প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০২৪ ২২:৫২ পিএম
আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০২৪ ২২:৫৫ পিএম
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে গুলিবিদ্ধ মরদেহের সারি। ছবি : সংগৃহীত
শেখ হাসিনা ভারতে চলে যাওয়ার পর সোমবার পুলিশ নৃশংস হামলার শিকার হয় রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকায়। শুধু ঢাকায় কমপক্ষে ৭৫ পুলিশের মরদেহ শনাক্ত করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন ডিআইজি পর্যায়ের এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। মঙ্গলবার (৬ আগস্ট) রাত সাড়ে ৯টায় এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত হাসপাতালগুলোতে মরদেহ যাচ্ছিল।
এদিকে পুলিশের বাইরেও ডিএমপি এলাকা, ঢাকা জেলা ও ঢাকার বাইরে ৮ জেলায় অন্তত ২৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে সোমবার (৫ আগস্ট) নিহত হয়েছেন ১৬৩। দুই দিনের হিসাব মিলিয়ে সারা দেশে অন্তত ৪০৯ জন নিহত হয়েছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকায় নিহতদের নাম-পরিচয় মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আশঙ্কা করা হচ্ছে, প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। সোমবার রাতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় থানা ও পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার সময় বিক্ষুব্ধ জনতার হাত থেকে বাঁচতে নির্বিচারে গুলি চালায় পুলিশ। এতে এসব হতাহতের ঘটনা ঘটে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ, মিটফোর্ড মেডিকেল কলেজ ও উত্তরার দুটি বেসরকারি হাসপাতালে নিহতের সংখ্যা পাওয়া গেলেও বিস্তারিত নাম-পরিচয় পাওয়া যায়নি।
সরকারের পদত্যাগের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এসব সহিংসতায় অনেককে কুপিয়ে বা পিটিয়ে হত্যার খবর পাওয়া গেছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাসাবাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এ সময় অনেক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সোমবার সকাল থেকে ঢাকা মার্চ কর্মসূচি ঘিরে মারমুখো অবস্থানে ছিল পুলিশ। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে আন্দোলনকারীদের রাস্তায় দেখামাত্র গুলির নির্দেশনা থাকায় অনেকটা বেপরোয়া ছিল পুলিশ। আন্দোলনকারীরা শান্তিপূর্ণভাবে সরকারের পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকলেও পুলিশ টিয়ার শেল, রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এরপর তাজা গুলি ছুড়তে থাকে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে। এতে বহু মানুষ হতাহত হয়।
পুলিশের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ডিএমপি ছাড়াও ঢাকা জেলার সাভার ও আশুলিয়ায় পুলিশের বিভিন্ন থানা এবং স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। বহু পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে, কুপিয়ে মারা হয়। মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত ৭৫ পুলিশের মরদেহ শনাক্ত করা হয়েছে। এখনও অনেক পুলিশ সদস্যের মরদেহ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে নিহত পুলিশ সদস্যদের মরদেহ রয়েছে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত থাকায় ভালোভাবে খোঁজখবর নেওয়া যাচ্ছে না। সারা দেশে পুলিশ চরমভাবে আক্রান্ত হয়েছে। মৃত্যুর সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ওই পুলিশ কর্মকর্তা আরও জানান, থানাগুলোতে হামলার সময় পুলিশ নিজেদের জীবন বাঁচাতে গুলি চালিয়েছে। এতে বহু মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়েছে। তবে কতজন মারা গেছে, সেই হিসাব পাওয়া সম্ভব হয়নি। মৃত্যুর সংখ্যা শতাধিক হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঢাকা মেডিকেল, মিটফোর্ড, অর্থোপেডিক ও উত্তরার দুই হাসপাতালে অন্তত ৯৩ মরদেহ
ঢাকার ৫টি হাসপাতালে সোমবার রাতে ও মঙ্গলবার ৯৩ জনের মরদেহ নেওয়া হয়েছে। ঢামেক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, দুপুর থেকে শুরু করে রাত ২টা পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০ জনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় নেওয়ার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মৃত ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া কয়েকশ ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ অবস্থায় গিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। রাতভর হাসপাতালে বিভিন্ন এলাকা থেকে গুলিবিদ্ধ ছাড়াও পিটিয়ে আহত করা বা কুপিয়ে জখম করা ব্যক্তিদের ঢাকা মেডিকেলে আনা হয়েছে। মঙ্গলবার সাভার থেকে বিজিবি সদস্য আব্দুল হালিম, সংসদ ভবন এলাকা থেকে পুলিশ কনস্টেবল মাহফুজকে ঢামেক হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকরা জানান, তারা আগেই মারা গেছেন। এ ছাড়া সুজন, বাপ্পী, সজল ও আশরাফুল নামে আরও চারজনের লাশ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (মিটফোর্ড) সূত্রে জানা গেছে, সোমবার দুপুর থেকে রাত ২টা পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকা থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ৩ শতাধিক আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা এসেছেন। এর মধ্যে ১৪ জনকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে। তাদের অধিকাংশের বয়স ২০ থেকে ২৫ বছর। এ ছাড়া আড়াইশর বেশি ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত অবস্থায় এসেছেন। তাদের শরীর থেকে গুলি বের করা হয়। গতকাল সকাল পর্যন্ত ১০ জন ভর্তি থাকলেও বাকিরা চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছেন।
বিভিন্ন জেলার চিত্র
সাভারে ৩৩ জনের মৃত্যু : সাভারে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে সোমবার সকাল থেকেই। বিক্ষুব্ধ জনতা সাভার মডেল থানা, উপজেলা পরিষদ, আশুলিয়া থানা ভাঙচুর করে। সহিংসতায় পুলিশসহ ৩৩ জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে ছয়জনকে পিটিয়ে মারা হয়েছে। সূত্র জানিয়েছে, এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ হয়ে ১৩ জন নারী ও শিশু হাসপাতালে তিনজন, গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে নয়জন, হাবিব ক্লিনিকে দুজনসহ মোট ২৭ জন মারা গেছে।
যশোরে ২৪ : যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদারের মালিকানাধীন জাবির ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে সোমবার আগুন লাগিয়ে দেওয়ার পর গতকাল পর্যন্ত ২৪ মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। কে বা কারা ওই হোটেলে আগুন লাগিয়েছে তা জানা যায়নি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা এ অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেছেন।
কুমিল্লায় দুই পুলিশসহ ৪ : কুমিল্লার তিতাস থানায় গণপিটুনিতে ২ পুলিশ নিহত হয়েছেন। গুলিসহ সহিংসতায় মারা গেছে ৪ জন। সব মিলিয়ে কুমিল্লায় সোমবার বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত ৬ জনের মৃত্যু হয়। গুলিবিদ্ধ হয়েছেন ৩০ জন। বিক্ষুব্ধ জনতা তিতাস থানা ঘেরাও করে। পরে সেনাবাহিনী আটকে পড়া পুলিশ সদস্যদের উদ্ধার করে। বিভিন্ন থানায় হামলার কথা জানান কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার আব্দুল মান্নান।
চুয়াডাঙ্গা ৪ : জেলা যুবলীগের সাবেক আহ্বায়ক আরেফিন আলম রঞ্জুর বাড়িতে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। আগুন লাগিয়ে দেওয়ার পর বাড়িতে থাকা চারজন পুড়ে মারা যান। এ ছাড়া চুয়াডাঙ্গা ১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সোলায়মান হক জোয়াদ্দার, তার ভাই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রিয়াজুল হক জোয়াদ্দারের বাড়ি, আওয়ামী লীগ নেতা সালাউদ্দিন ও লোটাসের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগের অফিসেও আগুন দেওয়া হয়। এ ছাড়া চুয়াডাঙ্গা ২ আসনের এমপি, জেলা ও উপজেলা চেয়ারম্যানসহ আওয়ামী লীগের বহু নেতার বাড়ি ভাঙচুর করে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়।
লালমনিরহাট ৫ : জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাখাওয়াত হোসেন সুমনের বাড়িতে আগুন দেওয়ার পর ওই বাড়ি থেকে ৫ শিক্ষার্থীসহ ৬ জনের পোড়া মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫ জনের মরদেহ শনাক্ত করা হয়েছে। নিহতরা সবাই শিক্ষার্থী। তারা কীভাবে ওই বাড়িতে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আগুন লাগিয়ে দেওয়ার পর ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা তল্লাশি করে ওই বাড়ি থেকে মরদেহ উদ্ধার করে।
ফেনীতে ১ : ফেনীতে মারপিটে কানা বাদশা (৪০) নামে এক যুবলীগ নেতা মারা গেছেন। মঙ্গলবার সকালে সদর উপজেলার বালিঘাও ইউনিয়নের বিবি বাজারের রাস্তা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার হয়। তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
নাটোর ৪ : নাটোর ১ আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম শিমুলের বাসভবনে আগুন দেওয়া হয়। সেখানে থেকে ৪ জনের দগ্ধ মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মঙ্গলবার সকালে এসব লাশ দেখতে পায় স্থানীয়রা। এর আগে সোমবার বিকালে ওই সাবেক সংসদ সদস্যের জান্নাতি প্যালেস নামের বাসভবনে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। এর আগে ভাঙচুর করা হয়।
লক্ষ্মীপুর ৩ : জেলার রামগঞ্জে গত দুই দিনে (সোম ও মঙ্গলবার) আওয়ামী লীগের ৮ নেতার কার্যালয়সহ ২০ কার্যালয়ে ভাঙচুর করা হয়েছে। সহিংসতায় এখন পর্যন্ত শিশুসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে সোমবার যুবলীগ নেতা নাছির ও মনির হোসেনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। একজন সাবেক এমপি আনোয়ার হোসেন খানের বাণিজ্যিক ভবনে আগুন দিলে লাফিয়ে পড়ে ১২ বছর বয়সি এক শিশু মারা গেছে।