× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পুনর্গঠন-সংস্কারই চ্যালেঞ্জ

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব ও আলাউদ্দিন আরিফ

প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০১:১১ এএম

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৭:১৬ পিএম

সচিবালয় ভবন। ছবি: সংগৃহীত

সচিবালয় ভবন। ছবি: সংগৃহীত

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও পুলিশ পুনর্গঠন। আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনপ্রশাসন সংস্কার। গত ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শপথগ্রহণের পর পদোন্নতি, বদলি ও পদায়ন কার্যক্রমেই এক মাস পেরিয়ে গেছে জনপ্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, দ্রুতই পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং সর্বত্র শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।  

উচ্চাভিলাষী ও অপেশাদার কতিপয় পুলিশ সদস্যের কর্মকাণ্ডের কারণে গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সবচেয়ে বেশি জিঘাংসার শিকার হয় পুলিশ বাহিনী। দেশের ৬৩৯টি থানার মধ্যে ৪৫০টির সম্পূর্ণ বা আংশিক ক্ষতি হয়। পুলিশের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে নিহত হন ৪৪ জন পুলিশ সদস্য। আহত হন ১০ হাজারের বেশি। পুলিশের বিভিন্ন ধরনের ৫ হাজার ৮২৯টি অস্ত্র লুট ও খোয়া যায় কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি লুট হয় ৬ লাখ ৬ হাজার ৭৪২ রাউন্ড গুলি। পুলিশের একাধিক স্থাপনা সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

পুরোপুরি কাজে ফিরতে পারেনি পুলিশ 

এ অব্স্থায় গত ৭ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শপথ নেওয়ার আগেই আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনকে সরিয়ে আইজিপির দায়িত্ব দেওয়া হয় মো. ময়নুল ইসলামকে। তিনি পুলিশ সদস্যদের কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানালে অনেকে কাজে যোগ না দিয়ে নানা দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন শুরু করেন। আইজিপি দক্ষতার সঙ্গে পরিস্থিতির মোকাবিলা করে পুলিশ পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেন। ইতোমধ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারসহ সকল মেট্রোপলিটন পুলিশে নতুন কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পরিবর্তন করা হয়েছে সকল রেঞ্জ ডিআইজি ও ৫০ জন পুলিশ ‍সুপারকে।

এ ছাড়া এসবি, সিআইডি, বিপিআিই, ডিবি পুলিশ, র‌্যাব, নৌপুলিশ, শিল্পপুলিশ, রেলওয়ে পুলিশ, এপিবিএনসহ অন্যান্য ইউনিটেও নতুন কর্মকর্তা পদায়ন হয়েছেন। দেশের অধিকাংশ থানার ওসিদের সরিয়ে নতুন ওসি দেওয়া হয়েছে। বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে ১৭ জন উচ্চাভিলাষী কর্মকর্তাকে। ওএসডি করা হয়েছে বিভিন্ন পর্যায়ের শতাধিক কর্মকর্তাকে। অবসর থেকে ফিরিয়ে এনে চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়েছে ৫ জনকে। কিন্তু এরপরও সরকারের এক মাসে পুরোদমে কাজে ফিরতে পারেনি পুলিশ। গাড়ি, অস্ত্র, গোলাবারুদসহ প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্টের অভাবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দৈনন্দিন টহল, তল্লাশি কার্যক্রম পুরোদমে শুরু করা যায়নি। শুরু হয়নি পরোয়ানাভুক্ত আসামি গ্রেপ্তার, মামলার তদন্ত ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে স্বাভাবিক অনেক কার্যক্রম। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইজিপি মো. ময়নুল ইসলাম বলেন, ‘একটু সময় লাগবে। যেসব এলাকায় পুলিশি কার্যক্রম সীমিত হয়ে গিয়েছিল, সেসব এলাকায় যাতে কার্যক্রম দ্রুত গতিশীল করা যায়, সেজন্য আমরা ব্যাপক আকারে বদলি-পদায়ন করেছি। রেঞ্জ ডিআইজি, কমিশনার ও পুলিশ সুপার বদলি হয়েছেন। তারা ইতোমধ্যে দায়িত্ব বুঝে নিয়েছেন। আপনারা দ্রুতই দেখবেন সকল কার্যক্রম বেগবান হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এই বিপ্লবে পুলিশের আত্মত্যাগ কম নয়, আমাদের ৪৪ জন সদস্য শহীদ হয়েছেন। ছাত্র-জনতার বড় একটি অংশের ক্ষতি হয়েছে। একশর মতো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ফৌজদারি অপরাধ তো কখনও তামাদি হয় না। সবকিছু যাচাই-বাচাই করা হচ্ছে। সাবেক দুই আইজিপিসহ অনেক সদস্যকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। যারা নিরাপত্তার অভাব বোধ করেনÑ আমাদের সহযোগিতা চাইবেন, আমরা তাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব।’

তিন দফা আহ্বানেও জমা পড়েনি ৫১.৬৬% অস্ত্র-গুলি  

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে মোট থানা রয়েছে ৬৩৯টি। এর মধ্যে ৪৫০টি আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর জনরোষের শিকার হয়। লুট করা হয় পুলিশের ৫ হাজার ৮২৯টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৬ লাখ ৪৫ হাজার ৩৪৯টি গোলাবারুদ। আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ১ হাজার ১৫৭টি রাইফেল, এসএমজি ২৮৩টি, টি-৫৪ মডেলের পিস্তল ১ হাজার ৫৫৬টি, এসএমটি ৩৩টি, শটগান ২ হাজার ১৯০টি, গ্যাসগান ৫৯৩টি, টিয়ার গ্যাস লঞ্চার ১৪টি ও সিগন্যাল পিস্তল তিনটি। গোলাবারুদের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন গুলি, টিয়ার গ্যাস শেল, টিয়ার গ্যাস গ্রেনেড, সাউন্ড গ্রেনেড, কালার স্মোক গ্রেনেড, মাল্টিপল ব্যাং স্টান গ্রেনেড, ফ্ল্যাশ ব্যাংক গ্রেনেড ও হ্যান্ড হেল্ড টিয়ার গ্যাস স্প্রে (ক্যানিস্টার)। লুট হওয়া এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দেওয়ার জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে তিন দফা সময় দেওয়া হলেও ৫১ দশমিক ৬৬ শতাংশই জমা পড়েনি। এ অবস্থায় যারা অস্ত্র জমা দেয়নি, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গত মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে সারা দেশে চলছে যৌথ অভিযান। যদিও এখন পর্যন্ত অভিযানে আশানুরূপ ফলাফল পাওয়া যায়নি। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে সরকারের এক মাসে আইনশৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে বলেন, ‘একটি বিপ্লবের পর আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক করা একটি বড় প্রশ্ন। পুলিশ বাহিনীর অনেক সদস্যের মনোবল ভেঙে পড়েছে। অনেকে স্বাভাবিকভাবে কর্মস্থলে যেতে পারছেন না। অনেকের মধ্যে অপরাধবোধ কাজ করছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সময় লাগবে। এ অবস্থায় সমাধান হলো যতটুকু আছে, ততটুকু নিয়ে কাজ শুরু করা। পুলিশি কার্যক্রমে স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে পেতে এখনও অনেক সময় লাগবে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে। 

সংস্কারেই ব্যস্ত জনপ্রশাসন

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর দ্রুতই জনপ্রশাসন সংস্কারের পদক্ষেপ শুরু করে সরকার। এরই অংশ হিসেবে বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক কারণে পদোন্নতি না পাওয়া তিন স্তরের কর্মকর্তাদের (উপসচিব, যুগ্ম সচিব ও অতিরিক্ত সচিব) পদোন্নতি ও পদায়ন করা হয়। গত ১৩ আগস্ট প্রথম পদোন্নতি পান উপসচিব পদের কর্মকর্তারা। দুদিন পর ১৫ আগস্ট তাদের অনেকেই যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পান। এর তিন দিন পর ১৮ আগস্ট তাদের আরও একবার পদোন্নতি দিয়ে অতিরিক্ত সচিব করা হয়।

এসব কর্মকর্তার মধ্য থেকে যোগ্যদের সচিব এবং বাকিদের কাউকে কাউকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও অধিদপ্তরে অতি দ্রুতই পদায়ন করা হবে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিসিএস প্রশাসন ৮২ ব্যাচের কয়েকজনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো কর্মকর্তাকে প্রথমে সচিব, পরে সিনিয়র সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। পাশাপাশি কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের সচিবকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে। পাশাপাশি মন্ত্রিপরিষদ সচিব বাদে সকল চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করেছে সরকার। 

ইতোমধ্যে মাঠ প্রশাসনে থাকা জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) মধ্যে ২৫ জেলার ডিসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। শিগগির বাকি ডিসিদের প্রত্যাহার করার কার্যক্রম চলছে। সেখানে নতুন জেলা প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে। এজন্য বৈষম্যের শিকার ২৪, ২৫ ও ২৭ ব্যাচের কর্মকর্তাদের নিয়ে নতুন ডিসি ফিট লিস্ট করা হয়েছে। তাদের মৌখিক পরীক্ষা চলতি সপ্তাহে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর নতুনভাবে ডিসি নিয়োগ দেওয়া হবে। 

এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো. মোখলেস উর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রশাসন সংস্কারের কাজ করছে। বৈষম্যের শিকার কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও পদায়ন করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসক নিয়োগের লক্ষ্যে নতুন ফিট লিস্ট তৈরি করে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। সচিব পর্যায়ে রদবদল শুরু হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে বা যারা অতি-উৎসাহী হয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন, এমন কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হবে।’ 

তিনি বলেন, ‘স্বল্প সময়ে প্রশাসন সংস্কার করা সম্ভব হবে না। তাই সময় নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে ২৫ জেলার ডিসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। অন্যদেরও করা হবে। খুব শিগগির সকল জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে মাঠ প্রশাসনে থাকা অন্যান্য কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার কিংবা ওএসডি করা হবে।’

ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব জাহাংগীর আলমকে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এছাড়াও নৌ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোস্তফা কামাল ও জনপ্রশাসনের সিনিয়র সচিব মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সচিব মোহাম্মদ সালাহ উদ্দীন এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সচিব আজিজুর রহমানকে ওএসডি করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবসহ চুক্তিতে থাকা ২৬ জন শীর্ষ কর্মকর্তার চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। তবে চুক্তিতে থাকা মন্ত্রিপরিষদ সচিব মাহবুব হোসেনকে স্বপদে রাখা হয়েছে। 

একাধিক বঞ্চিত কর্মকর্তা জানান, সীমিত সংখ্যক কর্মকর্তা দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেলেও বিদায়ি সরকারের বেশিরভাগ সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিব স্ব স্ব দপ্তরে বহাল তবিয়তে রয়েছেন। কেউ কেউ আঞ্চলিকতার সূত্রে প্রভাব খাটিয়ে স্ব স্ব ক্ষেত্রে অবস্থান করছেন। তাই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের এক মাস পূর্ণ হলেও প্রশাসনের সংস্কার কার্যক্রম চলছে অনেকটাই ধীরগতিতে। প্রশাসন ঢেলে সাজাতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হবে না বলে মনে করছেন তারা।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা