প্রশ্নফাঁস
আলাউদ্দিন আরিফ
প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০২৪ ০০:৩৩ এএম
আপডেট : ১২ জুলাই ২০২৪ ১০:৫৯ এএম
সৈয়দ আবেদ আলী। ছবি : সংগৃহীত
প্রশ্নফাঁস চক্রে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সাবেক ও বর্তমান একাধিক সদস্য জড়িত বলে সন্দেহ করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গ্রেপ্তার হওয়া আসামিরা জানিয়েছেন, প্রশ্নফাঁস চক্রের মূল হোতা সৈয়দ আবেদ আলীর প্রধান সহযোগী ছিলেন অফিস সহায়ক (ঝাড়ুদার) সাজেদুল ইসলাম। উপপরিচালক জাফর হোসেন ও সহকারী পরিচালক আলমগীর হোসেনের মাধ্যমে সাজেদুল প্রশ্নপত্র পেতেন। সেই প্রশ্নপত্র আসামি সাখাওয়াত ও সাইমের মাধ্যমে চাকরিপ্রার্থীদের কাছে বিক্রি করা হতো। উপপরিচালক জাফর হোসেনের মালিবাগের জ্যোতি কোচিং সেন্টার ও সহকারী আলমগীর হোসেনের মিরপুরের কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র চাকরিপ্রার্থীদের কাছে বিক্রি করা হতো। সাজেদুল আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে জানিয়েছেন, তারা ৪৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার চার সেট প্রশ্ন ও রেলওয়ের সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার (ননক্যাডার) নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস করেন।
প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার অভিযোগে রাজধানীর পল্টন থানায় সিআইডির করা মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তারা এসব তথ্য জানিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, আসামিদের সকল মোবাইল ফোন ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। এই ল্যাব টেস্টে তাদের লেনদেন ও বিভিন্ন অ্যাপসে মেসেজ আদান-প্রদানের তথ্য পাওয়া যাবে। এই প্রক্রিয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কেউ জড়িত থাকলে তাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন সিআইডি কর্মকর্তারা।
তারা বলেছেন, ‘আসামিদের বক্তব্যে অনেক অসঙ্গতিও পাওয়া গেছে। তাই আবারও যাচাই-বাছাই করার জন্য ছয় আসামিকে ১০ দিনের রিমান্ডের জন্য চেয়ে পাঠানো হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার জুয়েল চাকমা আদালতে এ আবেদন করেন। আসামিরা হলেনÑ পিএসসির উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম (৫৮), সহকারী পরিচালক এসএম আলমগীর কবির (৪৯), উপপরিচালক আবু জাফর (৫৭), প্রতিরক্ষা ও অর্থ বিভাগ এসিসিডিএফের (বিওএফ) অডিটর প্রিয়নাথ রায় (৫১), মিরপুরের পোশাক কারখানার ব্যবসায়ী নোমান সিদ্দিকী (৪৪) ও ব্যবসায়ী জাহেদুল ইসলাম (২৭)। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রাজেশ চৌধুরীর আদালত আগামী ১৬ জুলাই আসামিদের উপস্থিতিতে রিমান্ড শুনানির তারিখ ধার্য করেছেন।
এদিকে আবেদ আলী জানিয়েছেন, তিনি রেলওয়ে নিয়োগ পরীক্ষায় ৮০ জনের কাছে প্রশ্ন বিক্রি করেন। এজন্য প্রত্যেকের কাছ থেকে তিনি ২ লাখ করে টাকা নিয়েছেন। ৪৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ৪ সেট প্রশ্নপত্রও চাকরিপ্রার্থীদের সরবরাহ করেন তিনি। তাদের একটি কোচিং সেন্টারে ডেকে বসিয়ে বসিয়ে তিনি চার সেট প্রশ্নের জবাব মুখস্থ করান। এ ছাড়া আসামি আবু সোলায়মান সোহেলের মাধ্যমে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বুথ বসিয়ে পরীক্ষার্থীদের প্রশ্নের জবাব মুখস্থ করান।
পিএসসির অফিস সহায়ক সাজেদুল ইসলাম জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, রেলওয়ের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করার জন্য তিনি উপপরিচালক মো. আবু জাফরকে ২ কোটি টাকা দেন। পিএসসির সদস্য অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুকের কক্ষের ট্রাংক খুলে তিনি বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করে সেগুলো টাকার বিনিময়ে ফাঁস করতেন। ট্রাংকের তালা খোলার পর নতুন তালা লাগিয়ে দিতেন তারা। ওইসব তালার চাবি থাকত জাফর হোসেন ও আলমগীর হোসেনের কাছে।
এদিকে প্রশ্নফাঁসকারী চক্রকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে পুলিশ ও গণমাধ্যমকর্মীর পরিচয় দেওয়া একটি চক্রের বিরুদ্ধে মালিবাগের একটি আবাসিক হোটেলে সন্দেহভাজনদের আটকে রেখে নির্যাতনের তথ্য পাওয়া গেছে। নির্যাতন করে ও ভয়ভীতি দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করারও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজনদের পিএসপির চেয়ারম্যান সোহরাব হোসেন নিজেই পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন। তিনি সন্দেহভাজনদের ডেকে নেন এবং সিআইডির সঙ্গে গিয়ে তাদের সহযোগিতা করতে বলেন। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে পিএসসির চেয়ারম্যান সোহরাব হোসাইন সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় পিএসসির অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। এসব ঘটনায় আরও যেসব কর্মকর্তার নাম সন্দেহভাজন হিসেবে আসছে, তাদের বিষয়েও খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে নজরদারিতে রেখেছে বলেও জানতে পেরেছি।’ তিনি বলেন, ‘প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে কোনো সদস্যের অবহেলা বা সংশ্লিষ্টতা থাকলে তাদের বিষয়েও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ রেলওয়ের সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে ৮ জুলাই ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি।
আবেদ আলী ছিলেন বেপরোয়া
পিএসসি সূত্র জানায়, পিএসসির গাড়িচালক আবেদ আলী তার চাকরি জীবনে সদস্য মুজিবুর রহমান, মো. মোজাম্মেল হক, মোহাম্মদ হোসেন সেরনিয়াবাত ও যুগ্মসচিবের গাড়ি চালান। অধ্যাপক ড. হাসানুজ্জামানকে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় ২০০৫ সালের ১১ এপ্রিল তাকেসহ ১১ গাড়িচালককে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। পরে তার বিরুদ্ধে মামলা হলেও ওই মামলা থেকে তিনি ২০০৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর অব্যাহতি পান।
আবেদ আলীর বিরুদ্ধে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘পিএসসি সচিবালয়ে কর্মরত থাকা অবস্থায় ২০১৪ সালের ২২ এপ্রিল ননক্যাডার শাখা কর্তৃক গৃহীত শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সহকারী মেনটেইন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার পদে লিখিত পদে পরীক্ষায় জনৈক পরীক্ষার্থীকে তিনি বাইরে থেকে চাকরির লিখিত উত্তরপত্র সরবরাহ করেন। এই অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ায় আবেদ আলীকে ২০১৪ সালের ৩ জুলাই কমিশন সচিবালয়ের চাকরি থেকে ফের সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। শৃঙ্খলা ভঙ্গের বিধিমালায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। ওই সময় পিএসসিতে দেওয়া তার ঠিকানা ভুল হওয়ায় তাকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। পরে সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপারকে চিঠি দিয়ে জানা যায়, তার নিয়োগকালীন ঠিকানা সঠিক নয়। এ সময় তাকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়। পরে জানা যায় আবেদ আলীর প্রকৃত ঠিকানা মাদারীপুরে। চাকরি থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পরও তিনি পিএসসির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে নিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারবার করতেন।
তালিকায় শতাধিক কর্মকর্তা
ফাঁস হওয়া এসব প্রশ্নের মাধ্যমে বিভিন্ন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে অনেক পরীক্ষার্থীই বিভিন্ন দপ্তরে নিয়োগ পেয়েছেন। ফাঁস হওয়া প্রশ্ন কিনে পরীক্ষা দিয়েছেন এমন শতাধিক কর্মকর্তার তালিকা তৈরি করেছে সিআইডি। আসামিদের স্বীকারোক্তি থেকে এসব নাম পাওয়া গেছে। এদের বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।
ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রে পরীক্ষার মাধ্যমে চাকরিপ্রাপ্তদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে চাইলে জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে, ফাঁস হওয়া প্রশ্নে চাকরিতে নিয়োগ প্রমাণ হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ বৃহস্পতিবার (১১ জুলাই) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ফাঁস হওয়া প্রশ্নে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্টভাবে নাম এলে অবশ্যই আইনানুগভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চাকরিবিধি ভঙ্গ করলে এবং প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আবেদ আলীকে একটি দলের হয়ে স্লোগান দিতে দেখা গেছে। তিনি কোনো এজেন্ডা নিয়ে কথা বলছেন কি না, সেটি দেখার বিষয়। তার কথা সত্য না মিথ্যা, সেটি সরকারের পক্ষ থেকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, ‘যে প্রক্রিয়ায় প্রশ্ন বাছাই হয় সেখানে কোনো দুর্বলতা আছে কি না, তা দেখা হবে। পিএসসি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তারা তাদের নিজস্ব চিন্তাভাবনা থেকে কাজ করবে।’
অনুসন্ধান করবে দুদক
প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে গ্রেপ্তার পিএসসির দুই উপপরিচালক আবু জাফর ও জাহাঙ্গীর আলম, সহকারী পরিচালক আলমগীর কবির, ডেসপাচ রাইডার খলিলুর রহমান ও অফিস সহকারী সাজেদুল ইসলামকে গত মঙ্গলবার পৃথক পাঁচটি প্রজ্ঞাপনে সাময়িক বরখাস্ত করেছে পিএসসি। তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে বুধবার দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) চিঠি দিয়েছে পিএসসি।
এ বিষয়ে দুদক জানিয়েছে, ‘পিএসসির চিঠি পাওয়ার পর তাদের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধানের বিষয়ে কমিশনের পরবর্তী সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কমিশনের অনুমোদনের পর অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হবে।’
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই নিপ্পন চন্দ্র দাস জানান, গ্রেপ্তার হওয়ার পর আদালতে জবানবন্দি দেওয়া আসামিরা হলেন, পিএসসির ডেসপাস রাইটার খলিলুর রহমান ও অফিস সহায়ক সাজেদুল ইসলাম, মিরপুরের ব্যবসায়ী আবু সোলায়মান মো. সোহেল, ব্যবসায়ী সাখাওয়াত হোসেন, ব্যবসায়ী সাইম হোসেন ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র লিটন সরকার। পরে তাদের কারাগারে পাঠানো হযেছে।
স্বীকারোক্তি না দেওয়া ১০ আসামি হলেন, আবেদ আলীর ছেলে সৈয়দ সোহানুর রহমান, পিএসসির উপপরিচালক মো. আবু জাফর ও জাহাঙ্গীর আলম, সহকারী পরিচালক মো. আলমগীর কবির, সাবেক সেনা সদস্য নোমান সিদ্দিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও অডিটর প্রিয়নাথ রায়, ঢাকার ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অফিসে কর্মরত মো. মামুনুর রশিদ, নারায়ণগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসের নিরাপত্তা প্রহরী মো. শাহাদত হোসেন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের টেকনিশিয়ান নিয়ামুল হাসান ও জাহিদুল ইসলাম।
সিআইডি বিশেষ পুলিশ সুপার তৌহিদুল ইসলাম জানান, এজাহারনামীয় আসামিরা ছাড়াও জিজ্ঞাসাবাদে আরও কয়েকজন সন্দেহভাজনের নাম পাওয়া গেছে। তারা হলেন, পিএসসির সাবেক সহকারী পরিচালক নিখিল চন্দ্র রায়, পিএসসির মো. শরিফুল ইসলাম ভূইয়া, দীপক বনিক, খোরশেদ আলমে খোকন, কাজী মো. সুমন, একেএম গোলাম পারভেজ, মেহেদী হাসান খান, গোলাম হামিদুর রহমান, মিজানুর রহমান, আতিকুল ইসলাম, এটিএম মোস্তফা, মাহফুজ কালু, আসলাম, কৌশিক দেবনাথ প্রমুখ। তারা সবাই আত্মগোপনে আছেন।