ডিম দিবসে আলোচনা সভা
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০২৪ ১৬:২৪ পিএম
আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২৪ ১৬:৪৮ পিএম
বিশ্ব ডিম দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রবা ফটো
দেশের বিভিন্ন বাজারে সব ধরনের পণ্যসামগ্রীর দাম বাড়ছে। এই দাম বৃদ্ধি নিয়ে যতটা না কথা হয় তার চেয়ে বেশি কথা হয় ডিমের দাম বাড়লে। এই ডিমের দাম নিয়ে অপরাজনীতি হচ্ছে। রাজনীতিতে ডিমকে ভিলেন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
শুক্রবার (১১ অক্টোবর) বিশ্ব ডিম দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, ওয়ার্ল্ডস পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ শাখা ও বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের উদ্যোগে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
তারা বলেন, পোল্ট্রি খাতে ৬০ লাখ লোক নানাভাবে জড়িত। এ খাতে বার্ষিক বাজার ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি। তা ছাড়া বেকাত্ব দূরীকরণে খাতটি বড় অবদান রাখতে সক্ষম। ডিমের ও মুরগির দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারি হ্যাচারি ও ফার্মগুলোতে উৎপাদন বাড়াতে হবে
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. মোহাম্মদ রেয়াজুল হকের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, বিশেষ অতিথি ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সচিব সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দর ও ওয়াপসার সভাপতি মসিউর রহমান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোল্ট্রি সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শওকত আলী। আলোচক ছিলেন মন্ত্রণালয়টির অতিরিক্ত সচিব মোস্তফা কামাল, বাংলাদেশ ভেটেরিনারি অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক ডা. মো. সফিউল আহাদ সরদার, ক্লিনিক্যাল পুষ্টিবিদ হাসিনা আক্তার লিপি। স্বাগত বক্তব্য দেন অধিদপ্তরের প্রশাসনের পরিচালক ডা. বয়জার রহমান।
ফরিদা আখতার বলেন, ‘ডিম সহজলভ্যতার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। ডিম প্রাপ্যতার কোনো বৈষম্য থাকবে না। সকল শ্রেণি-বর্ণ-নির্বিশেষে যাদের ডিম বেশি দরকার তাদের জন্য তা সরবরাহ করতে হবে।’
গ্রামীণ নারীদের হাঁস-মুরগি পালনে উৎসাহিত করতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আগে গ্রামীণ নারীরা হাঁস-মুরগি পালন করতেন। নিজেরা গ্রামেই পাইকারদের কাছে বিক্রি করতেন। এতে তারা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারতেন। সেই অবস্থা আবার ফিরিয়ে আনতে হবে। এজন্য সকল ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে।’
বাংলাদেশে উৎপাদিত ডিম অন্যান্য দেশের ডিমের চেয়ে ওজনে বেশি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘স্কুলপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের টিফিনে অন্যান্য খাবারের সঙ্গে ডিম দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। সিএসআর হিসেবে পোল্ট্রি কোম্পানিগুলোকে হাসপাতালে ডিম সরবরাহ করতে হবে।’
মিডিয়ার কারণে ডিমের দাম বাড়ছে বলে মন্তব্য করে বলেন, ‘মিডিয়ায় এমনভাবে লেখা হয় তাতে বাজার অস্থির হয়ে যায়। আমরা ভোক্তারাও অস্থির হয়ে পড়ব। তা ছাড়া আমদানির খবরে ডিমের দাম কিছুটা কমেছে তাহলে দেখা যায় ডিমের দাম বৃদ্ধি সেটা কারসাজি। দেশে কোনো ধরনের কারসাজি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’
তিনি বলেন, ‘আমদানিনির্ভর ফিড না করে নিজেদের ফিড তৈরিতে অবদান রাখা দরকার। তা ছাড়া গরমেও ডিমের উৎপাদন কমে যায়। প্রাকৃতিক কারণেও ডিমের উৎপাদন কমে যায়। রমজানে ডিমের ব্যবহার কমে যায়। তাই মজুদ নয় চাহিদার আলোকে কোল্ডস্টোরেজ করার চিন্তা করতে হবে। ডিমকে অত্যাবশ্বাকীয় খাদ্য হিসেবে ঘোষণা করতে হবে।’
সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দর বলেন, ‘ডিম হচ্ছে সকল শক্তির আধার। ভিটামিন সি ছাড়া সব ধরনের ভিটামিন সমৃদ্ধ। পোল্ট্রি খাতে ৬০ লাখ মানুষ জড়িত। আগামীতে বেকারত্ব শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা যাবে পোল্ট্রি শিল্পে বিনিময়ে।’ কার্বন নিঃসরণ সম্পর্কে বলেন, ‘সবচেয়ে কম কার্বন নিঃসরণ করে পোল্ট্রি শিল্প। মেধাবিহীন জাতি দিয়ে দেশ সমৃদ্ধ করা যাবে না। তাই ডিমকে সহজলভ্য করতে হবে। ডিম দিয়ে মেধাবী জাতি তৈরি করা সম্ভব।’
তিনি বলেন,’ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যে ক্ষতি হচ্ছে সেখানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পোল্ট্রি শিল্পে। নোয়াখালীর সাম্প্রতিক বন্যায়ও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এ খাত। আগামী দিনে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় কাজ করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান সময়ে সবজি কমে যায় তাই ডিমের চাহিদা বেড়ে যায়। আবার তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে ডিমের উৎপাদন কমে যায়। ৮০ শতাংশ ডিম উৎপাদন করে প্রান্তিক খামারিরা। তারা সরাসরি ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে পারে না। প্রান্তিক খামারিদের পণ্য ভোক্তা পর্যায়ে কীভাবে পৌঁছানো যায় সেটি নিয়ে আমরা কাজ করব।’ হ্যাচারি পলিসি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘খসড়া পলিসি হয়েছে এটি প্রাথমিকভাবে কাজ করা যায়।’
ডা. মোহাম্মদ রেয়াজুল হক বলেন, ‘ডিম আমদানির দরকার নেই। প্রতি বছর এ সময় ডিমের দাম বাড়ে। বাংলাদেশ ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে বেশি ডিম খায়।’
মসিউর রহমান বলেন, ‘বাজার তদারকিতে একটি সেল রয়েছে অথচ সেলের উপকারিতা বা অপকারীতায় কোনো পার্থক্য দেখি না। ডিমের উৎপাদন ও চাহিদায় সমন্বয় থাকতে হবে। অন্য পণ্যের দাম যতটা বেড়েছে সে তুলনায় ডিমের দাম বাড়েনি। ডিম বাজারে আসতে ৭ হাত বদল হচ্ছে। এটি তদারকি করা দরকার।’
তিনি বলেন, ‘সরকারি হ্যাচারি ও ফার্মগুলো নিষ্ক্রিয়। সরকার ২০-৩০ শতাংশ উৎপাদন করলে প্রান্তিক পর্যায়ে বাচ্চার সংকট কেটে যাবে। এবারের বন্যায় ৫০-৬০ লাখ পিস ডিম উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সরকারকে উৎপাদনের ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে। গত সরকারের আমলে আমরা চাপে ছিলাম এখনও আছি। নেতাদের কাছে ডিম বিক্রি করতে হয়।’
অধ্যাপক ড. মো. শওকত আলী বলেন, ‘বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে ডিম উৎপাদনে এগিয়ে রয়েছে। আমরা ভারত থেকে যেসব ডিম আনছি সেখানে তারা শূকরের মিল খাওয়াচ্ছে কি না তা দেখতে হবে। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের টিফিনে ডিম খাওয়ালে ২০-২৫ বছর পর মেধাবী জাতি পাব। ডায়াবেটিস রোগী সপ্তাহে ১২টি করে ডিম খেলেও কোনো সমস্যা নেই।’
হাসিনা আক্তার লিপি বলেন, ‘ডিমকে পুষ্টিবিদরা সুপার ফুড হিসেবে বলে থাকে। পায়ের পাতা থেকে মাথার চুল পর্যন্ত ডিম উপকারী। হার্টের রোগীদের ক্ষেত্রে ডিম কোনো ক্ষতি করে না। দেহে চারটি ফ্যাট রয়েছে তার মধ্যে তিনটিই ক্ষতিকর। ডিমে কোনো ক্ষতিকর ফ্যাট নেই।’ তিনি বলেন, ‘সিদ্ধ ডিমে ৬০ ক্যালরি ও তেলে ভাজি করে খেলে তা দ্বিগুণ হয়ে যায়। রোজার ইফতারের সময় ডিমের আইটেম রাখতে হবে। ৬ মাস বয়সি শিশুদের ডিম খেতে দিতে হবে। গর্ভবর্তী নারীদের ডিম খেতে দিতে হবে। অনাগত ভবিষ্যতের জন্যই নারীদের ডিম খেতে দিতে হবে।’
ডা. মো. সফিউল আহাদ সরদার বলেন, ‘২০১৩ সাল থেকে বাংলাদেশে বিশ্ব ডিম দিবস পালন শুরু করেছি। এই ডিম ধনী, গরিব, ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সব মানুষকে এক স্থানে নিয়ে এসেছে। অর্থাৎ সবাই ডিম খায়।’
ডিমের রাজনীতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘রাজনীতিতে ডিমকে ভিলেন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। অথচ সব পণ্যের দামই বেড়েছে। কিন্তু সব অভিযোগ ডিমের ওপরে গিয়ে পড়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ডিমের উৎপাদন ও বাজার দর নিয়ে রেগুলেটরি অডিট হওয়া দরকার। তারা প্রতি মাসে তদারকি করবে।’
ডিমের হ্যাচারি পলিসি করতে হবে বলেও দাবি জানান তিনি। বলেন, ‘মেডিসিন, ফিড আইটেম ট্যাক্স ফ্রি করে দিতে হবে। ডিমের আমদানি খুবই খারাপ হয়েছে। ছোট খামারিদের বাজারে অ্যাকসেস দিতে হবে।’
ডা. এবিএম খালেদুজ্জামান বলেন, ‘সপ্তাহে ৩০ লাখ সোনালি মুরগির চাহিদা রয়েছে অথচ আমরা সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ২ লাখ সরবরাহ করতে পারছি।’