দীপক দেব
প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৪ ০৯:৩৯ এএম
আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২৪ ০৯:৩৯ এএম
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। ছবি : সংগৃহীত
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আমন্ত্রণে সংক্ষিপ্ত সফরে আজ ঢাকায় আসছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। প্রায় এক যুগ পর মালয়েশিয়ার কোনো প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয়ের পাশাপাশি জনশক্তি রপ্তানির বিষয়টিতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। এ ছাড়া চার ঘণ্টার এই সংক্ষিপ্ত সফরে দ্বিপক্ষীয় ইস্যুর পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট, বাণিজ্য-পর্যটন ও চিকিৎসা খাত, অর্থ ফেরত, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়েও দুই শীর্ষ নেতার মধ্যে আলোচনা হতে পারে বলে একাধিক কূটনৈতিক সূত্র আভাস দিয়েছে।
গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমই প্রথম সরকার প্রধান যিনি এই সরকারকে অভিনন্দন জানান। এ ছাড়া মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর এই সফরই হবে এই অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কোনো বিদেশি সরকারপ্রধানের প্রথম উচ্চপর্যায়ের সফর। আনোয়ার ইব্রাহিম প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে একান্তে বৈঠক করবেন, এ ছাড়া রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার মন্ত্রিসভার সদস্য, উপমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা এবং উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ৫৮ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল থাকবে বলে জানা গেছে। প্রায় ১১ বছর পর মালয়েশিয়ান কোনো প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর হতে যাচ্ছে এটি। এই সফরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় সর্বোচ্চ ছয় ঘণ্টা অবস্থান করতে পারেন। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এই মুহূর্তে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কে ঢাকার পক্ষ থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হচ্ছে শ্রমবাজার এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জোট আসিয়ানের সদস্য পদ পাওয়া।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে, গত ২ অক্টোবর থেকে ৪ অক্টোবর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের ইসলামাবাদ সফর রয়েছে। ইসলামাবাদ থেকে আজ দুপুর আড়াইটায় ঢাকায় অবতরণ করবেন তিনি। দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে বিমানবন্দরে গার্ড অব অনার প্রদান করা হবে। এর পর বেলা সাড়ে ৩টার দিকে রাজধানীর একটি হোটেলে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর একান্ত বৈঠকের পর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। দুই শীর্ষ নেতার বৈঠকের পর যৌথ প্রেস কনফারেন্স হবে। বিকাল সাড়ে ৫টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক করবেন। সফর শেষে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় সফরসঙ্গীদের নিয়ে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন আনোয়ার ইব্রাহিম।
নাম প্রকাশ না করে একজন কূটনীতিক বলেন, প্রধান উপদেষ্টা এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে বন্ধুত্ব রয়েছে। বন্ধুত্বের কারণে হয়তো আনোয়ার ইব্রাহিম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ইসলামাবাদের পাশাপাশি ঢাকা হয়ে দেশে ফিরবেন। ইসলামাবাদে তিন দিনের সফর হলেও ঢাকায় তার সফর খুব সংক্ষিপ্ত। এটা আনুষ্ঠানিক সফর হলেও এনগেজেমেন্টের মাত্রাটা কম। মূলত আনোয়ার ইব্রাহিমের ঢাকা সফরে তিনটি ইস্যু বেশি গুরুত্ব পাবে। এর মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও লেবার ইস্যু থাকবে। পাশাপাশি অন্যান্য বিষয়ে আলোচনার সুযোগ আছে বলে জানায় সূত্রটি।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহের প্রেক্ষিতে দ্রুত এই সফরের আয়োজন করা হয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশ চলমান রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি আসিয়ান কাঠামোর মধ্যে ‘সেক্টরাল ডায়লগ পার্টনার’ হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার সমর্থন চাইবে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ২০২৫ সালে আসিয়ানের মালয়েশিয়ার সভাপতিত্ব এবং গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোতে আরও আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রত্যাশা নিয়েও আলোচনা হবে।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম গত ১৪ আগস্ট টেলিফোনে অধ্যাপক ড. ইউনূসকে আশ্বস্ত করে বলেন, বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধ ও সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টায় মালয়েশিয়া ঢাকার অংশীদার হতে প্রস্তুত। ওই সময় অধ্যাপক ড. ইউনূস মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে তার ফোনের জন্য ধন্যবাদ জানান এবং আশা প্রকাশ করেন যে, বাংলাদেশি কর্মীরা মালয়েশিয়ায় কাজের আরও সুযোগ পাবেন।
জানতে চাইলে সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সংক্ষিপ্ত হলেও সময় ও পরিস্থিতির কারণে এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সফর। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কোনো সরকারপ্রধান সফরে আসছেন। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে জনশক্তি পাঠানো একটা জটিলতা রয়েছে। আশা করা হচ্ছে এই সফরে সেই সমস্যা নিয়ে আলোচনা হবে এবং একটা সমাধানের পথ বের হবে। এ ছাড়া দেশটি প্ল্যান্টটেশন ও কনস্ট্রাকশনে নতুন করে শ্রমিক নিতে যাচ্ছে। সেই জায়গায় আমাদের জন্য বড় একটা সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। যেহেতু আমাদের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর অনেক পুরোনো বন্ধুত্ব, সেটাকে কাজে লাগানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি নতুন নতুন বিনিয়োগ, আমদানি-রপ্তানি ও পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে এই সফর।
সৌদি আরবের পর মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি মানুষ বিভিন্ন পেশায় যুক্ত রয়েছে। দীর্ঘদিন শ্রমিক নেওয়া বন্ধ রাখার পর সর্বশেষ ২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বর কর্মী নিয়োগে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া নতুন সমঝোতা চুক্তি সই করে। ২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বরের পর থেকে গত ৩১ মে পর্যন্ত ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৬৭২ বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় যান। দুই পক্ষের নানান দুর্নীতি এবং অনিয়মের কারণে একাধিকবার বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো স্থগিত হয়ে যায়। এদিকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রাক্কালে দেশটির শ্রমবাজার সিন্ডিকেটমুক্ত করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সদস্যরা।