ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৯:৫৩ এএম
আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১১:০৭ এএম
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ছবি : সংগৃহীত
পাঁচ বছর পরপর সরকারি কর্মচারীর সম্পত্তি বা সম্পদের হিসাব জমা দেওয়ার বিধান থাকলেও গত চার দশকের বেশি সময় ধরে এ নিয়ম পুরোপুরি কার্যকর করতে পারেনি বিগত কোনো সরকারই। বিভিন্ন সময়ে কয়েকটি মন্ত্রণালয় তাদের কর্মচারীদের কাছে সম্পদের বিবরণী চেয়েও তেমন সাড়া পায়নি। ১৯৭৯ সালে সম্পদের হিসাব জমা দেওয়ার বিধানটি চালু হওয়ার পর থেকেই এমন অনীহা দেখা যাচ্ছে। তবে এবার যেন তার অবসান ঘটতে চলেছে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিষয়টি আবার সামনে এসেছে। জোর দিয়ে বলা হয়েছে, এখন থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের সম্পদের হিসাব দিতে হবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। শুধু তাই নয়, এরই মধ্যে কিছু কিছু মন্ত্রণালয়ের কর্মচারীরা তাদের সম্পদের হিসাব জমা দেওয়া শুরু করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে রবিবার (২২ সেপ্টেম্বর) বিকালে সচিবালয়ে বিষয়টি নিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়েছে। সিনিয়র সচিব ড. মো. মোখলেস উর রহমান এ বিষয়ে ব্রিফ করবেন বলে জানানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনের বিষয়ে মো. মোখলেস উর রহমান বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সব সরকারি কর্মচারীর সম্পদের হিসাব জমা দিতে হবে। এ কাজে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় মুখ্য ভূমিকা রাখছে। কী পদ্ধতিতে, কীভাবে হিসাব জমা দেবে তার একটি ফরম্যাট তাদের দেওয়া হয়েছে। নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কর্মচারীরা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কাছে হিসাব জমা দেবেন।’
প্রসঙ্গত, দীর্ঘদিনের প্রবণতা হচ্ছে- প্রশাসনের এক শ্রেণির কর্মচারী তাদের আয়কর রিটার্ন বা এনবিআরে জমা দেওয়া সম্পদ বিবরণীতে প্রকৃত সম্পদ দেখান না। বেনামে সম্পদ লুকিয়ে রাখার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। অথচ প্রতিটি আয়কর রিটার্ন ফরমের সঙ্গে আইটি ১০বি নামে একটি আলাদা ফরম থাকে। ওই ফরমেই সম্পদ বিবরণী জমা দিতে হয়। এ ছাড়া সম্পদ বিবরণী জমার তিনটি শর্ত রয়েছে। সে অনুযায়ী সম্পদের পরিমাণ ৪০ লাখ টাকা পার হলে, গাড়ির মালিক হলে এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় জমি-বাড়ি কিংবা ফ্ল্যাট থাকলে সম্পদ বিবরণী জমা বাধ্যতামূলক। দেশে প্রায় ১৫ লাখ সরকারি চাকরিজীবীর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আচরণ বিধিমালায় এ নিয়ম যুক্ত করা হয়।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. ফিরোজ মিয়া জানান, নিয়ম অনুসারে প্রতি পাঁচ বছর পর ডিসেম্বরে সরকারি কর্মচারীরা তাদের সম্পদের হিসাব জমা দেবেন। আগে তা প্রতিবছর দেওয়ার নিয়ম ছিল। এখন পাঁচ বছরেও অনেকে তা দিতে চান না। স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত জনপ্রশাসন গড়ে তোলার স্বার্থে এ আচরণবিধি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা উচিত। ক্যাডার নিয়ন্ত্রণকারী অন্য মন্ত্রণালয় নিশ্চুপ থাকলেও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় যেহেতু আচরণবিধি জারি করেছে, তাই তাদেরই মুখ্য ভূমিকা নেওয়া উচিত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের আয় ও সম্পদ বিবরণী প্রকাশের নীতিমালা, ২০২৪-এর খসড়া অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় এ অনুমোদন দেওয়া হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে- অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের আয় ও সম্পদ বিবরণী প্রকাশের নীতিমালার খসড়া প্রণয়নপূর্বক উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ যারা সরকারের অথবা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত, তারা প্রতিবছর আয়কর জমা দেওয়ার সর্বশেষ তারিখের পরবর্তী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে নীতিমালায় সংযুক্ত ছকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টার নিকট তাদের আয় ও সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়ার বিধান রেখে খসড়া আয় ও সম্পদ বিবরণী প্রকাশের নীতমালা উপদেষ্টা পরিষদ সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়।
সরকারি চাকরিজীবীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ১৯৭৯ সালের আচরণ বিধিমালায় সম্পদের হিসাব জমা দেওয়ার এ নিয়ম যুক্ত করা হয়। তবে চার দশকের বেশি সময় ধরে এ নিয়ম পুরোপুরি কার্যকর করা যায়নি। অনীহার কারণে হিসাব দেওয়ার বিষয়টি অনেকটাই ‘কাগুজে নিয়ম’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্যাডার নিয়ন্ত্রণকারী বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে দুয়েকটি তাদের অধীন কর্মকর্তাদের দায়সারা হিসাব নিলেও সেগুলো খতিয়ে দেখা হয় না। কারও অস্বাভাবিক সম্পদ বেড়ে গেলেও ব্যবস্থা নেওয়ার নজির নেই। সরকারি চাকরিতে ক্যাডার রয়েছে ২৬টি। এসব ক্যাডার কর্মকর্তা তাদের নিজ নিজ মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করেন। সম্পদের হিসাবও নিজ নিজ মন্ত্রণালয়েই দেওয়ার কথা। এর বাইরেও সরকারের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির বিপুলসংখ্যক নন-ক্যাডার কর্মকর্তা রয়েছেন। নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সরকারি কর্মচারীর ওপর সম্পদের হিসাব জমা দেওয়ার ব্যাপারে কোনো চাপই নেই।
সূত্র বলছে, ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সম্পদের হিসাব জমা দিতে কড়া নির্দেশ দেওয়া হলে ওই সময় সব কর্মচারী তা দিয়েছিলেন। ২০১৫ সালে আরেক দফা সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব জমা দিতে বলা হয়। তখন গুটিকয়েক মন্ত্রণালয় তাদের নিয়ন্ত্রিত কর্মচারীর সম্পদের হিসাব নিতে পারলেও বেশিরভাগই ব্যর্থ হয়। বিশেষ করে, সরকারি চিকিৎসকদের সম্পদের হিসাব চাওয়া নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বেশ বিপাকে পড়েছিল। চিকিৎসকের মধ্য থেকে এর জোরালো প্রতিবাদও ওঠে। সরকারি কর্মচারীকে আচরণবিধি মানাতে না পেরে গত বছরের শেষের দিকে এ নিয়ম বদলে ফেলার উদ্যোগ নেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। পরে আচরণবিধির সংশ্লিষ্ট ধারা (ধারা-১২ ও ১৩) সংশোধনের বিষয়টি সমালোচনার মুখে পড়লে এটি ঝুলিয়ে রাখা হয়। অবশেষে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বর্তমান আমলে সরকারি চাকরিজীবীদের সম্পদের বিবরণী জমা দেওেয়ার বিধান কার্যকর হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।