সাক্ষাৎকার : নাসির উদ্দীন ইউসুফ
সিরাজুল ইসলাম আবেদ
প্রকাশ : ০৪ আগস্ট ২০২৪ ০৯:২৭ এএম
নাসির উদ্দীন ইউসুফ
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেছেন, ‘বিলম্বে হলেও জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ হওয়ায় সরকারকে সাধুবাদ জানাব। তবে এই সমস্যা সমাজের নানা স্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু একটি নির্বাহী আদেশে সব চুকেবুকে যাবে- বিষয়টা এত সহজ নয়। দীর্ঘদিনে সমাজের নানা স্তরে এরা ছড়িয়ে পড়েছে। এ সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হলেও সরকারকে কাজটি করতে হবে।’
প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের জন্য কোনো কোটার প্রয়োজন নেই মন্তব্য করে কোটা সংস্কার আন্দোলন সম্পর্কে বলেন, সরকার বা রাজনীতিবিদরা নতুন প্রজন্মের ভাষা বুঝতে পারছেন না। তাদের সঙ্গে অনেক আগেই ডায়ালগ করা উচিত ছিল, যোগাযোগ রাখা উচিত ছিল। যা করা হয়নি। আলোচনার মধ্য দিয়েই এ সমস্যার সমাধান করতে হবে। বাইরের শক্তি বা পুলিশি শক্তি দিয়ে এর সমাধান হবে না।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ : অবশেষে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত জামায়াত-শিবির সরকারের নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ হলো। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আপনার অনুভূতি জানতে চাই।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ : বিলম্বে হলেও সরকার জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তটা নিয়েছে, তার জন্য প্রথমেই সরকারকে ধন্যবাদ জানাব। এটা দীর্ঘদিনের দাবি ছিল আমাদের- গণআদালতের মধ্য দিয়ে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের উত্থাপিত। তারও আগে রাজপথের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল এটি। গণজাগরণ মঞ্চেও একই কথা ছিলÑ শুধু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করলে হবে না, যুদ্ধাপরাধী সংগঠন হিসেবে জামায়াতকে চিহ্নিত করে নিষিদ্ধ করতে হবে। সেটি এখন যখন ঘটেছে, তাকে সাধুবাদ জানাচ্ছি।
প্রবা : জামায়াত নিষিদ্ধ হলো কিন্তু তাদের মতাদর্শীরা তো রয়েই যাচ্ছে, সে ক্ষেত্রে সামাজিকভাবে একে কি সমাধান মনে করছেন?
নাসির উদ্দীন ইউসুফ : এত বছরে জামায়াত তার একটা অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে তারা একটি শক্তি। তাদের ছোট-বড় নানা প্রতিষ্ঠান আছে। তাদের নিজস্ব শিক্ষাকার্যক্রম ও পদ্ধতি আছে, যেখান থেকে তারা তাদের ছাত্রদের নানাভাবে প্রভাবিত করতে পারে। সেই সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিষয়েও তাদের সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি আছে। সামাজিক ক্ষেত্রে, নারী সংগঠন থেকে শুরু করে দৃশ্যমান ও অদৃশ্য এমন অনেক সংগঠন আছে যেগুলো সমাজ নিয়ন্ত্রণ করে। সুতরাং আমি মনে করি, শুধু রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ করার মধ্য দিয়ে ব্যাপারটার সমাধান হবে না। তাদের রাজনৈতিক ব্যাপারটা যদি সহনীয় পর্যায়ে আনতে হয়, তবে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আর্থিক, শিক্ষাÑ সকল পর্যায়ে তাদের উপস্থিতি আমাদের আগে নির্দিষ্ট করতে হবে, তারপর সরকারকে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তা না হলে কোনো সুফল আসবে না।
প্রবা : ১৫ বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি দেশ পরিচালনায়। আমাদের নতুন প্রজন্মকে যে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল বা ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল, তা কি আমরা করতে পেরেছি বলে মনে করেন?
নাসির উদ্দীন ইউসুফ : অবশ্যই আমরা পারিনি এবং ব্যর্থ হয়েছি। বর্তমান সরকার দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকলেও এ বিষয়গুলো আমলে নেয়নি। একটা কথা আছে, ‘তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে’। আমরা ধরেই নিয়েছি এদের কোনো অস্তিত্ব নেই। কিন্তু এখন আমরা বেশ ভালোভাবেই তাদের দেখতে পাচ্ছি এবং এ বিষয়টা বেশ বড় আকার ধারণ করেছে। আমি জানি না সরকার কী করে এদের নিয়ন্ত্রণ করবে বা এ সমস্যার সমাধান করবে।
রাজনৈতিকভাবে শুধু দমনপীড়ন দিয়ে কিন্তু সমস্যার সমাধান হবে না। নানা রকম ডায়ালগেরও তো দরকার আছে। ধর্ম খারাপ না, ধর্ম মানুষকে শুদ্ধ করার জন্য এসেছে। সেই ধর্মের নানা রীতিনীতি, নির্দেশকে যারা ভুলভাবে, ভিন্নভাবে প্রয়োগ করে, নারীকে নির্যাতন করে, সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে, রাজনীতি করে আমাদের আন্দোলন তাদের বিরুদ্ধে। ধর্মপ্রাণ মানুষকে দিয়ে জঙ্গি ইসলামী রাষ্ট্র তৈরির প্রকল্প যে বাংলাদেশে বিদ্যমান, এটা গত কয়েক বছরে প্রতীয়মান হয়েছে। সুতরাং এ বিষয়টি মাথায় রেখে আমাদের এবং সরকারকে এগোতে হবে। শুধু একটি নির্বাহী আদেশে সব চুকেবুকে যাবেÑ বিষয়টা এত সহজ নয়। সমাজের নানা স্তরে সমস্যাটি ছড়িয়ে আছে। এ পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণে আনা বেশ একটা কঠিন কাজ। তবু সরকারকে করতে হবে।
প্রবা : জামায়াত নিষিদ্ধ হলো এমন এক সময়ে যখন সারা দেশে শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এখনও রাজপথে। শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কারের দাবির এ আন্দোলনে এত রক্তপাত, প্রাণহানি... সরকার এবং সরকারি দলের দায় কতটুকু?
নাসির উদ্দীন ইউসুফ : এই যে এত এত শিক্ষার্থী মারা গেছে, সাধারণ মানুষ মারা গেছেÑ এটা অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ; এটার তদন্ত করে বিচার হওয়া উচিত। আর মুক্তিযোদ্ধাদের ৩০ ভাগ কোটা দেওয়ার প্রয়োজন ছিল বলে আমি মনে করি না। ২০১৮ সালেই আমি এ আন্দোলনের সঙ্গে ঐকমত্য প্রদর্শন করেছিলাম। বলেছিলাম, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এ কোটা রাখবেন না। কিন্তু সেদিন আমাদের কথা কেউ শোনেনি।
মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা কেন লাগবে? সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে রায়ের ওপর ভিত্তি করে যে নির্বাহী আদেশ এখন হলো, এটাও আমার কাছে হাস্যকর। কারণ যে শহীদদের সন্তানের জন্য কোটা, সেই শহীদদের সন্তানের বয়স এখন কমপক্ষে ৫৩ বছর। তার চাকরির বয়স তো অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে, তার জন্য কী করে কোটা প্রযোজ্য হবে? বীরাঙ্গনাদের ছেলেমেয়েদের বয়সও ৪০-এর ওপর। মুক্তিযোদ্ধাদের ছেলেমেয়েদের বয়স কম করে হলেও ৩৫ বছর। তাহলে কার জন্য এ কোটা দেওয়া হলো, বুঝলাম না!
প্রবা : বেশ কিছুদিন ধরেই প্রজন্ম নেটকেন্দ্রিক, ফেসবুককেন্দ্রিক, আত্মকেন্দ্রিক ইত্যাদি বলে এক ধরনের হতাশা ব্যক্ত করা হচ্ছিল। সেই প্রজন্মই যৌক্তিক দাবিতে এত বড় একটি আন্দোলন গড়ে তুলল। তাহলে কি প্রজন্মকে পড়তে আমরা কোথাও ভুল করছি?
নাসির উদ্দীন ইউসুফ : আমি এ কথাটা কয়েক দিন ধরেই বলে আসছি। আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের কথা বাদ দিলাম, সরকার বা রাজনীতিবিদরা কোনো অবস্থায়ই নতুন প্রজন্মের ভাষা বুঝতে পারছেন না। তাদের সঙ্গে অনেক আগেই ডায়ালগ করা উচিত ছিল, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা উচিত ছিল। এখন আর তো অ্যানালগ সিস্টেম নেই। নতুন প্রজন্মের জন্য আকাশ এখন হাতের মুঠোয়। নানা রকম পরিবর্তন ঘটছে। সে পরিবর্তনগুলো পরিবার যেমন দেখবে, সমাজ দেখবে, রাষ্ট্র এবং সরকারেরও তেমন দেখার প্রয়োজন আছে। আমরা সেটা দেখিনি। এ আন্দোলনে ছাত্ররা কোনো সন্ত্রাস করছে না আমরা বলছি এবং আমি সেটা বিশ্বাসও করি। কিন্তু তাদের মধ্যে এই যে সন্ত্রাসীরা ঢুকল, কেমন করে তা ঢুকল? সেটা তো সরকারকে বলতে হবে। তদন্ত করতে হবে। কারা ঢুকেছে পরিষ্কার করতে হবে। তারপর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রবা : সুষ্ঠু সমাধানে এ মুহূর্তে সরকারের করণীয় কী?
নাসির উদ্দীন ইউসুফ : সরকার দাবি মেনে নিয়েছে ঠিক, কিন্তু এই যে হত্যাকাণ্ড ঘটল, তার তো সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিচার করতে হবে। ছাত্ররা যে ৯ দফা দাবি সামনে রেখে আন্দোলনে আছেÑ সেটা নিয়েও ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনা করা দরকার। আলোচনার মধ্য দিয়েই এ সমস্যার সমাধান করতে হবে। বাইরের শক্তি বা পুলিশি শক্তি দিয়ে এর সমাধান হবে না। পুলিশি শক্তি সুনির্দিষ্ট সন্ত্রাসীদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু গণহারে গ্রেপ্তার সমর্থনযোগ্য নয়।