× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

স্থানীয় সরকারেও কর্তৃত্ব হারাচ্ছে আওয়ামী লীগ

কাজী হাফিজ

প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৪ ০৯:২০ এএম

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৪ ১১:০৩ এএম

স্থানীয় সরকারেও কর্তৃত্ব হারাচ্ছে আওয়ামী লীগ

জাতীয় সংসদ ও সরকারের পর স্থানীয় সরকারেও আওয়ামী লীগ কর্তৃত্ব হারানোর পথে। গত পাঁচ আগস্ট গণআন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রীর পদ এবং দেশ ছাড়ার পরদিন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তার সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে সংসদ ভেঙে দেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এদিকে একতরফা নির্বাচনে দীর্ঘ সময় ধরে জেলা ও উপজেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার সব শীর্ষ পদই ছিল আওয়ামী লীগ নেতাদের দখলে। পাঁচ আগস্টের পর তাদের বেশিরভাগই পলাতক। এ অবস্থায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ এসব পদ থেকে তাদের অপসারণ করে প্রশাসক নিয়োগ করার পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। এতে দ্রুত অপসারিত হতে পারেন সব মিলিয়ে কয়েক হাজার আওয়ামীপন্থি মেয়র, কাউন্সিলর, চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান। এ পদক্ষেপ বাস্তবায়নে আইনগত বাধা এড়াতে সংশ্লিষ্ট সব আইনের সংশোধন এনে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারি হতে যাচ্ছে। উপদেষ্টা পরিষদ ইতোমধ্যে অধ্যাদেশ আকারে এসব আইন সংশোধনের খসড়া অনুমোদন করেছে। 

নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থানীয় সরকারে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা পলাতক থাকলে জনসেবা বিঘ্নিত হয়। এ পরিস্থিতিতে বিদ্যমান আইনে প্রশাসক নিয়োগেরও বিধান নেই। সে কারণে আইন সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে। আবার কেউ বলছেন, প্রশাসক নিয়োগ না করে যারা পলাতক নন এবং অভিযোগমুক্ত, তাদের মতামত নিয়ে তাদের মধ্য থেকেই অস্থায়ীভাবে মেয়র, চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। 

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, অধ্যাদেশের যে খসড়া অনুমোদন হয়েছে, তা একদিক থেকে ঠিক আছে। তবে প্রশাসক নিয়োগ না করেও বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে যারা পলাতক না, তাদেরকে বলা যেতে পারে আপনাদের মধ্য থেকেই নাম প্রস্তাব করেন। তাদের প্রস্তাব থেকে দ্রুত অস্থায়ীভাবে মেয়র, চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। এরপর যারা পলাতক, অনুপস্থিতির কারণ জানাতে নোটিস করার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের পদ শূন্য ঘোষণা করে উপনির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। এ উপনির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন এবং স্থানীয় সরকার আইনেরও সংশোধন দরকার। 

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমেই স্থানীয় সরকার পরিচালিত হতে হবে। বিদ্যমান আইনে উপজেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভাÑ এসব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নতুন হলে, বিভক্ত হলে বা কোনো কারণে মেয়াদোত্তীর্ণ হলে একবার এবং সর্বোচ্চ ১৮০ দিনের জন্য প্রশাসক নিয়োগ করা যায়। এই ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে হবে। কিন্তু পলাতক বা অনুপস্থিত থাকলে প্রশাসক নিয়োগের সুযোগ নেই। প্যানেল মেয়র বা প্যানেল চেয়ারম্যানের কাছেই দায়িত্ব দিতে হবে। সেক্ষেত্রে তাদের প্রতি আস্থা না থাকলে প্রশাসক নিয়োগের জন্য আইন সংশোধন করার প্রয়োজন হতে পারে। 

বাংলাদেশ উপজেলা পরিষদ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হারুন অর-রশীদ হাওলাদার বলেন, ‘রাজনৈতিক কারণে বেশিরভাগ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যানরা গা ঢাকা দিয়েছেন। এসব জনপ্রতিনিধি যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই পরিষদের পরপর তিনটি সভায় অনুপস্থিত থাকলে, রাষ্ট্রের স্বার্থ হানিকর কোনো কার্যকলাপে জড়িত থাকলে বিদ্যমান আইনেই সরকার তাদের একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপসারণ করতে পারে। তবে বিদ্যমান আইন সংশোধন হচ্ছে প্রক্রিয়াগত দীর্ঘসূত্রতা এড়ানো এবং প্রশাসক নিয়োগের জন্য। 

বিদ্যমান আইনে যা আছে

বিদ্যমান স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ) আইনে চেয়ারম্যানদের অপসারণ সম্পর্কে বলা আছেÑ যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া যদি পরিষদের পরপর তিনটি সভায় অনুপস্থিত থাকেন; পরিষদ বা রাষ্ট্রের স্বার্থের হানিকর কোনো কার্যকলাপে যদি জড়িত থাকেন; অথবা যদি নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে আদালত কর্তৃক দণ্ডপ্রাপ্ত হন; অসদাচরণ, দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হলে অথবা পরিষদের কোনো অর্থ বা সম্পত্তির ক্ষতিসাধন বা আত্মসাতের বা অপপ্রয়োগের জন্য দায়ী হলে; দায়িত্ব পালন করতে অস্বীকার করেন অথবা শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণে দায়িত্ব পালনে যদি অক্ষম হন, তাহলে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে তাকে অপসারণ করতে পারে। তবে শর্ত থাকে যে, অপসারণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করিবার আগে বিধি নির্ধারিত পদ্ধতিতে তদন্ত করতে ও অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাতেও একই বিধান। 

যেভাবে আইন সংশোধন 

গত শুক্রবার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এক তথ্য বিবরণীতে জানানো হয়, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা ও উপজেলা পরিষদ (সংশোধন) আইনের অধ্যাদেশের খসড়া সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অনুমোদন করা হয়েছে। অধ্যাদেশের খসড়ায় বলা হয়েছেÑ বিশেষ পরিস্থিতিতে সরকার, অত্যাবশ্যক বিবেচনা করিলে, জনস্বার্থে কোনো সিটি করপোরেশন, পৌরসভা জেলা ও উপজেলার মেয়র, কাউন্সিলর এবং চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানদের অপসারণ করতে পারবে। জনগণকে নিরবচ্ছিন্ন সেবা দেওয়া নিশ্চিত করতে তাদের স্থলে নির্দিষ্ট সময় উল্লেখ করে প্ৰশাসনিক কার্যক্রম চলমান রাখা ও জরুরি কারণে, সময়ের প্রয়োজনে, জনস্বার্থে প্রশাসক নিয়োগ করা যাবে। 

যেসব মেয়র-চেয়ারম্যান আত্মগোপনে

জানা যায়, দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে ৯টির মেয়র আত্মগোপনে রয়েছেন। এসব সিটির কাউন্সিলরাও অনেকে পলাতক। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির শতাধিক কাউন্সিলর পলাতক। অন্য সিটি করপোরেশনেও প্রায় একই অবস্থা। ৬৪টি জেলা পরিষদের মধ্যে ৪৩টির চেয়ারম্যান আত্মগোপনে রয়েছেন। ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদের ৩২০টিতে উপজেলা চেয়ারম্যানরা গা ঢাকা দিয়েছেন। ৩৩০টি পৌরসভার মধ্যে ২০৩টির মেয়রও তাদের দপ্তরে অনুপস্থিত।

বিতর্কিত এবং একতরফা নির্বাচনে ওরা জনপ্রতিনিধি 

চলতি বছরেই উপজেলা পরিষদের ষষ্ঠ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো উপজেলার নির্বাচন বর্জন করে। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগও দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে বেশিরভাগ এলাকায় এ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় মূলত আওয়ামী লীগের নিজেদের মধ্যেই। দলের নিষেধ উপক্ষো করে মন্ত্রী-এমপিদের স্বজনরাও নির্বাচনে অংশ নেন। নির্বাচন কমিশনের ( ইসি) হিসাবে সবচেয়ে কম ৩৬ দশমিক ১৩ শতাংশ ভোটের রেকর্ড হয় এ নির্বাচনে। একক প্রার্থী হিসেবে বিনা ভোটেও অনেকে জনপ্রতিনিধি হন। ইসি এ নির্বাচনে কম ভোটার উপস্থিতির জন্য বিএনপির ভোট বর্জনকে অনেকাংশে দায়ী বলে মনে করে। 

গত ২১ মে দ্বিতীয় ধাপের ভোটগ্রহণ শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল সাংবাদিকদের বলেন, একটি বড় দল (বিএনপি) ভোটবর্জন ও ভোটদানে নিরুৎসাহিত করায় উপজেলা নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে আসছে না। এটা রাজনৈতিক সংকট। 

অন্যদিকে নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থার কারণেই ভোটারদের অনেকেই ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়েছে। গত ৪ জুন নাগরিক সংগঠন ‘সুজন’ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আমার মতে এ নির্বাচনটি হলো নাই-এর নির্বাচন। ভোটার নাই, বিরোধী দল নাই এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাও নাই। নির্বাচন যে নির্বাসনে চলে গেছে, এটা তারই প্রতিফলন। এর মূল কারণ হলো আস্থাহীনতা। অতীতের নির্বাচনগুলোর অভিজ্ঞতার ফলে মানুষ নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছে।’

গত ২৭ মে এ নির্বাচন নিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, জাতীয় নির্বাচনের মতো স্থানীয় পর্যায়েও রাজনৈতিকভাবে একদলীয় আধিপত্যের বিকেন্দ্রীকরণের পাশাপাশি ব্যবসায়ী স্বার্থ প্রাধান্য পাচ্ছে। জনপ্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে এখন জনস্বার্থের উপস্থিতি বিরল, আছে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ব্যক্তিস্বার্থ বিকাশের সুযোগ।’ 

এর আগে গত বছর অনুষ্ঠিত বিএনপি-বিহীন পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। ওই বছরের ১৯ জুলাই ‘সুজন’ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, পাঁচটি সিটিতে মেয়র পদে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে বলা কোনোভাবেই যৌক্তিক হবে না। এ নির্বাচনে মেয়র পদে ভোটারদের সামনে কোনো যথার্থ বিকল্প ছিল না। উপরন্তু বরিশালে সহিংসতার অভিযোগে ইসলামী আন্দোলনের সরে দাঁড়ানোর ফলে সিলেট ও রাজশাহী সিটির নির্বাচন অনেকটা অর্থহীন আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়।

ওই সংবাদ সম্মেলনে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সুজনের নির্বাহী সদস্য ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘চীন, রাশিয়ার মতো দেশগুলোতেও নির্বাচন হয়। তবে ওই দেশগুলোতে যুগের পর যুগ ধরে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীই নির্বাচিত হচ্ছে। ওই দেশগুলোর মতোই আমাদের এখানেও নির্বাচন নির্বাচন খেলা চলছে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা