আজ বিশ্ব পর্যটন দিবস
গোলাম কিবরিয়া
প্রকাশ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১২:০৬ পিএম
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে রাখা নৌকা। প্রবা ফটো
আজ বিশ্ব পর্যটন দিবস। পর্যটনের গুরুত্ব এবং সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মান তুলে ধরার উদ্দেশ্যে বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়। বিগত শতকের শেষভাগ থেকেই পর্যটন শিল্পকে বিশ্বব্যাপী একটি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এ বছর বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘পর্যটন এবং শান্তি’। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড দিবসটি পালন করছে ‘পর্যটন শান্তির সোপান’ প্রতিপাদ্যে। অর্থাৎ কেবলমাত্র অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য নয়, পর্যটন কাজ করে মানুষের মধ্যে বোঝাপড়া, সহমর্মিতা এবং শান্তি বিকাশের মাধ্যম হিসেবেও।
ঋতুবৈচিত্র্যের এ দেশে রয়েছে নদী-নালা, দক্ষিণে সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগর আর উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বের বিপরীতমুখী ভূমিরূপের বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্য। তবে এতকিছুর পরেও এ দেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশ প্রত্যাশামতো হয়নি। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের অভাব, দুর্বল অবকাঠামো, প্রশাসন ও স্থানীয় অধিবাসীদের পর্যটনমনস্ক না হওয়া, পর্যটনের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাবে ভ্রমণপিপাসুদের টানতে পারছে না বাংলাদেশ। ফলে কম খরচে ভ্রমণ ও বিনোদনের সুবিধা পেয়েও পর্যটকরা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশে চলে যাচ্ছেন। এমনকি বাংলাদেশের পর্যটকরাও দেশের গন্তব্য এড়িয়ে আশপাশের দেশে ছুটছেন। এ অবস্থায় পর্যটন শিল্পে গতি ফেরানো জরুরি।
অতিরিক্ত ট্যুর ও গাইড নিবন্ধন ফি
পর্যটনের বিকাশের প্রতিবন্ধক সম্পর্কে বলতে গিয়ে ট্রিয়াবের ফাউন্ডার প্রেসিডেন্ট খবির উদ্দিন আহমেদ বলেন, ট্যুর অপারেটরদের ওপর আরোপিত ভ্যাট ও লাইসেন্স ফি পর্যটন শিল্প বিকাশের অন্যতম বাধা। এটি বাতিল করা উচিত। ট্যুর অপারেটর ও ট্যুর গাইড (নিবন্ধন ও পরিচালনা) লাইসেন্স আবেদনের ক্ষেত্রে ৫০ হাজার টাকা, নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ১০ লাখ টাকা, ব্যাংক স্থিতির সার্টিফিকেট ৩ লাখ টাকা জামানত রেখে তারপর ট্যুর অপারেট করতে হবে। যা কি না একজন নতুন বা তরুণ উদ্যোক্তার জন্য ব্যয় করা অসম্ভব।
একই প্রসঙ্গে ই-ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইটাব) সভাপতি ইমরানুল আলম বলেন, পর্যটনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, যা বেকারত্ব কমায় এবং স্থানীয় মানুষদের জীবিকা নিশ্চিত করে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলে, মানুষের মধ্যে শান্তি এবং সামাজিক স্থিরতা আসে। তিনি সম্প্রতি পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত ট্যুর অপারেটরদের নিবন্ধন সংক্রান্ত নতুন গেজেটে উল্লিখিত বিধিনিষেধ ও নীতিমালা প্রসঙ্গে বলেন, এটি বাস্তবায়ন হলে উদ্যোক্তাদের পক্ষে পর্যটন শিল্প নিয়ে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়বে এবং অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প এগিয়ে নিতে তরুণ উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হবেন। বিকাশমান পর্যটন শিল্পের স্বার্থে ট্যুর অপারেটরদের সেবার ওপর মূসক আরোপ রহিত করারও দাবি জানান। তিনি বলেন, ট্যুর অপারেটররা বিভিন্ন খাত থেকে পর্যটন উপাদান সংগ্রহ করে পর্যটকদের সুবিধা ও আরামদায়ক ভ্রমণ সৃষ্টিকল্পে যে প্যাকেজ তৈরি করে তার মধ্যেই মূসক অন্তর্ভুক্ত থাকে।
এ বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত সচিব) আবু তাহের মুহাম্মদ জাবেরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বাংলাদেশ ট্যুর অপারেটর ও ট্যুর গাইড (নিবন্ধন ও পরিচালনা) আইন ২০২১-এর খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয় ২০২১ সালে। এতদিন পর্যন্ত এ সংক্রান্ত আমরা কোনো লিখিত প্রস্তাব পাইনি। তবে এখন যেহেতু পেয়েছি আমরা এ বিষয়ে কাজ করব। ইতোমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে।
কমছে বিদেশি পর্যটক
দেশের জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান ৩ দশমিক ০২ শতাংশ। অথচ পাশের দেশগুলো ১০ শতাংশের ওপর অবদান রাখছে। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালে বিদেশি পর্যটক এসেছেন মাত্র ২ লাখ ১৪ হাজার জন। অথচ ২০১৯ সালে এর সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ২১ হাজার ১৩১। করোনার মহামারির পর থেকেই দেশে বিদেশি নাগরিক আসা সীমিত হয়ে পড়ে। যেসব বিদেশি বাংলাদেশে আসেন, তাদের বেশিরভাগই আসেন প্রশিক্ষণ, ব্যবসা কিংবা দাপ্তরিক কাজে এ দেশে আসেন বলে জানালেন সংশ্লিষ্টরা। অর্থাৎ শুধু ভ্রমণের উদ্দেশ্যে খুব কম বিদেশিই বাংলাদেশে আসেন। বিটিবির তথ্যমতে, ২০২৪ থেকে ২০৪১ সাল পর্যন্ত ১৮ বছরের মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে বিদেশি পর্যটক নিয়ে আসার লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৫০ লাখ ৫০ হাজার। বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল বিদেশি পর্যটক বাড়াতে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসে পর্যটন বিষয়ক অফিসার নিয়োগ বা কাউকে দায়িত্ব দেওয়া উচিত। বিদেশে ট্যুরিজম ফেয়ার অথবা ট্রাভেল মার্টে যাওয়ার নীতিমালা প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি। এয়ারপোর্ট ও বর্ডারে ইমিগ্রেশন অফিসারদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা উচিত। প্রয়োজনে বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ও আধুনিক সময়োপযোগী কম্পিউটার ও সফটওয়্যারের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
পর্যটন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কচ্ছপগতি
২০৪১ সালের মধ্যে ৫.৫৭ মিলিয়ন বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের লক্ষ্যে ২০১৯ সালে ট্যুরিজম মাস্টারপ্ল্যান বা পর্যটন মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড (বিটিবি)। বিগত সরকারের সেই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কোনো গতি নেই বলে মনে করেন পর্যটন সংশ্লিষ্ট অনেকেই। ট্যুর অপারেটররা বলছেন, অপার সম্ভাবনা থাকলেও বিশ্বে পর্যটনশিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে তলানিতে। মুন্ডি ইনডেক্সের তথ্যানুযায়ী, পর্যটনশিল্পে বিশ্বের ১৮৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪১তম, আর এশিয়ার ৪৬টি দেশের মধ্যে ৪২তম। তাই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন যত দেরি হবে, পর্যটন খাতে ততই বাড়বে অব্যবস্থাপনা।
মাস্টারপ্ল্যানের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানাতে গিয়ে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের সিইও আবু তাহের মো. জাবের প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘মহাপরিকল্পনার মূল লক্ষ্য অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি। এ লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’
মহাপরিকল্পনার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে যেসব বড় প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল সেগুলোও থমকে গেছে। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের (বিটিবি) সূত্র জানা যায়, ২৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা ব্যয়ে বিদেশি পরামর্শক সংস্থা আইপিই গ্লোবাল পর্যটন মহাপরিকল্পনাটি প্রণয়ন করে।
বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে করা সংবাদ ব্রিফিংয়ে পর্যটন সচিব নাসরিন জাহান জানান, ট্যুরিজম মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত হচ্ছে শিগগিরই। ট্যুরিজম মাস্টারপ্ল্যানের মধ্যে ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে টাঙ্গুয়ার হাওর ইকো-ট্যুরিজম উন্নয়ন প্রকল্প; পদ্মা সেতু ট্যুরিজম কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্প; নিঝুম দ্বীপ ইকো-ট্যুরিজম উন্নয়ন প্রকল্প, সুন্দরবন শরণখোলা ট্যুরিজম কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্প এবং সোমপুর মহাবিহার হেরিটেজ ট্যুরিজম উন্নয়ন প্রকল্পকে অগ্রাধিকার হিসেবে ধরে কাজ চলছে।
ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য মতে, পর্যটন মহাপরিকল্পনায় দেশে পর্যটনের আঞ্চলিক ও কাঠামোগত পরিকল্পনার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। দেশের ৮ বিভাগকে ৮টি পর্যটন অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছে। পর্যটনের অবকাঠামো তৈরির জন্য উপযুক্ত জমি চিহ্নিতকরণসহ সারা দেশে ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন গন্তব্য চিহ্নিত করা হয়েছে।
এসব গন্তব্যের মধ্যে আছে বরিশাল অঞ্চলে ১০৭টি, চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৪২৬টি, ঢাকা অঞ্চলে ৩৫৩টি, খুলনা অঞ্চলে ১০৩টি, ময়মনসিংহ অঞ্চলে ৮৮টি, রংপুর অঞ্চলে ১৪৬টি, সিলেট অঞ্চলে ১২৩টি। এ ছাড়া মহাপরিকল্পনায় পর্যটন অংশীজন, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, পর্যটক, পর্যটন সেবা প্রদানকারীসহ সংশ্লিষ্ট সবার জন্য থিমভিত্তিক আচরণবিধি নির্ধারণ করা হয়েছে।
পর্যটনের উন্নয়নে ১৯টি মন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততা আছে। কিন্তু এসব সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ খাত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘদিনের। সঠিকভাবে পরিচালিত হলে এবং উপযুক্ত স্টেকহোল্ডারদের সহযোগিতা পেলে পর্যটন খাত বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে।