আলাউদ্দিন আরিফ
প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০২৪ ১০:০৬ এএম
আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২৪ ১১:৫৬ এএম
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে সিরিজ মামলা হচ্ছে। এমনকি ৮/১০ বছর আগের বিভিন্ন রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা উল্লেখ করেও মামলা হচ্ছে। এসব মামলায় সাবেক মন্ত্রী, এমপি এবং আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি আসামি করা হচ্ছে ব্যবসায়ী, প্রবাসী, অভিনেতা, সাংবাদিক, খেলোয়াড়, আমলাসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষদেরকে। এসব আসামির অনেকেরই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকার বিষয়টি অস্পষ্ট। কিছু মামলার যৌক্তিকতা নিয়েও কথা উঠছে। কিছু মামলার ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে। অনেকের মতে, এই মামলাগুলো প্রশ্নবিদ্ধ। এগুলো আদালতে টিকবে না। এমনকি বিচারের প্রথম ধাপও পার হতে পারবে না। এসব মামলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলবে।
এসব মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মো. মইনুল হাসান বলেন, ‘নিহতদের স্বজনরা মামলা করছেন। সেগুলো পুলিশ রেকর্ড করছে। আসামিদের মধ্যে অনেকেই ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বিপক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন, বিবৃতি দিয়েছেন। অর্থায়নও করেছেন কেউ কেউ। তবে এদের মধ্যে কেউ যদি নিরপরাধ থেকে থাকেন তদন্ত শেষে তাদেরকে বাদ দেওয়া হবে।’
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রথম মামলাটি হয় গত ১৩ আগস্ট ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বসিলা এলাকায় পুলিশের গুলিতে মুদি দোকানের মালিক আবু সায়েদের মৃত্যুর ঘটনায় করা ওই মামলায় শেখ হাসিনাসহ সাতজনকে আসামি করা হয়। এই মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, পুলিশের সাবেক আইজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. হারুন অর রশীদ, ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান ও ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকারকে আসামি করা হয়। এরপর থেকে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন থানা ও জেলায় শেখ হাসিনা, কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী-এমপি এবং আওয়ামী লীগ নেতাসহ বিভিন্ন জনকে আসামি করে একের পর এক মামলা হতে থাকে।
গত ১৪ আগস্ট শেখ হাসিনাসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগ এনে মামলা করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী গাজী এমএইচ তানিম। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় বাদী গত ৫ আগস্ট সাভারে গুলিবিদ্ধ নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আলিফ আহমেদ সিয়ামের বাবা বুলবুল কবিরের পক্ষে তিনি এ অভিযোগ করেন।
গত ২২ আগস্ট যাত্রাবাড়ী থানায় শিক্ষার্থী নাঈম হাওলাদারের বাবা মো. কামরুল ইসলামের করা মামলায় সাতজন সাংবাদিককেও আসামি করা হয়। তারা হলেনÑ একাত্তর টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু, সাবেক বার্তাপ্রধান শাকিল আহমেদ ও সাবেক প্রধান প্রতিবেদক-উপস্থাপক ফারজানা রুপা, সময় টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ জোবায়ের, এটিএন নিউজের সাবেক বার্তাপ্রধান মুন্নী সাহা, গ্লোবাল টেলিভিশনের সাবেক প্রধান সম্পাদক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রেস সচিব নাঈমুল ইসলাম খান। এর আগে গত ২১ আগস্ট শাকিল ও ফারজানা রুপাকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে ওইদিন উত্তরা পূর্ব থানায় হত্যা মামলা হয়।
গত ২২ আগস্ট পোশাককর্মী মো. রুবেলকে গুলি করে হত্যার অভিযোগে আদাবর থানায় মামলা করেন তার বাবা রফিকুল ইসলাম। মামলায় জাতীয় দলের ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান ও চিত্রনায়ক ফেরদৌসসহ বেশ কয়েকজনকে আসামি করা হয়। এই মামলায় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম ও তার দুই ছেলেকেও আসামি করা হয়েছে।
গত ২০ আগস্ট সিলেটের বিয়ানীবাজার থানায় একটি হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে ৯ প্রবাসী, ছয় সাংবাদিক ও আওয়ামী লীগের ৭৫ নেতাকর্মীকে। মামলার বাদী দেখানো হয় নিহত তারেক আহমদের মা ইনারুন নেছাকে। তিনি বলেন, ‘আসামিরা আমার পূর্বপরিচিত। তারা হামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। একদল লোক এসে আমার মৃত ছেলের জন্য সাহায্যের নাম করে সাদা কাগজে দস্তখত নিয়ে এই মামলা করেছে। আমি এই মামলা চালাব না।
এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা করে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে গতকাল রবিবার চিত্রনায়ক জায়েদ খান, অভিনেতা শাহরিয়ার নাজিম জয়, সাজু খাদেমসহ ৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে আদালতে। ব্যান্ডশিল্পী আসিফ ইমামের করা মামলায় শেখ সেলিম, শেখ হেলাল, কর্নেল (অব.) ফারুক খান, ফজলে নূর তাপস, নিক্সন চৌধুরী, সাঈদ খোকন, হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খান মেনন ও বাফুফের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনকেও আসামি করা হয়েছে।
এসব মামলার বিষয়ে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) নির্বাহী পরিচালক (অবৈতনিক) সারা হোসেন বলেন, নানা ধরনের মামলা দেখা যাচ্ছে। আসামিও অনেক। এ ধরনের মামলা প্রথম ধাপই পার হতে পারবে না। এসব মামলা বন্ধ করতে হবে। মামলার এজাহার ক্ষোভ ঝাড়ার জায়গা নয়। তিনি আরও বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জনতার অভ্যুত্থানে অন্তত ৮০ শিশু নিহত হয়েছে। এসব নিহতের ভিডিও ফুটেজ যদি কারও কাছে থাকে, সেগুলো সংগ্রহ করে মামলায় সাক্ষ্যপ্রমাণ হিসেবে এগোতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, দুর্বল তথ্য, দুর্বল সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে করা মামলাগুলো ‘আস্থার সংকট’ তৈরি করবে। দেশে এখন মামলার জোয়ার চলছে। যার ওপর যার ক্ষোভ, তাকেই আসামি করা হচ্ছে। এখানে সরকারের একটি গাইডলাইন থাকা দরকার ছিল। মামলা তদন্তে সংকট দেখা দেওয়ার পাশাপাশি বিচার বিভাগের জন্যও জটিল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলে, বিগত দিনেও আমরা যেমন দেখেছি দুর্বল তথ্যের ভিত্তিতে হয়রানিমূলক মামলা দেওয়া হয়েছে। এখনও একই ধরনের মামলা হচ্ছে। এজন্য এখনই উচিত সরকারের একটি টাস্কফোর্স গঠন করে প্রত্যেকটি মামলার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সামনে আনা। পাশাপাশি আদালতে যেভাবে আসামিদের ওপর হামলা হচ্ছে সেটাও অত্যন্ত লজ্জাজনক।
এ প্রসঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আব্দুল্লাহ সালেহীন অয়ন বলেন, ‘হত্যা মামলাগুলোয় যাদের আসামি করা হচ্ছে, তাদের যদি সম্পৃক্ততা না থাকে, তাহলে সঠিক বিচারের মাধ্যমে তারা অব্যাহতি পাবেন। আর যদি কেউ জড়িত থাকেন, তাহলে তিনি শাস্তির মুখোমুখি হবেন।’