কাজের অভিজ্ঞতা থাকার পরও পরামর্শক নিয়োগ, বিদেশে প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত অভাবনীয় ব্যয় প্রস্তাবের কারণে এলজিইডির এ প্রকল্পটির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ব্যয়ের এসব অসঙ্গতির বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
কিন্তু কমিশনের আপত্তির পরও গত ৭ অক্টোবর অন্তর্বর্তী সরকারের দ্বিতীয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ‘রিজিলিয়েন্ট আরবান অ্যান্ড টেরিটোরিয়াল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’ (আরইউটিডিপি) শীর্ষক এ প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
অবকাঠামো উন্নয়নে ৬০ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রকৌশল সংস্থা এলজিইডির। তবুও আরইউটিডিপি প্রকল্প বাস্তবায়নে ৩১৬ কোটি টাকা পরামর্শক খাতে ব্যয়ের আবদার করেছে সংস্থাটি। এ ছাড়া দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৫ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, নিজেদের দক্ষতা থাকার পরও ঋণের টাকায় দেশি-বিদেশি পরামর্শক এবং বিদেশ ভ্রমণের পেছনে এত বড় অঙ্কের টাকা ব্যয় প্রস্তাব করা অযৌক্তিক।
অনুমোদনের পক্ষে যা বলছেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা
এদিকে প্রকল্পটির অনুমোদন বিষয়ে জানতে চাইলে একনেক ব্রিফিংয়ে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘একনেক সভায় স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা বলেছিলেন, প্রকল্পটিতে ত্রুটি আছে। পরে অনুমোদন দেওয়া হোক। কিন্তু আমরা বলেছি, যেহেতু বৈদেশিক সহায়তা আছে, সে কারণে এখন অনুমোদন দিয়ে দেওয়া হোক। আমরা উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে কথা বলে পরে প্রকল্পটি এমনভাবে সাজাব, যাতে সেটা স্থায়ী ভিত্তি পায়। অন্য সরকার এসে যেন পরিবর্তন করতে না পারে। আর যেসব ত্রুটি আছে সেগুলোও যেন দূর হয়।’
তবে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘ঋণের টাকায় পরামর্শক নিয়োগ এবং বিদেশ ঘুরতে যাওয়ার কোনো যৌক্তিকতা দেখি না। যদি প্রযুক্তি বদলায়, তাহলে দক্ষতা আরও বাড়ানোর জন্য দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণ নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু কালভার্ট, স্থানীয় রাস্তা, বাজার, ড্রেনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ বা পুনর্বাসনে প্রযুক্তির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। তাই এখানে দক্ষতা উন্নয়নের খুব একটা প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। এগুলো তো এলজিইডির মৌলিক কাজ।’
পিইসি সভায় অতিরিক্ত ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন
উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ হাজার ৯০১ কোটি ২২ লাখ টাকা। যার মধ্যে ৪ হাজার ২৫৯ কোটি ৬০ লাখ দেবে বিশ্বব্যাংক। বাকি ১ হাজার ৬৪১ কোটি ৬২ লাখ দেবে সরকার। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০৩০ সালের জুন।
তবে আলোচ্য প্রকল্পের ওপর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত ব্যয় প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। পিইসি সভার কার্যপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রকল্পটিতে পরামর্শক খাতে ৩১৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে কার্যপত্রে বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর সাধারণত পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের সড়ক, ব্রিজ-কালভার্ট, ফুটপাত, ড্রেন নির্মাণ, স্ট্রিট লাইট স্থাপন কার্যক্রমগুলো করে থাকে। সে অভিজ্ঞতার আলোকে প্রস্তাবিত প্রকল্পের কার্যক্রমগুলো সম্পন্ন করা সম্ভব। তারপরও এত সংখ্যক বিদেশি ও দেশি পরামর্শক প্রস্তাবের যৌক্তিকতা নেই। কার্যপত্রে অতি প্রয়োজন ছাড়া পরামর্শক খাতে যথাযথভাবে ব্যয় কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এ কাজে বৈদেশিক প্রশিক্ষণের প্রয়োজন নেই
বিদেশে প্রশিক্ষণ খাতে ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়ার বিষয়েও একই অভিমত দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। কমিশন বলছে, ‘প্রকল্পের আওতায় যেসব কাজ করা হবে, সেগুলো এলজিইডির নিয়মিত কাজ। এই কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বৈদেশিক প্রশিক্ষণের প্রয়োজন নেই। তাই প্রকল্প থেকে বৈদেশিক প্রশিক্ষণ বাদ দেওয়া যেতে পারে।’
প্রকল্পটিতে অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ বাবদ প্রায় ২০ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব প্রশিক্ষণ কাদের দেওয়া হবে এবং প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা আছে কি না, সেটিও জানতে চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ খাতে ৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। যেটিকে অত্যধিক উল্লেখ করে এ বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।
গাড়িসহ অন্যান্য ব্যয়েও আপত্তি ছিল কমিশনের
প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন ধরনের প্রায় ৬১৩টি গাড়ি কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এত সংখ্যক গাড়ি কেনার প্রস্তাবের বিষয়ে আপত্তি রয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের। গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের সুপারিশ ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত না থাকলেও এত গাড়ি কেনার যৌক্তিকতা নিয়েও আপত্তি তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।
প্রকল্পের আওতায় অফিস সরঞ্জাম হিসেবে ৪০০ সেট কম্পিউটার বাবদ ৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা, ২০টি ল্যাপটপ বাবদ ৪০ লাখ, ১৮টি মাল্টি ফাংশন প্রিন্টার বাবদ ১৮ লাখ, ১০০ ফটোকপিয়ার বাবদ ২ কোটি এবং ১২টি প্রজেক্টর বাবদ ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া এলজিইডির দক্ষতা উন্নয়নের জন্য ৩৯০ সেট কম্পিউটার বাবদ ৭ কোটি ৪০ লাখ, একটি মাল্টি ফাংশন প্রিন্টার বাবদ ১ লাখ, একটি ফটোকপিয়ার বাবদ লাখ টাকা, ফার্নিচার বাবদ ৮০ লাখ টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব যন্ত্রপাতি এবং ফার্নিচার কেনার প্রস্তাবেও আপত্তি রয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের।
সার্বিক বিষয়ে জানতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. আলি আখতার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। তবে মোবাইলে বারবার ফোন করার পরও তিনি সাড়া দেননি।