সেলিম আহমেদ
প্রকাশ : ১৭ নভেম্বর ২০২২ ২২:৩০ পিএম
আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০২২ ২২:৫৩ পিএম
সংগৃহীত ছবি
নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। একদিকে কাগজ সংকটের কারণে আগের পাঠ্যক্রমের বই ছাপার কাজে গতি নেই; অন্যদিকে নতুন পাঠ্যক্রম ও পাণ্ডুলিপি প্রস্তুতে বিলম্বের কারণে শুরুই হয়নি প্রাথমিকের প্রথম শ্রেণির বই ছাপার কাজ। ছাপা শুরু হতে লাগতে পারে আরও এক সপ্তাহ। অথচ নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার আর মাত্র দেড় মাস বাকি।
প্রতিবছর এই সময় যেখানে অর্ধেক বই ছাপা শেষ হয়ে স্কুলে স্কুলে পৌঁছে যেত, এবার এখন পর্যন্ত ছাপা শেষ হয়েছে মাত্র ৩০ শতাংশ। এসব বইয়ের আবার অধিকাংশই নিম্নমানের কাগজে ছাপানো।
এর সঙ্গে রয়েছে বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ছাপার কাজে বিঘ্ন হওয়া, ছাপার কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠানের কাজ করতে অস্বীকৃতি জানানো। সব মিলিয়ে পহেলা জানুয়ারি শিক্ষার্থীদের হাতে সব বই তুলে দেওয়া সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এনসিটিবির তথ্যমতে, ২০২৩ শিক্ষাবর্ষের জন্য এবার ৩৪ কোটি ৬১ লাখ ৬৩ হাজার কপি পাঠ্যবই ছাপার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক থেকে প্রাথমিক স্তরের ৯ কোটি ৯৮ লাখ ৫৩ হাজার কপি এবং মাধ্যমিক স্তরের জন্য ২৪ কোটি ৬৩ লাখ ১০ হাজার কপি পাঠ্যবই ছাপা হচ্ছে। এই প্রায় ৩৫ কোটি বই ছাপাতে প্রয়োজন হবে প্রায় এক লাখ টন কাগজ। কিন্তু দেশে এখন সেই পরিমাণ কাগজ নেই। আবার কাগজের কাঁচামাল সংকটের কারণে দেশের কাগজ মিলগুলোও পুরোদমে উৎপাদনে যেতে পারছে না। দেশে যে কাগজ আছে তা দিয়ে মাত্র ২০ শতাংশ মানসম্মত বই ছাপা সম্ভব।
বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সভাপতি তোফায়েল খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, শতভাগ বই কোনো অবস্থায়ই পহেলা জানুয়ারির মধ্যে ছাপানো সম্ভব নয়। দেশে যে পরিমাণ কাগজ আছে তা দিয়ে ৫০ শতাংশ বই ছাপা সম্ভব হবে। এর মধ্যে আবার সব কাগজ মানসম্মত নয়। এনসিটিবির মান বজায় রেখে বই ছাপলে ২০ শতাংশই ছাপা মুশকিল হবে।
তিনি জানান, কাগজ সংকটের পাশাপাশি মুদ্রণের অন্যান্য উপকরণ যেমন প্লেট, কালি ইত্যাদি আমদানিনির্ভর হওয়ার কারণে দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। বেশি দাম দিয়েও বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না।
কাগজ না থাকলে কী করে বই ছাপা হবেÑএ প্রশ্নের উত্তরে ছাপাখানার মালিকরা জানিয়েছেন, কয়েক দিন আগে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি মিলমালিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। কাগজ দেওয়ার অনুরোধ করেছেন। কিন্তু বাজারে এখন পর্যন্ত তার প্রভাব দেখা যায়নি। কাগজের দাম কমেনি। তাই এই সমস্যা সমাধানের একমাত্র উপায় হচ্ছে, জাতীয় স্বার্থে বিদেশ থেকে কাগজ বা ভার্জিন পাল্প শুল্কমুক্ত আমদানির অনুমতি দেওয়া।
বই ছাপানোর জন্য সরকার যে দর নির্ধারণ করেছিল তার থেকে কম দরে ছাপার কাজ নিয়েছেন মুদ্রণকারীরা। কিন্তু এখন কাগজসহ সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তারা। তাই কৌশলে নিম্নমানের কাগজে বই ছাপছেন অনেক মুদ্রণকারী। এই অভিযোগে ইতোমধ্যে একটি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের ছাপার কাজ বন্ধ রাখতে বলেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। আরও বেশ কয়েকটি প্রেসকে নিম্নমানের কাগজে বই ছাপার জন্য হুঁশিয়ারও করা হয়েছে।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফরহাদুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা সাফ জানিয়ে দিয়েছি, বই ছাপা কম হলে হোক। তবে কোনো নিম্নমানের কাগজে বই ছাপানো যাবে না। নিম্নমানের বই যাতে ছাপানো না হয় সেদিকে নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে। এনসিটিবি থেকে ৩৩টি টিম বই ছাপার কাজ মনিটরিং করছে। এ ছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় পৃথকভাবে মনিটরিং করছে।’
তিনি বলেন, ‘প্রথমদিকে বই ছাপার যে গতি ছিল গত কয়েক দিনে তা কমে এসেছে। কাগজ সংকটের কারণে বেশ কয়েকটি প্রেসে বই ছাপা বন্ধ রয়েছে। আমরা দ্রুত তাদের কাগজ সংগ্রহ করে বই ছাপাতে বলেছি। বছরের প্রথম দিন সব বই তুলে দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।’
প্রাথমিকের বই ছাপা প্রসঙ্গে অধ্যাপক ফরহাদুল ইসলাম বলেন, ‘সব ক্লাসের সব বই ছাপা শেষ না হলেও প্রাথমিকের বই যথাসময়ে ছাপা শেষ হবে বলে আমরা আশাবাদী। কারণ প্রাথমিকে বইয়ের পৃষ্ঠা ও সংখ্যা কম। আবার যে প্রেসগুলো ছাপার কাজ পেয়েছে সেগুলোও বড় প্রতিষ্ঠান। তাই সমস্যা হবে বলে মনে হয় না।’
এনসিটিবির সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, বইয়ের মান ঠিক রাখার জন্য দরপত্রে স্পেসিফিকেশন উল্লেখ করে দেওয়া হয়েছে। দরপত্রের শর্তানুযায়ী প্রাথমিক স্তর ও ইবতেদায়ির বই ৮০ জিএসএমের (গ্রাম/স্কয়ার মিটার) কাগজে ৮৫ শতাংশ উজ্জ্বলতা বা মণ্ড থাকতে হয়। নবম-দশম শ্রেণির বিজ্ঞানের বই চাররঙা মুদ্রণে ৭০ জিএসএম কাগজে এবং অন্য শ্রেণির বই ৬০ জিএসএম কাগজে ছাপতে হয়, আর বইয়ের কভারে ২৩০ জিএসএমের আর্ট কার্ড (মোটা কাগজ) ব্যবহার করতে হয়। এ ছাড়া ব্যবহৃত কাগজ কতটা মজবুত, তার নির্দেশনাকারী ‘বাস্টিং ফ্যাক্টর’ ন্যূনতম ১২ শতাংশ থাকতে হবে।
মান যাচাইয়ে নিযুক্ত ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিস বিডির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানান, যে বইগুলো ইতোমধ্যে ছাপা হয়েছে তা খুবই নিম্নমানের। তারা যাচাইকালে এ বিষয়ে মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করেছেন। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাগজ বাতিলও করা হয়েছে। কিন্তু অদৃশ্য ক্ষমতাবলে বেশিরভাগ মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আর বেশি কাজ পাওয়া দুটি মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠান বাতিল করা কাগজ অদল-বদল করে বই ছাপাচ্ছে।
তারা আরও বলেন, মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দরপত্রের স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী বইয়ে কাগজ ব্যবহার করছে না, বাঁধাইও খুবই নিম্নমানের। এতে দ্রুতই বইয়ের পৃষ্ঠা ছিঁড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।