দীপক দেব
প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৩:২৪ পিএম
বিটিআরসি ভবন। ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে (বিটিআরসি) অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে নিয়োগ ও পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রেক্ষিতে নড়েচড়ে বসেছে মন্ত্রণালয়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালীদের আত্মীয় ও সন্তানের পরিচয়ে বিটিআরসির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাসহ নানা ধরনের অনিয়ম ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধানে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। ২১ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়ও বেঁধে দেওয়া হয়েছে । অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় বিগত সময়ে বিটিআরসিতে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত কতিপয় কর্মকর্তার সেই পুরোনো গ্রুপটি এখনও বহাল তবিয়তেই আছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, এই গ্রুপের মধ্যে রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির কমিশনার ড. মুশফিক মান্নান চৌধুরী, পরিচালক এম এ তালেব হোসেন, উপপরিচালক খালেদ ফয়সল রহমান এবং শারমিন সুলতানা। অতীতেও তাদের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদনে অভিযোগ ‘সত্য’ বলে প্রমাণিত হয়েছিল। তবে তখন কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের স্বজন ও আত্মীয় হওয়ায় তারা আরও ক্ষমতাধর হয়ে ওঠেন।
গত ১৯ আগস্ট ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি উপদেষ্টার দপ্তরে জমা দেওয়া অভিযোগে চারজনের নাম উল্লেখ করে কমিশনার থেকে শুরু করে গাড়ির চালক নিয়োগে যে অনিয়ম হয়েছে তার বিস্তারিত খতিয়ান তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে এই সময়কালে পদোন্নতিতে যোগ্যদের বঞ্চিত করে আত্মীয়-স্বজনের ক্ষমতার দাপটের বিষয়েও অভিযোগ দিয়েছেন নির্যাতিত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এই অভিযোগপত্রে বিটিআরসির কমিশনারকে সুবিধাভোগী হিসেবে উল্লেখ করে বিগত (আওয়ামী লীগ) সরকারের আমলে সুবিধাভোগীদের সংগঠিত করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের জন্য অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরিতে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে কমিশনার মুশফিকের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়, তার বাবা আব্দুল মান্নান চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থি শিক্ষক ছিলেন, ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে কুমিল্লা-৬ থেকে আওয়ামী লীগের হয়ে অংশ নিতে মনোনয়ন চান। এই কমিশনার বিটিআরসির সাবেক চেয়ারম্যান শ্যাম সুন্দর শিকদারের সঙ্গে দ্বৈরথে জড়িয়ে পড়েন। এতে মদদ দেন সাবেক মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার। মনোমালিন্যের এক পর্যায়ে ফাইল নোটে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় করেন। এ ছাড়া ব্যাংকের এফডিআর দুর্নীতিতে সিদ্ধহস্ত হিসেবেও তাকে উল্লেখ করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তৎকালীন চেয়ারম্যান শ্যাম সুন্দর শিকদারের ছেলে বেসিক ব্যাংকের কর্মকর্তা হওয়ায় সেখানে বিটিআরসির সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিলের (এসওএফ) ৫০০ কোটি টাকা নিয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তফা জব্বারের সঙ্গে নতুন সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। (এসওএফ) ৫০০ কোটি টাকা মেয়াদি আমানত হিসেবে জমা রাখা নিয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রীর উপস্থিতিতেই ই-নথিতে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন কমিশনার মুশফিক। মন্ত্রী বারবার ই-নথিতে এ বিষয়ে আলোচনা না করে কমিশনের সভায় উপস্থাপন করতে নির্দেশ দিলেও চেয়ারম্যান শিকদার ও কমিশনার মুশফিক কেউ তার কথা শোনেননি।
তবে মন্ত্রণালয়ে জমা পড়া এসব অভিযোগকে ফেক হিসেবে উল্লেখ করে এসব নিয়ে লিখিত প্রশ্ন ছাড়া কথা বলতে চাননি কমিশনার ড. মুশফিক মান্নান চৌধুরী। তদন্ত কমিটি সম্পর্কেও কোনো কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তিনি এই বিষয়ে প্রশ্ন করায় প্রতিবেদকের ‘ভিন্ন উদ্দেশ্য’ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন।
অভিযোগপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসের পরিচালক এম এ তালেব হোসেন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিজের পদোন্নতি ও জনবল নিয়োগে সীমাহীন দুর্নীতিতে জড়িয়েছিলেন বলে উল্লেখ রয়েছে। আর এই ক্ষমতার মূল উৎস তার আপন চাচা সাবেক প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম। জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক থেকে উপ পরিচালক পদে পদোন্নতিতে পাঁচ মাস কম থাকার পরও ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। তবে এসব অভিযোগ সত্য নয় বলে দাবি করে পরিচালক এম এ তালেব হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, যেহেতু অভিযোগের বিষয়টি নিয়ে আমার কোনো ধারণা নেই, তাই আমি এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।
বিটিআরসির উপপরিচালক (প্রশাসন) ফয়সল রহমান নিজে বয়স প্রমার্জন করে কোনো লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করেই চাকরিতে যোগ দিয়ে নিজেও জড়িয়েছেন নিয়োগ বাণিজ্য ও দুর্নীতিতে। অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়, বিটিআরসিতে স্টাফ অফিসারের কোনো পদ না থাকলেও তিনি ছিলেন শ্যাম সুন্দর সিকদারের স্টাফ অফিসার। ২০১৩ সালে সহকারী পরিচালক পদে ফজলুর রহমান শেখ সর্বোচ্চ নম্বর পেলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল করার অভিযোগে তাকে চাকরি থেকে বাদ দিতে মূল ক্রীড়ানক ছিল এই ফয়সল। এমনকি অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ দেয় পরবর্তীতে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে মূল সহযোগী শাহিদ চৌধুরীকে। অফিস সহায়ক খলিলের চুরি প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও চাকরিতে বহাল রাখা, খলিলের আত্মীয় শাহাদাত হোসেনকে তৃতীয় শ্রেণি থাকা সত্ত্বেও আইটি সহকারী পদে চাকরি দেওয়ার কারিগরও ফয়সাল। লাইসেন্স প্রদানের নামে আবেদনকারীর কাছে বাড়তি অর্থ আদায়ের অভিযোগ প্রমাণিত হলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সাবেক চেয়ারম্যান। আর এসবের মূলে ছিল ফয়সলের বাবার রাজনৈতিক জোর। ফয়সলের বাবা ছিলেন কুমিল্লা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মফিজুর রহমান বাবলু।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিয়ে উপপরিচালক (প্রশাসন) ফয়সল রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমি এই বিষয়ে কিছু বলতে চাচ্ছি না।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক সময়ের প্রটোকল অফিসার ও একান্ত সচিবের দায়িত্ব পালনকারী দ্বাদশ সংসদের এমপি আলাউদ্দিন নাসিমের শ্যালিকা শারমিন সুলতানা ক্ষমতার অপব্যবহারে ছিলেন বিটিআরসিতে সেরাদের একজন। চাকরির বয়স পরিমার্জন করে এমনকি লিখিত পরীক্ষা না দিয়েও সরাসরি চাকরিতে যোগ দেন এই উপপরিচালক। নিরীক্ষা ও মন্ত্রণালয়ের তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হলেও নেওয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা। স্নাতকোত্তরের সনদ না থাকা সত্ত্বেও ব্যত্যয় ঘটিয়ে তাকে চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। যা নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও মন্ত্রণালয়ের তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। স্নাতকোত্তরের সনদ না থাকায় ২০২০ সালে কানাডার সেন্ট ম্যারী’স বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে কানাডার নাগরিক ছাড়া বাইরের কোনো নাগরিক বৃত্তি নিয়ে পড়ার সুযোগ না থাকায় তিনি যে কানাডার নাগরিক তা নিয়েও অভিযোগ তোলা হয়।
বিটিআরসিতে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে নিয়োগ পদোন্নতিসহ বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখতে গত ২৯ আগস্ট বিটিআরসির অতিরিক্ত সচিব মো. জানে আলমকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়। এই তদন্ত কমিটিকে ২১ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গঠিত তদন্ত কমিটিতে রয়েছেন যুগ্ম সচিব মাহবুব হাসান শাহীন ও উপ সচিব শারমিন সুলতানা।
এ বিষয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (টেলিকম) এ কে এম আমিরুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, অভিযোগের প্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় থেকে যে প্রক্রিয়া নেওয়া দরকার সেটা আমরা কালক্ষেপণ না করেই নিয়েছি। শুনেছি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। এই কমিটিকে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রতিবেদন দেবে। বিটিআরসির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. আমিনুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমি অল্প কিছুদিন হয়েছে বিটিআরসিতে যোগ দিয়েছি। সুতরাং এদের প্রত্যেককে আমি তেমনভাবে জানিও না। মন্ত্রণালয় থেকে তদন্ত কমিটি সংক্রান্ত কোনো ডকুমেন্ট এখনও পাইনি। তবে অফিসে এই বিষয়ে গুঞ্জন চলছে, সেখান থেকেই আমিও জানতে পেরেছি তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে।