অসহযোগ আন্দোলন
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৪ আগস্ট ২০২৪ ১৬:৫৩ পিএম
আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২৪ ০১:৩৬ এএম
রবিবার মুন্সীগঞ্জে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। প্রবা ফটো
কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন এখন ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। লাশ পড়েছে একের পর এক। রবিবার (৪ আগস্ট) রাত ১২টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কমপক্ষে ১০৪ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দেওয়া বিএনপি ও তাদের সমমনা রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। এর ফলেই বেড়েছে সংঘাত। দেশ এখন অতিক্রম করছে এক ক্রান্তিকাল।
রবিবার দিনভর সংঘর্ষ ও হামলায় নিহতদের মধ্যে রয়েছেন সিরাজগঞ্জে ১৩ পুলিশসহ মোট ২৭ জন, নরসিংদীতে ৬ জন, ফেনীতে ৮ জন, লক্ষ্মীপুরে ৮ জন, কিশোরগঞ্জে ৫ জন, রাজধানী ঢাকায় ১১ জন, বগুড়ায় ৪ জন, মুন্সীগঞ্জে ৩ জন, মাগুরায় ৪ জন, ভোলায় ৩ জন, রংপুরে ৪ জন, পাবনায় ৩ জন, সিলেটে ৫ জন, কুমিল্লায় পুলিশ সদস্যসহ ৩ জন, শেরপুরে ৩ জন, জয়পুরহাটে ২ জন, হবিগঞ্জে ১ জন, ঢাকার কেরানীগঞ্জে ১ জন, সাভারে ১ জন, কক্সবাজারে ১ জন ও বরিশালে ১ জন।
নিহতদের মধ্যে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী, শিক্ষক, ছাত্রদল, যুবদল নেতা এবং আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা রয়েছেন। বিভিন্ন স্থানে আন্দোলকারীদের হামলার শিকার হয়েছে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়, বর্তমান ও সাবেক এমপি, নেতাদের বাসভবন, থানা-পুলিশ এবং উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন স্থাপনা। অনেক স্থাপনায় আগুনও দেওয়া হয়েছে। রাজধানীতে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে হামলা চালানো হয়েছে। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে অ্যাম্বুলেন্সসহ অনেক যানবাহন।
আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে সর্বাত্মক অসহযোগের প্রথম দিন ছিলে গতকাল। সংঘাতময় পরিস্থিতিতে সারা দেশে আবার অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ ঘোষণা করেছে সরকার। রবিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে সেই কারফিউ বলবৎ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সোম থেকে বুধবার পর্যন্ত তিন দিন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। ব্যাংক এবং আদালতের কার্যক্রমও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। অসহযোগ আন্দোলনে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তাদের নতুন কর্মসূচি হিসেবে ‘ মার্চ টু ঢাকা’ ঘোষণা করেছে। প্রথমে এই কর্মসূচি মঙ্গলবার পালনের ঘোষণা দেওয়া হলেও পরে এক দিন এগিয়ে আগামীকাল সোমবার পালনের ডাক দেওয়া হয়েছে। তারা কারফিউ মানবে না বলেও ঘোষণা দিয়েছে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি হামলা হচ্ছে জানিয়ে এই হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ঘরে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো এক ‘বিজ্ঞপ্তিতে’ সরকারের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হয়েছে। রবিবার গণভবনে অনুষ্ঠিত নিরাপত্তাসংক্রান্ত জাতীয় কমিটির বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সন্ত্রাসীদের দমন করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এখন যারা রাজপথে নাশকতা করছে, তারা কেউই ছাত্র নয়, তারা সন্ত্রাসী। এই সন্ত্রাসীদের শক্ত হাতে দমন করার জন্য আমি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানাই।’
অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি মোকাবিলায় সারা দেশে জমায়েত কর্মসূচি ঘোষণা দিয়ে গতকাল মাঠে ছিল আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীরা। ফলে সারা দেশে আন্দোলনরতদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। অনেক স্থানে তাদেরকে সশস্ত্র অবস্থায় দেখা যায়। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে বিএনপি ও তার সহযোগী সংগঠনগুলো যোগ দিয়েছে। তাদের অনেকের হাতেও ছিল দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র। বিভিন্ন রাজনৈতিক, পেশাজীবী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীরাও রাজপথে ছিলেন। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে নিষিদ্ধঘোষিত জামায়াত-শিবিরও যোগ দিয়েছে বলে সরকারি দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর আলোচনার আহ্বান উপেক্ষা করে শনিবার সরকার পতনের এক দফা দাবিতে সর্বাত্মক অসহযোগের ডাক দেয় কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের প্ল্যাটফর্ম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।
এদিকে অসহযোগ আন্দোলনের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেট সেবা না পেয়ে আবারও বিপাকে পড়েছেন গ্রাহকরা। সেই সঙ্গে ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটেও সামাজিক যোগাযোগের এ দুটো মাধ্যমে ঢুকতে পারছে না ব্যবহারকারীরা।
অসহযোগ চলাকালে রাজধানীর সঙ্গে সারা দেশের সড়ক ও রেল যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন ছিল। বেশিরভাগ দোকানপাটই খোলেনি। শপিংমলগুলোর কোনো কোনোটি খুললেও সংঘাতময় পরিস্থিতিতে সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। সংঘাতপূর্ণ এলাকা ছাড়া রাজপথও ছিল ফাঁকা। গণপরিবহন চলেছে খুবই কম। রাস্তা ছিল রিকশার দখলে।
সারা দিন উত্তপ্ত রাজধানী
রবিবার সকাল থেকেই রাজধানী ছিল উত্তপ্ত। বিভিন্নস্থানে সংঘাত সংঘর্ষের ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেতা ও শিক্ষার্থীসহ ১১ জন নিহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। বেলা ১১টার পর রাজধানীর শাহবাগ, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, উত্তরা, রামপুরা, ধানমন্ডি, জনসন রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নিয়ে আন্দোলনকারীরা বিক্ষোভ শুরু করে। অপরদিকে, সকাল ১০টার পর থেকে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ, মিরপুর ১০ নম্বর, ধানমন্ডি, ফার্মগেট, আসাদ গেট মোড়, পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে কয়েক হাজার নেতাকর্মীকে অবস্থান করতে দেখা যায়। এদের মধ্যে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ছাত্রলীগসহ সহযোগী ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতাকর্মীরা ছিলেন। ফলে সারাদিনই রাজধানীজুড়ে ছিল উত্তেজনাকর পরিস্থিতি। বড় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে উত্তরায়। সেখানে ত্রিপক্ষীয় সংঘর্ষে কয়েকজনকে অচেতন অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। শাহবাগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পুরান ঢাকায় পোড়ানো হয় পুলিশের গাড়ি। ফলে গণপরিবহন চলাচল বন্ধ ছিল। রাজধানী থেকে দূরপাল্লার বাস ছেড়ে যায়নি। উত্তরা ও যাত্রাবাড়ীতে আন্দোলনকারীদের অবস্থানের কারণে ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
বাইরে উত্তেজনার মধ্যে প্রশাসনিক কার্যক্রম চলেছে সচিবালয়ে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও দর্শনার্থীর উপস্থিতি ছিল একেবারে কম। দুপুর ১২টার পর থেকে নিরাপত্তার জন্য সচিবালয়ের সবগুলো প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ওই সময়ে বাইরে গুলি, হাতবোমা বিস্ফোরণ ও সাউন্ড গ্রেনেড বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
১৪ পুলিশ নিহত
রবিবার রাজনৈতিক সংঘাতে সারা দেশে ১৪ জন পুলিশ নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি পুলিশের রেঞ্জ অফিস, পুলিশ সুপারের কার্যালয়, থানা ও ফাঁড়িসহ ২৭টি স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে গতকাল সন্ধ্যায় জানিয়েছেন পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের পুলিশ সুপার (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) ইনামুল হক সাগর।
সন্ত্রাসী হামলায় সিরাজগঞ্জ জেলার এনায়েতপুর থানার ১৩ পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। কুমিল্লার ইলিয়টগঞ্জ হাইওয়ে থানার এক পুলিশ সদস্যও সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়েছেন। এছাড়া আহত হয়েছেন প্রায় তিন শতাধিক।
পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের এক বার্তায় বলা হয়, ১৪ পুলিশ হত্যা ছাড়াও সন্ত্রাসীরা ডিএমপির যাত্রাবাড়ী ও খিলগাঁও থানা, টাঙ্গাইলের গোড়াই হাইওয়ে থানা, বগুড়ার সদর, দুপচাঁচিয়া ও শেরপুর থানা এবং নারুলী পুলিশ ফাঁড়ি, জয়পুরহাট সদর থানা, কুমিল্লার ইলিয়টগঞ্জ হাইওয়ে থানা, রংপুরের গঙ্গাচড়া, মিঠাপুকুর, পীরগাছা, পীরগঞ্জ ও বদরগঞ্জ; ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর ও আশুগঞ্জ থানা, সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর, উল্লাপাড়া ও শাহজাদপুর থানা, হবিগঞ্জের মাধবপুর ফাঁড়ি, ময়মনসিংহ রেঞ্জ অফিস, নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়, দিনাজপুর সদর থানা আক্রমণ করেছে। আহত পুলিশ সদস্য প্রায় তিন শতাধিক।
নরসিংদীতে গুলি, আওয়ামী লীগের ৬ জন নিহত
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের মাধবদী এলাকায় অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করেন আন্দোলনকারীরা। একই সময় উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মাধবদী এসপি ইনস্টিটিউটে জড়ো হতে থাকেন। একপর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের ধাওয়া দেন। সংঘর্ষের সময় বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি ছোড়া হয়। ধাওয়া খেয়ে আন্দোলনকারীরা প্রথমে সরে যান। কিন্তু পরে তারা আরও লোক নিয়ে এসে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ধাওয়া দেন। দীর্ঘক্ষণ ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়া ও সংঘর্ষের পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা পিছু হটেন। একপর্যায়ে আওয়ামী লীগের অন্যরা সরে যেতে পারলেও ছয়জন আটকা পড়েন। ঘটনাস্থলেই এক ইউপি চেয়ারম্যানসহ ৬ জনকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়। নিহতরা হলেনÑ সদর উপজেলার চরদিগলদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা দেলোয়ার হোসেন শাহীন (৪০), নরসিংদী সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেনের ছোট ভাই যুবলীগ নেতা দেলোয়ার হোসেন (৩৮), জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য শ্রমিক লীগ নেতা মনিরুজ্জামান ভূইয়া ওরফে নাতি মনির (৪২), শ্রমিক লীগ নেতা আনিছুর রহমান সোহেল (৪০), আওয়ামী লীগ নেতা কামাল হোসেন (৩৮) এবং মহিষাশুড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল জলিল (৪০)।
ফেনীতে নিহত ৫
ফেনীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অবস্থান কর্মসূচিতে হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে। দুপুর ২টা থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মহিপাল এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংঘর্ষ শুরু হয়। এতে পাঁচজন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন ফেনী সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ইশতিয়াক আহমেদ শ্রাবণ, শিহাব উদ্দিন ও ছাইদুল ইসলাম।
লক্ষ্মীপুরে গুলিবিদ্ধ হয়ে ৮ জনের মৃত্যু
লক্ষ্মীপুরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংঘর্ষ ও গোলাগুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে চারজন আওয়ামী লীগের কর্মী। এর মধ্যে রয়েছেন টুমচর ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও ইউপি মেম্বর হারুনুর রশীদ। অন্যজন হলেন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান টিপুর গাড়িচালক রাসেল। নিহত অন্যরা হলেনÑ আফনান পাটওয়ারী, কাউছার, সাব্বির ও মিরাজ। দুপুর ১২টার দিকে শহরের মাদাম ব্রিজ এলাকায় সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি একেএম সালাহ উদ্দিন টিপু আন্দোলনকারীদের গুলি করেন বলে অভিযোগ করা হয়। দুপুর ২টার দিকে তার শহরের তমিজ মার্কেট এলাকার বাসা ঘেরাও আন্দোলনকারীরা। এতে আন্দোলনকারীদের মধ্যে অনেকেই গুলিবিদ্ধ হয়। এক পর্যায়ে আন্দোলনকারীরা টিপুর বাসায় পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয়।
মাগুরায় শিক্ষার্থী-পুলিশ সংঘর্ষে নিহত ৪ জন
পারনান্দুয়ালী এলাকায় আন্দোলনকারীরা সমবেত হয়। বেলা ১১টায় পুলিশ ওই এলাকায় পৌঁছে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া দেয়। মুহূর্তের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে টিয়ার শেল ও কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এতে দুই শিক্ষার্থীসহ চারজন নিহত হয়েছেন।
নিহতরা হলেনÑ জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাব্বী (২৬), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদালয়ের শিক্ষার্থী শ্রীপুরের নাকোল ইউনিয়নের রায়নগর গ্রামের ফরহাদ হোসেন (২২), মহম্মদপুর আমিনুর রহমান ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আহাদ আলী বিশ্বাস (১৯) ও মহম্মদপুরের বালিদিয়া গ্রামের কানু মোল্যার ছেলে সুমন শেখ (১৭)।
বিক্ষোভকারীরা মহম্মদপুর উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বাসভবন, উপজেলা চেয়ারম্যানের বাসভবনে আগুন দেয় এবং ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। আগুন দেয় উপজেলা সদরের আওয়ামী লীগের অফিস, সদর ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিস, কৃষি অফিস, মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে।
বগুড়ায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীসহ নিহত ৪
বগুড়ায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে এক শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসহ ৪ জন নিহত এবং দুই শতাধিক আহত হয়েছেন। সকাল ১০টার দিকে যুবলীগের দুই শতাধিক নেতাকর্মী শহরের জিরো পয়েন্ট সাতমাথা এলাকায় অবস্থান নেন। এরপর বেলা ১১টার দিকে শহরে বিভিন্ন স্থান থেকে আন্দোলনকারীরা মিছিল নিয়ে শহরের জিরো পয়েন্ট সাতমাথার দিকে যাওয়া শুরু করলে পুলিশ বাধা দিলে সংঘর্ষ শুরু হয়। চলে বেলা ৩টা পর্যন্ত। নিহতদের মধ্যে রয়েছেনÑ কাহালু উপজেলার বীরকেদার এলাকার শামছুল হকের ছেলে কলেজছাত্র মনিরুল ইসলাম (২২), বগুড়ার গাবতলী উপজেলার গোড়দহ এলাকার মৃত মোনা সরদারের ছেলে জিল্লুর রহমান (৪৫) ও দিনাজপুরের হিলির আনিছুর রহমানের ছেলে, পেশায় শিক্ষক সেলিম (৪৫)।
সংঘর্ষ চলাকালে বগুড়া শহর, শেরপুর ও দুপচাঁচিয়ায় একাধিক সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনা, সরকারদলীয় সংসদ সদস্য রাগেবুল আহসান রিপুসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়ি-ঘরে হামলা এবং অগ্নিসংযোগ করা হয়। সকালে দুপচাঁচিয়ায় সংঘর্ষকালে আন্দোলনকারীরা থানা ভবনে হামলা চালায়। তখন পুলিশ গুলি চালায়। এতে কলেজ ছাত্র মনিরুল ইসলাম নিহত হন।
সিলেটে নিহত ৫, মুক্তিযোদ্ধা ভবন ভাঙচুর
পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংঘর্ষে গোলাপগঞ্জ পৌর শহরে গুলিবিদ্ধ হয়ে পাঁচজন নিহত হয়েছেন। দুপুর ১২টার দিকে গোলাপগঞ্জের ঢাকা দক্ষিণ ডিগ্রি কলেজের সামনে থেকে ছাত্র-জনতা জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। তাদের সরিয়ে দিতে পুলিশ ও বিজিবির সঙ্গে ছাত্র-জনতার তুমুল সংঘর্ষ শুরু হয়। নিহতদের মধ্যে রয়েছেনÑ নাজমুল ইসলাম (৩৫), ব্যবসায়ী তাজউদ্দিন (৪৩) ও সানি আহমদ (১৮)।
সিলেট শহরে আন্দোলনকারীদের ঠেকাতে পুলিশের সঙ্গে মাঠে নামে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। আন্দোলনকারীরা সিলেট আঞ্চলিক নির্বাচন অফিস, মুক্তিযোদ্ধা ভবন ও এমপি হাবিবের কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে আগুন লাগিয়ে দেয়। দায়িত্ব পালনকালে একাত্তর টিভির সিলেট প্রতিনিধি হোসাইন আহমদ সুজাদ ও ক্যামেরাম্যান তারেক আহমদ গুরুতর আহত হয়েছেন।
মুন্সীগঞ্জে সংঘর্ষে নিহত ৩
সকাল ১০টার দিকে শহরের থানারপুল এলাকায় অসহযোগ আন্দোলনের অংশ হিসেবে আন্দোলনকারীরা জড়ো হলে সেখানে আ.লীগ নেতাকর্মীদের এই নিয়ে সংঘর্ষ বেধে যায়। সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত চলে এই সংঘর্ষের ঘটনা। দীর্ঘ চেষ্টার পরে গোটা শহর নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় আওয়ামী লীগ ও পুলিশ। অগ্নিসংযোগ করা হয় জেলা বিএনপির কার্যালয়। নিহতরা হলেনÑ রিয়াজুল ফরাজী (৩৮), ডিপজল (২৫), ঢাকায় নেওয়ার পথে মো. সজল (১৯) নামে আরেক যুবক মারা যান। নিহত সকলের বাড়ি উত্তর ইসলামপুরে। এরা সকলেই বিএনপির কর্মী।
রংপুর রণক্ষেত্র, সিটি কাউন্সিলরসহ নিহত ৪
অসহযোগ আন্দোলনকারী ও আওয়ামী লীগের মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ইটপাটকেল, লাঠিসোটা, দেশীয় অস্ত্র, আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে প্রাণ ঝরেছে সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলরসহ চারজনের। আহত হয়েছেন শতাধিক। আধাঘণ্টার ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও সংঘর্ষে রাজপথ দখলে নেয় আন্দোলনকারীরা। পুড়িয়ে দেওয়া হয় আওয়ামী লীগ অফিস। মিঠাপুকুর, পীরগঞ্জ, বদরগঞ্জ উপজেলায় সরকারি ভবন, আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়, বর্তমান এমপি-সাবেক এমপির বাসভবনে আগুন দেওয়া হয়। তবে জেলা-উপজেলায় উত্তাপের মাঝে নিষ্ক্রিয় ছিল প্রশাসন। রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাউকে দেখা যায়নি।
ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনায় ঘটনাস্থলে নগরীর গুড়াতিপাড়ার মাহবুব আলমের ছেলে স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা খাইরুল ইসলাম সবুজ (২৮) ও মাসুম (৩০) নিহত হন। সংঘর্ষের মধ্যে জাহাজ কোম্পানী মোড়ে আন্দোলনকারীদের মাঝে পড়ে যান রংপুর সিটি করপোরেশনের ৪নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও পরশুরাম থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি হারাধন রায় হারা ও তার দেহরক্ষী ভাগ্নে শ্যামল। আন্দোলনকারীরা দুজনকেই লাঠিসোটা দিয়ে মাথাসহ সারা শরীরে আঘাত করে এবং দেশীয় অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে উল্লাস প্রকাশ করে।
কুমিল্লায় পুলিশসহ নিহত ৩ জন
দেবিদ্বার নিউ মার্কেট স্বাধীনতা চত্বরে অবস্থা নেয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ৫ শতাধিক নেতাকর্মী। স্বাধীনতা চত্বর থেকে কিছুটা দূরে অবস্থান নেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা। এ সময় দুই গ্রুপের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। এর মধ্যে গুলিবিদ্ধ হন আব্দুল রাজ্জাক রুবেল (২৬)।
এদিকে কুমিল্লার ইলিয়টগঞ্জ হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ি আক্রমণ করে আন্দোলনকারীরা। এ সময় পুলিশ সদস্যরা ছাদে উঠে যায়। কিন্তু কনস্টেবল এরশাদ আলী উঠতে পারেননি। তাকে পিটিয়ে হত্যা করে আন্দোলনকারীরা।
কিশোরগঞ্জে নিহত ৩ জন
কিশোরগঞ্জে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা সকাল থেকে রাস্তায় নেমে পড়ে। তাদের সঙ্গে সিংহভাগই বিএনপি জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী ও ক্যাডারদের নেতৃত্ব দিতে দেখা যায়। বেলা ১১টার দিকে তারা জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশফাকুল ইসলামের খরমপট্টির বাসায় হামলা চালায়। বাসা ভাঙচুরের পর আগুন দেয়। এ সময় হামলাকারীরার বাড়িতে থাকা দুটি প্রাইভেট কার পুড়িয়ে দেয়। পরে হামলাকারীরা বাসায় কর্মরত দুজনকে পিটিয়ে আহত ও অগ্নিদগ্ধ করে। গুরুতর আহত হন অঞ্জনা বেগম (৪২), আলম মিয়া (৫০)। এর আগে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে শহরের পুরান থানায় দুপক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ৫০ আহত হয়। এ ঘটনায় গুরুতর আহত কর্ষাকড়িয়াইল যুব লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোমিন মিয়া গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
পাবনায় গুলিতে নিহত ৩
পাবনা শহরে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের মিছিল থেকে আন্দোলনকারীদের ওপর চালানো গুলিতে তিনজন নিহত হয়েছে। দুপুরে শহরের এ হামিদ রোডের ট্রাফিক মোড়ে বিক্ষোভ চলাকালে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলো, মহিবুল, জাহিদ ও ফাহিম। শিক্ষার্থীরা যুবলীগের ওই নেতার অফিস ভাঙচুর করে। এ ছাড়া তারা শহরের বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর করে। আওয়ামী লীগ নেতা সাঈদ চেয়ারম্যানের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। এ আগুন একটি ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একটি টিম ঘটনাস্থলে এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
বরিশালে দিনভর তান্ডব, নিহত ১
বেলা ১১টা থেকে বরিশাল নগরীতে তাণ্ডব শুরু করা হয়। আওয়ামী লীগের নেতা মো. টুটুল চৌধুরীকে (৬০) পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। নিহত টুটুল চৌধুরী নগরের ১২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ছিলেন।
আশুলিয়ায় নিহত ১ :ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে এক তরুণের মৃত্যু হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। নিহতের নাম-পরিচয় জানা যায়নি। তার বয়স আনুমানিক ৩০ বছর। গুলিবিদ্ধ অপরজনের নাম বিপ্লব। তিনি বাইপাইল এলাকায় সড়কের পাশে পানি বিক্রি করেন। তার বয়স আনুমানিক ৪০ বছর।
জয়পুরহাটে ১ জন নিহত : আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে জেলা শহর। সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে বিশাল সরকার (১৮) নামের একজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আর আহত হয়েছেন শতাধিক।
ভোলায় ব্যবসায়ী নিহত : সহিংসতার ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মো. জসিম উদ্দিন (৪৫) নামে এক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন। তিনি ছাতা ব্যবসায়ী। দুপুরের দিকে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।
হবিগঞ্জে ১ জন নিহত : হবিগঞ্জে বিএনপি-জামায়াত ও আওয়ামী লীগ কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে একজন নিহত হয়েছেন। তার নাম রিপন শীল। এ ছাড়া আওয়া মীলীগ সভাপতি ও সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. আবু জাহিরের বাড়িতে হামলার ঘটনার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি মারা যান। এদিকে সাবেক এমপি অ্যাডভোকটে আব্দুল মজিদ খানের বাসভবনে আগুন দেয় আন্দোলনকারীরা।