প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৪ ১৪:৩৪ পিএম
শনিবার বিকেলে কুমিল্লার বুড়িচং থেকে তোলা। প্রবা ফটো
দেশের দক্ষিণ, পার্বত্য অঞ্চলসহ উত্তর-পূর্বের জেলাগুলোয় পানি কমতে থাকলেও বন্যা পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোনো উন্নতি হয়নি। জলাবদ্ধতার কারণে আশ্রয়, খাবার ও সুপেয় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। গত কয়েক দিনে বন্যার ভয়াবহতায় দুর্গত এলাকাগুলোয় ভেঙে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা।
এ ছাড়াও আশ্রয়কেন্দ্রে দুর্গতদের ভিড় সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে স্বেচ্ছাসেবকদের। পাশাপাশি নতুন করে কয়েকটি এলাকা প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়াও খাগড়াছড়িতে বন্যার পানিতে ডুবে এক কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে এবং চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে বন্যায় ভেসে যাওয়া দুজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পার্বত্য জেলাসহ মারাত্মক ক্ষতির শিকার এলাকাগুলোয় সেনাবাহিনী, বিজিবি ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের সঙ্গে বিভিন্ন সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবীরা উদ্ধার ও ত্রাণ সরবরাহ করছেন।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সন্ধ্যা ৬টার এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দেশের পূর্বাঞ্চলীয় কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ফেনী জেলার ভারতীয় ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এবং ত্রিপুরা প্রদেশের অভ্যন্তরীণ অববাহিকাসমূহে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়নি। এতে উজানের নদ-নদীর পানি কমা অব্যাহত আছে। ফলে বর্তমানে মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ফেনী, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম জেলার নিম্নাঞ্চলের বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত আছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান বলেন, আগামী ১৫ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও তার কাছাকাছি উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা নেই। এ সময় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার মনু, খোয়াই, ধলাই নদসমূহের পানি সমতল হ্রাস পেতে পারে এবং তার কাছাকাছি নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত থাকতে পারে। একই সময়ে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল ও তার কাছাকাছি উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা নেই। এ সময় এ অঞ্চলের ফেনী, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম জেলার মুহুরী, ফেনী, গোমতী, হালদা ইত্যাদি নদীসমূহের পানি সমতল হ্রাস পেতে পারে এবং তার কাছাকাছি নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত থাকতে পারে।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর গতকাল সন্ধ্যায় আগামী ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে জানিয়েছে, আজ রবিবার চট্টগ্রাম, বরিশাল ও খুলনা বিভাগের অধিকাংশ জায়গায়; ঢাকা, রাজশাহী, রংপুর, সিলেট, ময়মনসিংহ বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম, বরিশাল ও খুলনা বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে।
ফেনী প্রতিবেদক জানান, জেলার পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়ার পর ফেনী সদরেও ধীরগতিতে পানি কমতে শুরু করেছে। তবে দাগনভূঞা ও সোনাগাজীতে বন্যার পানি বাড়ছে। এ পর্যন্ত ৫০ হাজার মানুষকে বন্যাদুর্গত অঞ্চল হতে উদ্ধার করে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রসহ নিরাপদ স্থানে রাখা হয়েছে।
জেলা প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সূত্রে জানা গেছে, আজ পর্যন্ত প্রায় ৪০ হাজারের অধিক মানুষের কাছে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। ইতঃপূর্বে তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি থাকার তথ্য জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক শাহীনা আক্তার।
এদিকে জেলার অধিকাংশ এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক অচল রয়েছে, বিদ্যুৎ সংযোগ দুই-তৃতীয়াংশ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এতে জনদুর্ভোগসহ সংবাদকর্মীদের বার্তা প্রেরণে প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
নোয়াখালী প্রতিবেদক জানান, দুই দিন বৃষ্টিহীন থাকার পর গতকাল শনিবার জেলায় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হয়। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন আশ্রয়কেন্দ্রের বাসিন্দারা। এদিকে এখন পর্যন্ত জেলায় বন্যায় তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিহতরা হলোÑ সেনবাগ উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের কাকন কর্মকার, কাবিলপুর ইউনিয়নের পূর্ব ইয়ারপুর গ্রামের জিলহাজুল ইসলাম ও সদর উপজেলার কালাদরাপ ইউনিয়নের পূর্ব শুল্লুকিয়া গ্রামের রিয়ন।
জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পানি কমতে শুরু করলেও আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করা মানুষরা বাড়িতে ফিরতে পারছে না। এদিকে নোয়াখালীর ৮ উপজেলায় পানিবন্দি মানুষদের উদ্ধারে কাজ করছে সেনাবাহিনী। এসব মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যান তারা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড নোয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী মুন্সী আমির ফয়সাল বলেন, সাগরে ভাটা থাকায় মুছাপুর রেগুলেটর দিয়ে তীব্র গতিতে পানি নামছে। জেলা শহর ও আশপাশের উপজেলায় ৫ থেকে ৬ ইঞ্চি পানি কমেছে। এভাবে কমতে থাকলে ৩-৪ দিনের মধ্যে বন্যা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হবে।
লক্ষ্মীপুর প্রতিবেদক জানান, জেলা শহরসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ইউনিয়নগুলোয় পানি কমতে শুরু করলেও শুক্রবার থেকে নোয়াখালীর বন্যার পানি রহমতখালী খালসহ বিভিন্নভাবে ঢুকছে। এতে লক্ষ্মীপুর পৌরসভার কয়েকটি ওয়ার্ড ও পূর্বাঞ্চলের ইউনিয়নগুলোর অধিকাংশ এলাকার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। গতকাল শনিবার বিকাল থেকে এ পানির চাপ বেড়ে গেছে। নতুন করে প্লাবিত হয়েছে আরও কয়েকটি গ্রাম। এ ছাড়াও রামগতি ও কমলনগর উপজেলার চরকাদিরা-হাজীগঞ্জ বেড়ির পশ্চিম পাশে ভুলুয়া নদীতে বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে প্রায় ২৫ দিন ধরে পানিতে ডুবে আছে বিস্তীর্ণ জনপদ। এ ছাড়াও রায়পুর, আণ্ডারচর ও চরমটুয়া গ্রামের কয়েক লাখ মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।
কসবা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিবেদক জানান, বৃষ্টি না হওয়ায় উপজেলায় পানি কমতে শুরু করেছে। তবে এখনও উপজেলার ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে। গতকাল শনিবার ভোর থেকে বৃষ্টি না হওয়ায় উপজেলার ডুবে যাওয়া নিম্নাঞ্চল থেকে পানি নামতে শুরু করেছে। এ ছাড়াও উপদ্রুত এলাকাগুলোয় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণ করা হয়।
কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিবেদক জানান, উপজেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। নদীর পানি কমতে শুরু করায় ইসলামপুর, আদমপুর, আলীনগর ইউনিয়নে প্লাবিত বেশিরভাগ এলাকা থেকে বন্যার পানি নামলেও মুন্সীবাজার, শমসেরনগর, পতনঊষার ইউনিয়নের বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। এ দিকে বন্যার পানি কমায় সড়ক পথের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল এলজিইডির প্রায় ৮০ কিলোমিটার গ্রামীণ আঞ্চলিক সড়কের ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করছে সংশ্লিষ্টরা। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভেসে উঠছে সড়কের ক্ষতচিহ্ন। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কে চরম দুর্ভোগ নিয়ে যাতায়াত করছেন এলাকাবাসী।
খাগড়াছড়ি প্রতিবেদক জানান, জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ২০ হাজার পরিবার। এদিকে খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় বন্যার পানিতে ডুবে কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে। গত শুক্রবার বিকালে খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলার মেরুং ইউনিয়নের কাবুল্যা পাড়ায় এই ঘটনা ঘটে। নিহত রুশা চাকমা পল্টু চাকমার মেয়ে।
ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম) প্রতিবেদক জানান, গত বৃহস্পতিবার বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়া দুজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ফটিকছড়ির ভুজপুর ইউনিয়ন ও নারায়ণহাটে তাদের লাশ পাওয়া যায়। ভুজপুর ইউনিয়নে ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে পানিতে তলিয়ে যান রজি আহমেদ (৫৫)। এ ছাড়া সন্দ্বীপ নগর থেকে অন্যকে বাঁচাতে গিয়ে নিখোঁজ এমরানের মরদেহ উদ্ধার করা হয় নারায়ণহাট থেকে।
দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিবেদক জানান, বন্যা আতঙ্কে রয়েছে উপজেলার পদ্মা পাড়ের বাসিন্দারা। ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পানিতে গেল জুলাই কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পানি বৃদ্ধি পায়। আগস্টের মাঝামাঝি থেকে কিছুটা কমতে শুরু করে। তবে পুনরায় পানি বাড়ায় বন্যার আশঙ্কায় রয়েছেন নদীঘেঁষা উপজেলার চার ইউনিয়নে বাসিন্দারা। ইতোমধ্যে চরের বেশ কিছু আবাদি জমিসহ প্লাবিত হয়েছে নিম্নাঞ্চল। দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে সংশ্লিষ্টরা।
কাপ্তাই (রাঙামাটি) প্রতিবেদক জানান, টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদে পানি বেড়ে সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা বা বিপদসীমার কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে। গতকাল শনিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত কাপ্তাই হ্রদে পানি আছে ১০৭ দশমিক ৪০ এমএসএল। যেখানে সর্বোচ্চ পানি ধারণ ক্ষমতা ১০৯ এমএসএল।
এদিকে কাপ্তাই হ্রদের পানি বিপদসীমার কাছাকাছি পৌঁছানোর ফলে হ্রদসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ইতোমধ্যে কাপ্তাই হ্রদের পানিতে হ্রদের নিম্নাঞ্চলের অনেকের ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে কাপ্তাই বাঁধের স্পিলওয়ের ১৬টি গেট গতকাল রাত ১০টায় খুলে দেওয়া হয়। এতে বাঁধের ১৬টি স্পিলওয়ের মাধ্যমে ৬ ইঞ্চি করে পানি নিষ্কাশন করা হবে; যা কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে পড়বে। এতে আতঙ্কিত না হতে পরামর্শ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।