পারভেজ খান
প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৯:৪০ এএম
আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১০:৫০ এএম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একই দিনে দুই যুবককে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ছবি : সংগৃহীত
২০০৩ সালের এক বিকালের ঘটনা। রাজধানীর পান্থপথ মোড়ে ছিনতাইকারী সন্দেহে তিন যুবককে হাত-পা বেঁধে শত শত মানুষের সামনে আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলা হয়। সে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য! চারপাশে তখন রীতিমতো জটলা বেঁধে যায়। কেউ কেউ হাততালিও দিচ্ছিলেন! দর্শক সারিতে দুয়েকজন পুলিশ সদস্যকেও দেখা যায়। গায়ে কেরোসিন বা পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগানো, তারপর দগ্ধ ব্যক্তিদের আর্তচিৎকার এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া- শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো দৃশ্যই ধরা পড়ে সে সময় একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের ক্যামেরায়। সেটি প্রচারও হয়। ঘটনাটি ওই সময়ের আলোচিত প্রসঙ্গ হয়ে ওঠে।
২০১১ সালের ১৭ জুলাই। শবেবরাতের রাত। রাজধানীর ধানমন্ডির ম্যাপললিফ স্কুলের ছাত্র শামস, মিরপুর বাঙলা কলেজের ইব্রাহিম, কামরুজ্জামান, পলাশ; তেজগাঁও কলেজের টিপু ও মিরপুরের বিইউবিটির সিতাব জাবীর মুনিব। ওরা ছয় বন্ধু। সেই রাতে সাভারের আমিনবাজারে ঘুরতে গেলে ডাকাত সন্দেহে গণধোলাই দিয়ে ছয়জনকেই পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় ২০২১ সালের ২ ডিসেম্বর ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড ও ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত।
মাত্র ১০ দিন পর, অর্থাৎ একই বছরের ২৭ জুলাই নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের চরকাঁকড়ায় পুলিশের গাড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে জনতার মাঝে ফেলে দিয়ে মিলন নামে এক কিশোরকে গণধোলাইয়ের বলি বানানো হয়। বলা হয় মিলন ডাকাত দলের সদস্য ছিল। ওই ঘটনায় কয়েকজন পুলিশকে সাসপেন্ড করা হয়েছিল। কিন্তু পুলিশ বলে কথা! আটকের পর গাড়ি থেকে ফেলে দিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটালেও তদন্ত শেষে চার্জশিটে আর পুলিশের নাম আসেনি।
মাত্র কদিন আগের ঘটনা। গত ১৪ আগস্ট ধর্ষক অভিযোগে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর সায়েদাবাদ এলাকায় গণধোলাইয়ে তিনজনকে হত্যা করা হয়। কাকে ধর্ষণ করা হয়েছে, কবে হয়েছে, কারও জানা নেই। অথচ জটলাকারীরা সংঘবদ্ধ হয়ে নিজেরাই আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে তাদের বিচারকাজ শেষ করে ফেললেন। একেই বলা হয় ‘মব জাস্টিস’। অনেকেই মনে করেন, এ জাতীয় ঘটনায় ‘জাস্টিস’ শব্দটি ব্যবহার করাই অনুচিত। বিচারবুদ্ধি-মানবিকতা লোপ না পেলে কারও পক্ষেই এগুলো করা সম্ভব নয়। কাজেই যা ঘটে তা প্রকৃতপক্ষে বিচার নয়, প্রহসন।
গত কয়েক দিন ধরেই আলোচনায় এসেছে বা আসছে ‘মব জাস্টিস’ শব্দটি। মব (mob) অর্থ উত্তাল জনতা বা উচ্ছৃঙ্খল জনতা। জাস্টিস (Justice) অর্থ বিচার বা ন্যায়বিচার। ‘মব জাস্টিস’ অর্থ উত্তাল জনতা বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার বিচার। সাধারণভাবে বোঝায়, জনতা আইন বা আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে কোনো বিচার নিজ হাতে যখন তুলে নেয়, তখন সেটাই হয় মব জাস্টিস। এ ধরনের ঘটনায় যদি কেউ মারা যায় বা জনতার পিটুনিতে কারও মৃত্যু হলে ওই পরিস্থিতিকে বলা হয় লিঞ্চিং (lynching)। এটাও এক ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। এ ছাড়া উচ্ছৃঙ্খল জনতা দ্বারা বাড়িঘর পোড়ানো, কাউকে আহত করা, ভাঙচুর সবকিছুই মব জাস্টিসের অংশ।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গণমাধ্যম ডয়েচে ভেলের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০১১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত গণপিটুনিতে ৮০০ জনকে হত্যা করা হয়েছিল। এরপর গত সাড়ে ছয় বছরে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে আরও অন্তত ২৮৬ জন। এর মধ্যে ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর গত ৭ মাসে (জানুয়ারি-জুলাই) গণপিটুনিতে নিহতের সংখ্যা ৩২। এর মধ্যে ঢাকাতেই নিহত হয় ১৬ জন।
মব জাস্টিসের সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে সামনে আসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আবদুল্লাহ আল মাসুদকে (৩১) পিটিয়ে হত্যার ঘটনা। গত ৭ সেপ্টেম্বর রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন বিনোদপুর বাজারে মাসুদের ওপর হামলা হয়। পরে তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় থানায় সোপর্দ করা হয়। এরপর হাসপাতালে নেওয়া হলে রাত সাড়ে ১২টার দিকে তিনি মারা যান। ছাত্রজীবনে আবদুল্লাহ আল মাসুদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহসম্পাদক ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি নগরের বুধপাড়ার বাসিন্দা ছিলেন। ২০১৪ সালের ২৯ এপ্রিল সকালে ক্লাসে যাওয়ার পথে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া হলের সামনে হামলার শিকার হন আবদুল্লাহ আল মাসুদ। এতে মাসুদের ডান পায়ের নিচের অংশ গোড়ালি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
বর্বরতার মাত্রায় কোনও ঘটনাই কোনোটির চেয়ে কম নয়। তবে সর্বশেষ গত বুধবার রাতে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া একই ধরণের দুটি হত্যাকাণ্ড সর্বস্তরের মানুষকে হতভম্ব করেছে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর পুলিশের ‘নিষ্ক্রিয়তার মধ্যে’ বিভিন্ন এলাকায় এক দল মানুষের একজোট হয়ে এই মব জাস্টিস পদ্ধতিতে ‘বিচার’ করে ফেলার যে প্রবণতা দেখা দিয়েছে তা আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলছে অনেককেই। জনমনে তৈরি হয়েছে উৎকণ্ঠা। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিয়ে বারবার উদ্বেগ জানানো হয়েছে, এখনও হচ্ছে। আইন কোনোভাবেই হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে বারবার। কিন্তু আহ্বান জানানোই সার। যারা এসব কাজ করছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নজির দেখা যাচ্ছে না। সেই প্রবাদটির মতো তাই প্রশ্ন উঠছেÑ ‘বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?’
আলোচিত এসব ঘটনায় সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি, আইনের শাসনের প্রতি অনীহা এবং ভবিষ্যতে ‘প্রতিশোধ স্পৃহা’ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা অপরাধ বিশেষজ্ঞদের।
সাবেক আইজিপি খন্দকার হাসান মাহমুদ বৃহস্পতিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই ঠিক নয়। আইনবহির্ভূত কাজগুলো মানুষের মনে খুব বাজে প্রভাব ফেলে এবং আরও নতুন নতুন অপরাধের জন্ম দেয়। চারপাশে যে অবস্থা দেখা যাচ্ছে অতি দ্রুত সেই প্রবণতায় লাগাম টেনে ধরতে হবে। শাস্তির আওতায় আনতে হবে জড়িতদের। এ ছাড়া মব জাস্টিসের নামে অনেক ক্ষেত্রে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড চালিয়েও দুষ্কৃতকারীরা পার পেয়ে যেতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া এবং ব্যারিস্টার সায়েদুল মুনিম পিয়াস প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, এ ধরনের ঘটনাগুলো বিচারিক প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করে। ধরা যাক, আপনি যদি নিজের হাতে আইন তুলে নিতে চান বা নিজেকেই বিচারক ভেবে বসেন তাহলে আর দেশের প্রশাসন এবং বিচারব্যবস্থার দরকার আছে কি? এই মব জাস্টিস যে একটি বড় ধরনের অপরাধ সেটা সবাইকে বুঝতে হবে। সরকারকে নানান প্রচারণা ও দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে বোঝাতে হবে এই জাতীয় কাজ করলে তার পরিণাম কী হতে পারে।
কয়েকজন অপরাধ বিশ্লেষক বলেন, ছাত্র-জনতার প্রবল আন্দোলনে গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর থেকেই এই ঘটনাগুলো বেশি ঘটছে। কেউ কেউ অতি উৎসাহ নিয়ে আন্দোলনের অর্জনকে নিজেদের যা ইচ্ছা তা করার স্বাধীনতা ধরে নিয়ে নানান ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে। যখন-তখন প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে আক্রমণ হচ্ছে, মাজারে মাজারে হামলা হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের কাউকে কাউকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ‘অভিযানে’ যেতে দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে তুমুল আলোচনা হয়েছে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে অযাচিতভাবে কয়েকজন নারীকে হেনস্থা করার ঘটনাটি নিয়ে।
মব জাস্টিস নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারোরই নেই। মব জাস্টিস প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ঘটনা ঘটেছে, তারা তো সবাই শিক্ষিত। তাদের কাছ থেকে এটা আশা করা যায় না। কেউ আইন হাতে তুলে নিলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দেশে সব অপরাধেরই প্রচলিত আইনে শাস্তি আছে। আইন অনুযায়ী সবকিছু চললে সমাজে স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে। আইনের বাইরে গিয়ে কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি করা কখনও কাম্য নয়। মব জাস্টিসের নামে নৈরাজ্য গ্রহণযোগ্য নয়।
গত ৮ সেপ্টেম্বর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ছাত্র প্রতিনিধিদের বৈঠকেও বিষয়টি উঠে আসে। সেই আলোচনার পর প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলম ব্রিফিংয়ে বলেন, মব জাস্টিসের বিষয়ে সরকারের অবস্থান খুব স্পষ্ট। কোনোভাবে এগুলো হতে দেওয়া যাবে না। কেউ অপরাধ করে থাকলে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ছাড়া অন্য কারও নেই।
গত ১১ সেপ্টেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না। কেউ সমাজে বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি করলে আমরা তাকে অবশ্যই শাস্তির আওতায় নিয়ে আসব।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. ময়নুল ইসলাম বৃহস্পতিবার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, মব জাস্টিস কোনো প্রতিকার নয়, এটা একটা বড় ধরনের অপরাধ। এ ধরনের কর্মকাণ্ড ঘটানোর আইনগত অধিকার কারোরই নেই। কিছু উচ্ছৃঙ্খল ঘটনা ঘটছে, তবে খবর পেলেই পুলিশ সেখানে ছুটে যাচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। কোথাও এ ধরনের কিছু ঘটলে তিনি আমাদের জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে জানানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সরকারের সব মহলের সতর্কবার্তা ও হুঁশিয়ারির মধ্যেও মব জাস্টিসের মতো বর্ববরতা থেমে নেই। একের পর এক ঘটনা ঘটছে এবং তা দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের মতো জায়গাতেও।
গত বুধবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে মোবাইল চোর অভিযোগে ব্যাপক পিটুনিতে মারা গেছে তোফাজ্জল হোসেন নামে এক যুবক। এ ঘটনায় অজ্ঞাতদের আসামি করে মামলা করেছে ঢাবি প্রশাসন। গ্রেপ্তার হয়েছেন ৬ জন।
হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক শাহ মোহাম্মদ মাসুম গণমাধ্যমকে বলেন, তোফাজ্জলকে হলের ভেতরে আটকে রেখে মারধর করেন শিক্ষার্থীরা। হামলার পর হল কর্তৃপক্ষ তোফাজ্জলকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিমের কাছে হস্তান্তর করে। তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসার পরিবর্তে প্রক্টরিয়াল টিম তাকে শাহবাগ থানায় নিয়ে যায়। পরে পুলিশের পরামর্শে হাসপাতালে নেওয়া হলে রাত পৌনে ১২টার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পূর্ণ সহযোগিতা করছে।
একই দিনে এ ঘটনার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্মত্ততার শিকার হয়ে মারা যান জাবি শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শামীম মোল্লা। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ এনে বুধবার বিকালে তাকে মারধর করে একদল শিক্ষার্থী। পরে তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। রাতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান শামীম। এই ঘটনার প্রতিবাদে গতকাল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তোফাজ্জল হোসেনকে হত্যার প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে আবেগে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না। গতকাল একটি বেসরকারি টেলিভিশনকে তিনি বলেন, এই ছেলেটিকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম। মানসিকভাবে সে কিছুটা অপ্রকৃতিতস্থ ছিলো। এ রকম একটা ছেলেকে কিভাবে হত্যা করলো তা চিন্তাও করা যায় না। ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্ররা যদি এ ধরণের ঘটনা ঘটায় তাহলে আর যাওয়ার জায়গা কোথায়? একটা মানুষকে কেউ এইভাবে মারবে, এটা ভাবা যায়? আজকে বাংলাদেশে ৩০ থেকে ৩৫টার মতো মব জাস্টিসের ঘটনা ঘটেছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা কী অ্যাকশন নিয়েছেন? যদি না নেন, তাহলে বিন্দুমাত্র লজ্জা থাকলেও তার পদত্যাগ করা উচিত।
সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী ও চেয়ারপার্সন অ্যাডভোকেট এলিনা খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, মব জাস্টিস বলে আসলে কোনো শব্দ নেই। এ ধরনের কর্মকাণ্ড একটা অপরাধ। দীর্ঘসময় ধরে পুলিশের ও আইনের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতার কারণেই এই ধরনের অপরাধ করার প্রবণতা বেড়েছে। আবার সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের যে ভূমিকা সেটাও ঠিক নয়। পুলিশ এখন অতি ভদ্র সেজে অনেকটা হাত গুটিয়ে রয়েছে। পুলিশকে অবশ্যই ভদ্র থাকতে হবে, তবে তার অর্থ এই নয় যে যথাযথ আইন প্রয়োগে তারা কঠোর না হয়ে নীরব থাকবেন। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনাও নতুন নয়। এখান থেকে বের হতে হলে পুলিশের কঠোর হওয়ার পাশাপাশি জনসচেতনতা তৈরি করতে সরকারকেও আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। এই প্রবণতা যে অনেক বড় অপরাধ এবং মানবাধিকারের লংঘন সেটা সবাইকে বোঝাতে হবে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা কখনও রাষ্ট্রের জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে না।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এসব কর্মকাণ্ড বড় ধরনের অপরাধ। দেশে এমনিতেই একটা অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এই মুহূর্তে সুযোগসন্ধানী একটি চক্র পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পরিকল্পিতভাবে এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। দেশে প্রচলিত আইন আছে। কেউ অপরাধ করলে তাকে আইনের হাতে সোপর্দ না করে মারধর করা বা মেরে ফেলা মানবাধিকারেরও লংঘন। একটা সভ্য সমাজে এগুলোকে কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। শক্তভাবে এই প্রবণতাকে দমন করতে হবে।