ইসমাইল মাহমুদ, মৌলভীবাজার
প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১০:০৫ এএম
মো. আবদুস শহীদ
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে চা-বাগান করেছিলেন সাবেক কৃষিমন্ত্রী এবং মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো. আবদুস শহীদ। বন বিভাগ ২০১৮ সাল থেকে বেশ কয়েকবার চেষ্টা চালিয়েও সাবেক এই চিফ হুইপের দখলে চলে যাওয়া সংরক্ষিত বনের জমি উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়। অবশেষে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ সাবেক কৃষিমন্ত্রীর দখলে থাকা বনের জমির উদ্ধারকাজ শুরু করেছে। ইতোমধ্যে প্রায় পাঁচ একর উদ্ধার করা হয়েছে।
মঙ্গলবার প্রতিদিনের বাংলাদেশের কাছে বনের জমি উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম এবং মৌলভীবাজার রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম।
সংরক্ষিত বনভূমিতে চায়ের বাগান
বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের একটি সূত্র জানায়, ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত হওয়ার পর মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবদুস শহীদ জাতীয় সংসদের চিফ হুইপের দায়িত্ব পান। সে সময় তিনি লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের স্টুডেন্ট ডরমিটরির পাশে কিছু জমি স্বল্পমূল্যে কিনে ‘সাবারী টি প্ল্যান্টেশন’ নামে একটি চা-বাগান গড়ে তোলেন। সে সময়েই অভিযোগ ওঠে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে মো. আবদুস শহীদ নিজের কেনা স্বল্প জমির সঙ্গে লাউয়াছড়া উদ্যানের অনেকটা দখল করে ‘সাবারী টি প্ল্যান্টেশনে’ যুক্ত করেছেন। তিনি এবং আরও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি বনের জমি দখল করেছেনÑ এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালে বন বিভাগ লাউয়াছড়া বনের জমি ডিমারগেশনের (পরিমাপ) উদ্যোগ নেয়। কিন্তু নানা কারণে পরিমাপ সম্পন্ন করা যায়নি। একাধিকবার উদ্যোগ নিয়েও অদৃশ্য কারণে বন বিভাগ লাউয়াছড়া বনের জমি পরিমাপ করতে পারেনি।
বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘অনেক বছর ধরে ক্ষমতাবান সাবেক কৃষিমন্ত্রী আবদুস শহীদ অবৈধভাবে লাউয়াছড়া বনের জমি দখলে রেখেছেন। তিনি একাধিকবারের সংসদ সদস্য, সাবেক চিফ হুইপ। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সবখানেই তার একচ্ছত্র প্রভাব বিদ্যমান ছিল। সে কারণে ২০১৮ সাল থেকে বন বিভাগ একাধিকবার উদ্যোগ নিয়েও বনের জমি উদ্ধার করতে পারেনি।’ ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘২০১৮ সালে প্রশাসনের সহযোগিতায় পরিমাপ শুরুর পর বন বিভাগ এ প্রক্রিয়া থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। সে সময়ে লাউয়াছড়া বনবিট কর্মকর্তাকে ক্ষমতাধররা হুমকি-ধমকি দেয়। ওই মহলের হুমকির কারণে তিনি চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে কিছুদিন পর এ বনবিট থেকে বিদায় নেন।’
২০২২ সালের মার্চ মাসে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের প্রতিবেদনে উঠে আসে মো. আবদুস শহীদ কর্তৃক লাউয়াছড়া বনের জমি দখলের বিষয়টি। ওই প্রতিবেদনে তিনি নিজে বনভূমি দখলের কথা স্বীকার না করলেও বলেছিলেন, ‘(দখল করা বনভূমি) কার নাই? সবারই আছে। মেয়রের ভাই আছে, রিসোর্ট করছে না… তুমি গিয়ে থাকলে কোনো ভাড়াও নেবে না, লেমন গার্ডেন আছে। অর্ধেক জায়গা বনের। তুমি যদি এটা রিপোর্ট করতে পারো, রিপোর্ট করো।’ পরবর্তী সময়ে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে এসে বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে লাইভ করেছিলেন সদ্যসাবেক সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার সাইদুল হক সুমন।
কতটুকু জমি বেদখল নিশ্চিত নয় বন বিভাগ
বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘সাবেক কৃষিমন্ত্রী মো. আবদুস শহীদের দখলে লাউয়াছড়া সংরক্ষিত বনের বেশকিছু জমি রয়েছে। তবে ঠিক কতটুকু তা পরিমাপ না করা পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। এতদিন তার ক্ষমতার দাপটে আমাদের পক্ষে ওই জমি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। অবশেষে পটপরিবর্তনের পর গত ১৫ সেপ্টেম্বর দুপুরে বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. মো. জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) জামিল মোহাম্মদ খান ও আমিসহ ১৩৩ জন শ্রমিকের তত্ত্বাবধানে প্রাথমিকভাবে প্রায় পাঁচ একর বনের জমি সাবেক কৃষিমন্ত্রীর দখল থেকে উদ্ধার করে পুনরায় বন বিভাগের অধীনে নেওয়া হয়েছে। উদ্ধারকৃত এ জমিতে চাপালিশ, অর্জুন, বহেড়া, হরীতকী, জাম, লিচু, বকুল প্রভৃতি প্রজাতির পাঁচ সহস্রাধিক গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। লাউয়াছড়া বনের জমি পরিমাপের পর আর যদি কোনো জমি সাবেক এই কৃষিমন্ত্রীর বা অন্য কারও দখলে থেকে থাকে, তবে সেগুলোও উদ্ধার করা হবে।’
এ ব্যাপারে বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘কৃষিমন্ত্রীর দখলে কী পরিমাণ জমি রয়েছে, তা ডিমারগেশনের পর নিশ্চিত হতে পারব। তবে আমরা আমাদের লাউয়াছড়া স্টুডেন্ট ডরমিটরির পাশে অবস্থিত প্রায় ৫ একরের বেশি জমি সাবেক কৃষিমন্ত্রীর দখল থেকে উদ্ধার করেছি। সেখানে বন্য প্রাণীর খাদ্যোপযোগী নানা জাতের গাছের চারা রোপণ করেছি। লাউয়াছড়াকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পরিমাপ করে দখলমুক্ত করা হবে।’
স্ত্রীর নামে বাড়ি রয়েছে কানাডার বেগমপাড়ায়
উল্লেখ্য, সাবেক কৃষিমন্ত্রী আবদুস শহীদের বিরুদ্ধে ক্ষমতা অপব্যবহারের মাধ্যমে বন বিভাগের জমি দখল করে চা-বাগান তৈরি, সরকারি খরচে চা-বাগানের রাস্তার লাইট ও ডিপটিউবওয়েল বসানো ছাড়াও আইন লঙ্ঘন করে নানা দুর্নীতি-অনিয়মের প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে দুদক। গত ৮ সেপ্টেম্বর দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা আখতারুল ইসলাম গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানান। তিনি জানান, তদন্তে সাবেক মন্ত্রীর স্ত্রী ও সন্তানদের নামে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাড়ি-ফ্ল্যাট ও অন্যান্য সম্পদের তথ্য উঠে এসেছে। কানাডার ‘বেগমপাড়া’য়ও তার স্ত্রীর নামে একটি বাড়ি ও দেশে-বিদেশে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ রয়েছে।