ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৯:১১ এএম
সরকারি কর্ম কমিশন। ছবি : সংগৃহীত
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্র সংস্কারের চলমান ধারায় বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনকেও (পিএসসি) ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিগগির সাংবিধানিক এই সংস্থায় রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের পদত্যাগের বিষয়ে নির্দেশনা আসতে পারে। এরই মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে পিএসপি পুনর্গঠনের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
সূত্রমতে, বিগত সরকারের আমলে পিএসসিতে ক্যাডার নন-ক্যাডার নিয়োগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। তখন এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। মাঠে নামে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। চাকরিপ্রত্যাশীরা আন্দোলন ও মানববন্ধন করতে থাকেন। ওই সময় থেকেই প্রতিষ্ঠানটির কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সংস্থাটি পুনর্গঠন করতে যাচ্ছে সরকার।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশন শেষে দেশে ফেরার পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে। সবকিছু ঠিক থাকলে গ্রহণযোগ্য একজনকে চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে গত সরকারের আমলে বঞ্চিত একজন সাবেক আমলাকে পছন্দের তালিকায় রাখা হয়েছে বলেও জানা গেছে। নাম উল্লেখ না করে সূত্র জানায়, বর্তমানে অবসরে থাকা ওই কর্মকর্তা চাকরিজীবনে চৌকস আমলা হিসেবে প্রশাসনে পরিচিত ছিলেন। বিদেশে থাকা সন্তানদের কাছে তিনি অবস্থান করছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কিছুদিন পর তাকে দেশে ডেকে আনা হয়েছে। এর বাইরেও দলনিরপেক্ষ আরও কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত আমলার নাম রয়েছে বিবেচনায়। শিগগির এই নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হবে। এর মধ্য দিয়ে পিএসসিতে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া সোহরাব কমিশনের অবসান হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সূত্র আরও জানায়, নতুন নিয়োগ পাওয়া চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে পুরো কমিশনে চলবে সংস্কার কার্যক্রম। অতীতে প্রশ্নপত্রফাঁসসহ নানান কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত এই সংস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত করাই হবে প্রধান লক্ষ্য। নিয়োগ জটের জটিলতা নিরসনে কাজ করবে তারা।
জানা যায়, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে কার্যত স্থবির রয়েছে পিএসসি। তখন থেকেই কমিশন সদস্যরা অফিসে অনিয়মিত হয়ে পড়েন। ভার্চুয়ালি সভা করে কিছু সিদ্ধান্ত নিতে থাকেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও অজানা আতঙ্ক কাজ করতে থাকে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানটির যাবতীয় কার্যক্রমে। যে কারণে তিনটি বিসিএসসহ একের পর এক নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। অনেকটা বাধ্য হয়ে নন-ক্যাডার ও জনপ্রশাসনের অধীনে পদোন্নতির জন্য বিভাগীয় পরীক্ষাগুলোও স্থগিত করা হয়েছে। পিএসসিতে এমন অচলাবস্থা চলতে থাকায় বেকায়দায় পড়েছেন কয়েক লাখ চাকরিপ্রার্থী।
এ বিষয়ে পিএসসির বর্তমান চেয়ারম্যান মো. সোহরাব হোসাইন জানান, তিনি থাকবেন কি থাকবেন নাÑ সেটি সরকারের ইচ্ছাধীন। তবে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পিএসসি নিয়মনীতির মধ্যেই পরিচালিত হয়ে থাকে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে রয়েছে সেতুবন্ধ। সকল কার্যক্রম স্বাভাবিক নিয়মেই চলে আসছে। চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সিদ্ধান্তেই প্রতিদিনের কাজকর্ম চলছে। এখানে স্থবিরতার কোনো সুযোগ নেই। এটি এমন একটি প্রতিষ্ঠান যার বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে প্রতিদিনই কোনো না কোনো কাজ থাকে। বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিদিনই চেয়ারম্যান অথবা কমিশনের সিদ্ধান্ত দরকার হয়।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, জুলাই-আগস্ট মাসজুড়ে নানা কারণে পরীক্ষাগুলো নেওয়া সম্ভব হয়নি। এখন সেগুলো নেওয়ার জন্য কার্যক্রম চলছে। ৪৪তম বিসিএসের বাকি ভাইবা, ৪৫তমর লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ৪৬তম বিসিএসের কাজ চলছে। নন-ক্যাডার কিছু নিয়োগ পরীক্ষার কাজও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগের পর ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। এরপর থেকেই বিগত সরকারের আমলে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান বা সংস্থাসমূহ সংস্কারের দাবি ওঠে। অপসারণ চেয়ে আন্দোলন ও বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। এরই অংশ হিসেবে জাতীয় সংসদের স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ কমিশনের সকল সদস্যকে পদত্যাগ করতে হয়। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি), সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে পদত্যাগ করতে বলা হয়। একইভাবে পিএসসির চেয়ারম্যানকে অপসারণ ও সংস্থাটি পুনর্গঠনের দাবিতে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছেন চাকরিপ্রত্যাশীরা। এরপর থেকে সেখানে একধরনের স্থবিরতা চলছে।
পিএসসির একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগের পরপরই সংস্থার চেয়ারম্যানসহ সকল সদস্য পদত্যাগের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হওয়ায় তারা রাষ্ট্রপ্রধানের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছেন। আবার কেউ কেউ স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করার চিন্তাভাবনাও করছেন। যেহেতু রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন তাদের নিয়োগকারী ব্যক্তি, সেজন্য পদত্যাগ না করে তারা রাষ্ট্রপতির নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছেন।
উল্লেখ্য, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা নিয়োগদানে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হচ্ছে পিএসসি। স্বাধীনতার পর থেকেই সংস্থাটি নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুনাম অর্জন করে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পিএসসির অধীনে বিসিএস ক্যাডার ও নন-ক্যাডারের প্রায় ৩০টি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার অভিযোগ ওঠে। সর্বশেষ ৪৬তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও ফাঁস হয়েছে। এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে কয়েকজন আটক হয়। এর সঙ্গে পিএসসির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা জড়িত বলে আটক ব্যক্তিরা সিআইডিকে জানিয়েছে।
জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২০ সালের ২১ সেপ্টেম্বর রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব মো. সোহরাব হোসাইনকে পিএসসির চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়। গত ২১ সেপ্টেম্বর তার চার বছর পূর্ণ হয়েছে। আরও এক বছর মেয়াদ বাকি থাকলেও তার আগেই হয়তো তাকে বিদায় নিতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া কমিশনের অন্য সদস্যরা হলেনÑ সাবেক সচিব এস. এম. গোলাম ফারুক, ফয়েজ আহম্মদ, মো. মাকছুদুর রহমান পাটওয়ারী, হেলালুদ্দিন আহমদ, ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানম, কে এম আলী আজম, এন সিদ্দিকা খানম, মো. খলিলুর রহমান, প্রকৌশলী জাহিদুর রশিদ, অধ্যাপক ড. মুবিনা খোন্দকার, অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন, অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক, অধ্যাপক ড. প্রদীপ কুমার পাণ্ডে, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মোহা. শফিকুল ইসলাম।
প্রসঙ্গত, সংবিধানের ১৩৮ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগ দিয়ে থাকেন। পরবর্তীকালে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মাঠপর্যায় থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত প্রশাসনে রদবদল চলছে। পুরোটাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে করতে হচ্ছে। এর জন্য সব কর্মকর্তা ব্যস্ত সময় পার করছেন। তাই পিএসসি পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনা কিছুটা ধীরে চলেছে। তবে এবার সর্বাধিক গুরুত্ব পাচ্ছে বিষয়টি। বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছে মন্ত্রণালয়।
এদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে পিএসসির চলমান নিয়োগ পরীক্ষাসহ অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে অধিকতর তথ্য-উপাত্ত জানতে চাওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সম্প্রতি ৪৬ বিসিএস, রেলওয়ের পরীক্ষা ও স্টাফ নার্স পরীক্ষার বিষয় তাতে অগ্রাধিকার পেয়েছে। এ ছাড়াও পরীক্ষা নেওয়ার প্রক্রিয়া এবং কোন পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়Ñ তা জানতে চাওয়া হয়েছে। সার্বিক প্রক্রিয়া দেখভাল করছেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে সংযুক্ত উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার। মূলত তিনিই পিএসসি পুনর্গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রাখবেন।