গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্প
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০২৪ ১৫:১৩ পিএম
গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্প। ছবি : সংগৃহীত
খুলনা বিভাগের চার জেলার ১ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে পানি সরবরাহ করছে গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প। এ প্রকল্পের ৪৯টি শাখা খালের মাধ্যমে সেচের পানি দেওয়া হচ্ছে। তবে বর্তমানে ২০টি শাখা খালের ডাইক সম্পূর্ণ নষ্ট এবং ২৯টির ডাইক আংশিক নষ্ট। এ ছাড়া ৪৪টি উপশাখা খালের মধ্যে ২০৮টিই পলি দিয়ে ভরাট হয়ে গেছে। ফলে সেচের পানি না পাওয়ায় বিঘ্ন হচ্ছে চাষাবাদ।
এই সমস্যা সমাধানে গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন শিরোনামে একটি প্রকল্প নিয়েছে সরকার। এটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো)। প্রকল্পটিতে ব্যয় হবে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে এ প্রকল্প প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে।
উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) বলা হয়েছে, খুলনা বিভাগের চার জেলা কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মাগুরা ও ঝিনাইদহের ১৩টি উপজেলাকে সেচের আওতায় আনতে ১৯৫৪ সালে হাতে নেওয়া হয় জিকে সেচ প্রকল্প। এর অধীন উপজেলাগুলো হলোÑ কুষ্টিয়ার কুষ্টিয়া সদর, কুমারখালী, খোকসা, মিরপুর, ভেড়ামারা ও দৌলতপুর; চুয়াডাঙ্গার চুয়াডাঙ্গা সদর ও আলমডাঙ্গা; ঝিনাইদহের ঝিনাইদহ সদর, হরিণাকুণ্ড ও শৈলকূপা এবং মাগুরার মাগুরা সদর ও শ্রীপুর।
কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে ১৯৫৫-৫৬ সালে শুরু হয়ে জিকে প্রকল্পের প্রথম পর্যায় শেষ হয় ১৯৬৯-৭০ সালে। প্রকল্পের আওতায় আসে প্রধান তিনটি খাল, ৪৯টি শাখা খাল ও ৪৪৪টি উপশাখা খাল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জিকে সেচ প্রকল্পেও নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে, যা অতিক্রম করে একে পূর্ণ সক্ষম করে তুলতেই পুনর্বাসন প্রকল্পটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় ১৯৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের তিনটি প্রধান খাল, ৪৬৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ৪৯টি সেকেন্ডারি খাল বা শাখা খাল ও ৯৯৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ৪৪৪টি টারশিয়ারি খাল তথা উপশাখা খাল রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪ মিটার নিচে চলে গেলে প্রকল্পের প্রধান পাম্প কাজ করে না। তখন সাবসিডিয়ারি পাম্প ব্যবহার করা হয়।
প্রকল্প গ্রহণের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ৪৯টি শাখা খালের মধ্যে ২০টির ডাইক সম্পূর্ণ নষ্ট হওয়ায় সেগুলো দিয়ে সেচ দেওয়া যাচ্ছে না। বাকি ২৯টির ডাইক আংশিক নষ্ট। ফলে সেগুলোর সেচ সরবরাহ সক্ষমতা কমে গেছে। অন্যদিকে ৪৪৪টি উপশাখা খালের মধ্যে ২০৮টিই পলি দিয়ে ভরাট হয়ে গেছে। বাকিগুলোর ডাইক নষ্ট হয়েছে। ফলে উপশাখা খালগুলো দিয়েও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সেচ দেওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্পের প্রধান তিনটি পাম্পের মধ্যে দুটিই অচল হয়ে গেছে। অন্য একটি পাম্পও কোনোমতে সচল রাখা হয়েছে মেরামত করে করে। অন্যদিকে ২০০৪-০৫ সালে নষ্ট হয়ে গেছে সাবসিডিয়ারি পাম্পগুলো। সেগুলো আর মেরামতযোগ্যও নেই। সব মিলিয়ে জিকে সেচ প্রকল্পের বর্তমান সেচযোগ্য এলাকা কমে দাঁড়িয়েছে ৯৫ হাজার ৬১৬ হেক্টরে। আবার প্রকল্পটির সক্ষমতা কমে যাওয়ায় ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫১ হাজার ৫৫৫ হেক্টর, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪০ হাজার ৭৭০ হেক্টর ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে মাত্র ৩৯ হাজার ৮২৯ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
প্রকল্পের প্রধান প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে, কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার জিকে সাবসিডিয়ারি পাম্প হাউস নির্মাণের পাশাপাশি পাম্প হাউসের উৎসমুখ থেকে প্রধান সংযোগ খাল পুনঃখননের প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া ভেড়ামারা উপজেলার প্রধান সড়ক থেকে সাবসিডিয়ারি পাম্প হাউস পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজও রয়েছে।
জিকে সেচ প্রকল্পে বর্তমানে যে তিনটি প্রধান সেচখাল রয়েছে, সেগুলো পুনরাকৃতিকরণের (জিএমসি, কেএমসি ও এএমসি) প্রস্তাব রয়েছে। প্রকল্পের সেকেন্ডারি ও টারশিয়ারি সেচখাল পুনরাকৃতিকরণের কাজ হবে। প্রকল্পের পানি নিষ্কাশন খালও পুনঃখনন করা হবে। বাপাউবো বলছে, সব খাল পুনঃখনন করা হলে সেচযোগ্য এলাকা আগের পরিমাণে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
এর বাইরে জিকে পাম্প স্টেশনের জন্য সিসিটিভি সিস্টেম, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, হাউস ওয়্যারিং সিস্টেম, আলোকায়ন ও প্রধান পণ্যাগারের স্বয়ংক্রিয় মজুদ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব রয়েছে পুনর্বাসন প্রকল্পে। রয়েছে জিকে পাম্প স্টেশনের ৫ দশমিক ৫ কেভি ওভারহেড ট্রান্সমিশন লাইন ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশ সরবরাহসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজ। বাপাউবো বলছে, জিকে সেচ প্রকল্পকে আধুনিক সেচ প্রকল্প হিসেবেই এসব অঙ্গ রাখা হয়েছে পুনর্বাসন প্রস্তাবনায়।
সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে এ প্রকল্প প্রস্তাবের ওপর মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) আবদুল বাকী।
আবদুল বাকী বলেন, জিকে সেচ প্রকল্পটি ওই অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু খাল ভরাট হওয়া, পাম্প নষ্ট হওয়ার মতো বিভিন্ন কারণে প্রকল্পটি আগের মতো কার্যকর নেই। নতুন করে খাল খননসহ অন্যান্য কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা গেলে আবার জিকে সেচ প্রকল্পটি সবার কাজে লাগবে। সে কারণে পিইসি সভার পর বেশ কিছু সুপারিশ দেওয়া হয়েছে। এগুলো প্রতিপালন করে সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে এলে অনুমোদনের পরবর্তী ধাপের প্রক্রিয়া শুরু হবে।