সমবায় অধিদপ্তরে নিয়োগ পরীক্ষা
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৪ ১৪:৩২ পিএম
ফাইল ফটো
সমবায় অধিদপ্তরে ৫১১টি পদে নিয়োগ বাণিজ্যের ঘটনায় জড়িতরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। অথচ তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে এই নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের সত্যতা পাওয়া যায়। যার পরিপ্রেক্ষিতে কমিটি নিয়োগ বাতিলের পাশাপাশি নতুন করে পরীক্ষা নেওয়ার সুপারিশ করে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সেই নিয়োগ বাতিল করা হয়। সম্প্রতি নিয়োগ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে এসব পদে নতুন করে পরীক্ষা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রণালয়।
প্রসঙ্গত, সমবায় অধিদপ্তরে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ৫১১ পদে কর্মচারী নিয়োগ পরীক্ষায় অর্থ বাণিজ্য, নম্বর জালিয়াতি, পরীক্ষার খাতায় লেখা টেম্পারিংসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ভুক্তভোগীরা ঘটনার সঙ্গে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের তৎকালীন নিয়োগ কমিটির কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সংসদীয় কমিটির কাছে অভিযোগ করেন তারা। বিভিন্ন গণমাধ্যমেও এ-সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশ হয়। এমন প্রেক্ষাপটে অনিয়ম তদন্তে মন্ত্রণালয় থেকে একটি কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত শেষে এই কমিটি নিয়োগ বাতিলের পাশাপাশি নতুনভাবে পরীক্ষা নেওয়ার সুপারিশ করে। কিন্তু তারা তৎকালীন নিয়োগ কমিটির সভাপতি, সদস্য সচিবসহ অন্য সদস্যদের বিষয়ে কোনো সুপারিশ না করায় নেপথ্য নায়করা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরেই।
সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত ৫ জুন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। সেই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, তদন্ত কমিটির মতামত বিবেচনায় নিয়ে পূর্বের পরীক্ষার ফল বাতিল করে জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে নতুনভাবে এমসিকিউ পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়ার আদেশ দেওয়া হলো। পরে গত ৩ জুলাই মন্ত্রণালয়ের আরেক পত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করে নতুন নিয়োগ পরীক্ষার বিষয়ে অগ্রগতি জানতে চাওয়া হয়।
সমবায় অধিদপ্তরের ৫১১ পদে কর্মচারী নিয়োগে অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। আবেদনই করেননি এমন প্রায় ১০০ জনের নাম ছিল উত্তীর্ণদের তালিকায়। তাদের নাম ও ইউজার আইডি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে জমা দেওয়া হয়। টেলিটকের মাধ্যমে আবেদনের তালিকার ভিত্তিতে হাজিরা শিট তৈরি না করে পরীক্ষার্থীর তথ্য টেম্পারিং করে জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়। এমনকি কোনো কোনো পদে ছেলেকে মেয়ে বা মেয়েকে ছেলে বানিয়ে উত্তীর্ণ করা হয়। একই রোল নম্বরের অধীনে একাধিক পরীক্ষার্থী পাওয়া যায়। আবার ওইসব প্রার্থীর টেলিটক ইউজার আইডিও ভিন্ন ভিন্ন দেখা যায়। ত্রুটিপূর্ণ এ নিয়োগ পরীক্ষার কারণে সরকারের প্রায় ৪ কোটি টাকা অপচয় হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, পরীক্ষার্থীদের খাতা মূল্যায়নের জন্য কালো তালিকাভুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানকে কোনো চুক্তি ছাড়াই ওএমআর শিট সরবরাহ ও মূল্যায়নের দায়িত্ব দেয় নিয়োগ কমিটি। উত্তরপত্র মূল্যায়নের সময় বিভিন্ন ব্যক্তি গোপন কক্ষে ঢুকে উত্তরপত্রের নম্বর জালিয়াতি এবং অনুত্তীর্ণ, অযোগ্য প্রার্থীদের রোল ফলাফল শিটে অন্তর্ভুক্ত করে। যেখানে এমসিকিউ পরীক্ষার ফল পরীক্ষার পরদিনই দেওয়া যায়, সেখানে দুই সপ্তাহের বেশি সময় পর ফল প্রকাশ করা হয়। তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনে জানায়, দেরিতে ফল প্রকাশের কারণে নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়। দেরিতে ফল প্রকাশ সমীচীন হয়নি উল্লেখ করলেও এর জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেনি কমিটি।
ভুক্তভোগীরা নিয়োগ দুর্নীতিতে জড়িতদের নাম ও তথ্য-প্রমাণসহ অভিযোগ সংসদীয় কমিটিতে জমা দেয়। তদন্ত কমিটি ছয়টি অভিযোগের মধ্যে তিনটির সত্যতা পায়। তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সঠিকভাবে তদন্ত হয়নি। সঠিকভাবে তদন্ত হলে সব অভিযোগ প্রমাণ হবে বলে মনে করছেন তারা।
জানা গেছে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী সমবায় অধিদপ্তরের নিয়োগ কমিটির সভাপতি হওয়ার কথা সমবায় মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত নিবন্ধকের (প্রশাসন, মাসউ ও ফিন্যান্স)। কিন্তু সে সময় এই পদে কেউ কর্মরত ছিলেন না। এ কারণে নিয়োগ বাণিজ্যের সুযোগ নিতে এ পদে কাউকে পদায়ন না করে তৎকালীন যুগ্মনিবন্ধক হাফিজুল হায়দার চৌধুরীকে (বর্তমানে অতিরিক্ত নিবন্ধক) অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। যদিও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কাউকে ঊর্ধ্বতন পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া যায় না।
এক মাসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনা থাকলেও তদন্ত দল তা করেনি। উপসচিব ড. অশোক কুমার বিশ্বাসের নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রণালয়ের পৃথক তদন্ত কমিটি নিয়োগ বাণিজ্যে অবৈধ অর্থের লেনদেনের প্রমাণ পায়। পরে উপসচিব মো. শাহাদৎ হোসেন ও সহকারী সচিব গোলাম সরোয়ারের তদন্ত প্রতিবেদনে নিয়োগ বাণিজ্যে অর্থ লেনদেনের সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়।
একটি মহল ৫১১টি পদে নিয়োগ সম্পন্ন করতে সম্প্রতি নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছে বলেও জানা গেছে। এ বিষয় পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিব মোসাম্মৎ শাহানারা খাতুন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘অনিয়মের অভিযোগে নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাশত করা হবে না। স্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে নিয়োগ পরীক্ষা হবে। এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।