জন্মোৎসব
ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০২৪ ০৯:২৮ এএম
আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৪ ১১:১৪ এএম
শতবর্ষে ভাষাসংগ্রামী সাবির আহমেদ চৌধুরী। ছবি : সংগৃহীত
‘আকাশ আমার ঘরের ছাউনি/ পৃথিবী আমার ঘর,/ সারা দুনিয়ার সকল মানুষ/কেউ নয় মোর পর।/ করি না বিচার জাতি ধর্মের/ কোনো ভেদাভেদ ভাষা বর্ণের,/ সবাই মানুষ এই পরিচয়/হৃদয়ে নিরন্তর’Ñ এমন পঙ্ক্তিমালার মধ্য দিয়ে বিশ্বভ্রাতৃত্বের জয়গান গেয়েছেন যে মানুষটি, তিনি আজ পা রাখলেন শতবর্ষে। চিরসংগ্রামী ও মানবতাবাদী এই ভাষাসংগ্রামী সাবির আহমেদ চৌধুরী ১৯২৪ সালের এই দিনে জন্ম নেন নরসিংদী জেলার বেলাব উপজেলার হাড়িসাংগান গ্রামে। তার মা আসিয়া খাতুন, পিতা হানিফ মোহাম্মদ।
সাবির আহমেদ চৌধুরী চিরকালই একজন মুক্তিযোদ্ধা। এমনটিই মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকসহ আরও অনেকেই। কারণ সাবির আহমেদ ভাষা আন্দোলনে যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তেমনি মহান মুক্তিযুদ্ধেও অংশ নিয়েছেন। তেমনি এই প্রবীণ বয়সেও কাজ করে চলেছেন দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সাধারণ মানুষের কল্যাণে।
শতবর্ষে পা রাখা এই ভাষাসংগ্রামী বর্তমানে বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত। সময় কাটে নিজের বাসাতেই। তার স্ত্রী নার্গিস চৌধুরী জানিয়েছেন, ২০২২ সালে সাবির আহমেদ চৌধুরী প্রথম ব্রেন স্ট্রোক করেন। দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিতে হয় তাকে। চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি আবার হার্ট অ্যাটাক হলে স্কয়ার হাসপাতালে ডা. ফজলে রাব্বীর অধীনে চিকিৎসা নেন তিনি। গত মার্চ মাস থেকে নিজের বাসায় থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। কারণ বর্তমানে আর হাঁটাচলা করতে পারেন না। নার্গিস চৌধুরী বলেন, আমরা দেশবাসীর কাছে তার জন্য দোয়া চাই। আজ তার ধানমন্ডির বাসায় পারিবারিকভাবে জন্মদিন পালন করা হবে বলেও জানান তিনি।
১৯৪৭ সালে আহসানউল্লা ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল অ্যান্ড কলেজ (বর্তমান বুয়েট) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা কোর্স সমাপ্ত করেন সাবির আহমেদ চৌধুরী। এর পর তিনি ১৯৪৮ সালে সিঅ্যান্ডবি বিভাগে কর্মজীবন শুরু করেন উপসহকারী প্রকৌশলী হিসেবে। ১৯৫৪ সালে তিনি সরকারি চাকরি ছেড়ে ‘সাবির আহমেদ চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠা করে ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করেন। তিনি ভাষা আন্দোলনের সূচনালগ্ন ১৯৪৮ সাল থেকেই সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের যে সমাবেশ থেকে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন, সাবির আহমেদও সেই সমাবেশে ছিলেন এবং অন্য ছাত্রদের পাশাপাশি তিনিও এর প্রতিবাদ করেন। ১৯৫৫ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তিনি দৈনিক ইত্তেহাদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তিনি সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত মাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘জলসিঁড়ি’র সম্পাদক ছিলেন তিনি।
ঢাকার শান্তিনগরে হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গড়ে ওঠা ‘বাহার মেমোরিয়াল কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন সাবির আহমেদ চৌধুরী। রাজধানীতে ধানমন্ডি গার্লস স্কুল, নজরুল একাডেমি, বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন এবং অর্থায়নও করেন। নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও অর্থায়ন করেন তিনি।
মরমী কবি ও গীতিকার হিসেবে সুপরিচিত, ২২টি গ্রন্থের রচয়িতা সাবির আহমেদ চৌধুরীর জীবনকর্ম, দর্শন ও সাহিত্য সাধনা নিয়ে ইতোমধ্যে তিনজন গবেষক রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি-লিট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমফিল এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
বিশিষ্ট ব্যক্তিদের চোখে
নবীনপ্রজন্মের বাতিঘর সাবির আহমেদ চৌধুরীর মতো মানুষ আমাদের সমাজে সব সময় প্রয়োজন বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। তিনি বলেন, এই ভাষাসংগ্রামীর শততম জন্মবার্ষিকীতে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। তার মতো জ্যোতির্ময় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ আমাদের সমাজে সব সময় প্রয়োজন।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর অনুসারী সাবির আহমেদ চৌধুরী তার দর্শনকে ধারণ ও লালন করে এগিয়ে যাচ্ছেন বলে মনে করেন আরেফিন সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ‘তার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হলে তিনি মূলত বাংলাদেশেরই কথা বলেন, বলেন স্বাধীনতার কথা। দেশপ্রেমিক এই মানুষটি যখন বিদেশে যান, তখনও সেখানে অবস্থানরত বাঙালি ও অন্যান্য জাতিসত্তাসমূহের মধ্যে সম্মিলন ঘটানোর ব্যাপারে ভাবেন, কথা বলেন ও কাজ করেন। তাঁর দীর্ঘায়ু প্রত্যাশা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা পরিচালক ও সাবির আহমেদের ভাতিজা ড. মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান বলেন, ‘তিনি হাড়িসাংগান গ্রামে কবি কুটির নামে প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। যার পুরো জমি আমার পিতা কবি মফিজ উদ্দিন আহমেদ ও সাবির আহমেদ চৌধুরী দিয়েছেন। এর অবকাঠামো তৈরির অর্থায়নও তিনি করেছেন। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও পিছিয়ে পড়া, মেধাবী শিক্ষার্থীদের তিনি আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছেন। তার সহযোগিতায় নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।