প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৭ নভেম্বর ২০২২ ২১:৪১ পিএম
ছবি : সংগৃহিত
দেশে দুর্ভিক্ষ হওয়ার আশঙ্কা কম। তবে দুর্ভিক্ষের কথা বারবার বললে আতঙ্ক তৈরি হয়। এতে একটি গোষ্ঠী সুযোগ নিতে পারে। দুর্ভিক্ষ না হলেও সাময়িক সময়ের জন্য কোনও কোনও জায়গায় খাদ্য সংকট হতে পারে। এমন আশঙ্কা থাকলে আগে থেকেই ব্যবস্থা নিতে হবে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান এমন মতামত দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার (১৭ নভেম্বর) সানেম আয়োজিত ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি : উদ্বেগের জায়গা ও করণীয়’ শীর্ষক অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।
সেলিম রায়হান বলেন, ‘উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়ায় খাদ্যনিরাপত্তায় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তবে দেশে দুর্ভিক্ষ হওয়ার আশঙ্কা কম।’ তিনি উল্লেখ করেন, গত ১১ মাসে রিজার্ভ গড়ে ১০০ কোটি ডলার কমেছে। রফতানি ও প্রবাসী আয়েও সামনের দিনে সুখবর নেই। পণ্য আমদানির ঋণপত্র কমেছে। তার মধ্যে মূলধনি যন্ত্রপাতি ও মধ্যবর্তী কাঁচামাল আমদানি কমে যাওয়ায় চলতি অর্থবছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান কমবে। বিদেশি ঋণের কাঠামোও পরিবর্তন হচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে রফতানি ও প্রবাসী আয় না বাড়লে কয়েক বছর পর এই ঋণ পরিশোধের জন্য অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি হবে।’
মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতির চাপ শুধু বাংলাদেশের নয়, অনেক দেশেরই আছে। কোনও কোনও দেশের মূল্যস্ফীতির হার ২০ শতাংশেরও বেশি। তবে অনেক দেশ আছে যাদের মূল্যস্ফীতির হার বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম। বছরের শুরুতে জানুয়ারিতে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ছিল যেখানে ৫ দশমিক ৮৬, সেখানে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়ার মূল্যস্ফীতি ছিল ২ শতাংশ। বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে এসে ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মূল্যস্ফীতির হার যেখানে যথাক্রমে ৪ দশমিক ৩ ও ৫ দশমিক ৭১ শতাংশ সেখানে বাংলাদেশের ৮ দশমিক ৯ শতাংশ।’ তিনি বলেন, ‘আগস্টে দেশে মূল্যস্ফীতির হার সর্বোচ্চ পর্যায়, ৯ দশমিক ৫২ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছিল। সে হিসেবে বাংলাদেশের তুলনায় ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মূল্যস্ফীতি প্রায় অর্ধেক। একই জায়গায় জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে ভারতের মূল্যস্ফীতি শূন্য দশমিক ৭৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৭৭ শতাংশে।’
বর্তমান সংকট বৈশ্বিকভাবেই সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে সেলিম রায়হান বলেন, ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, কোভিড সংক্রমণ, বিশাল মূল্যস্ফীতিÑসবকিছু মিলেই এই খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে এটা মাথায় রাখা দরকার, আমাদের দেশীয় অনেকগুলো ঘটনা আছে যার কারণে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে।’ রফতানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ওপর ধারাবাহিক জরিপের ফল তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘পোশাক শ্রমিকদের খাদ্যনিরাপত্তার সূচক নিম্নমুখী। তার মানে পোশাক শ্রমিক ও তার সন্তানেরা আগের চেয়ে কম খাবার খাচ্ছেন। শ্রমিকদের মাসিক মজুরিও কমেছে। ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার কারণে শ্রমিকের কর্মঘণ্টা কমেছে।’
সানেম এবং এমএফও নামে একটি প্রতিষ্ঠান ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুরের নারী ও পুরুষ পোশাকশ্রমিকদের সাপ্তাহিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির চিত্র তুলে আনার চেষ্টা করেছেন বলে উল্লেখ করেন সেলিম রায়হান। তিনি বলেন, ‘পোশাকশ্রমিকরা সারাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করে না, তবে এটাও ঠিক অন্যান্য অনেক খাতের তুলনায় তারা ভালো অবস্থানে আছে। কারণ এটা একটা ফরমাল সেক্টর। তাদের নিয়মিত আয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। সংগৃহীত তথ্যে দেখা যায়, পোশাকশ্রমিকদের খাদ্যনিরাপত্তা আগের তুলনায় বেশি হুমকির মুখে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে যেখানে তাদের মাসিক শ্রমঘণ্টা ছিল ৩০০ সেখানে অক্টোবরে এসে তাদের শ্রমঘণ্টা কমে দাঁড়িয়েছে ২৫০ ঘণ্টায়। ফলে অতিরিক্ত কাজের জন্য তারা যে টাকা আয় করত সেটাও স্বাভাবিকভাবেই কমে গিয়েছে।’
সেলিম রায়হান বলেন, ‘বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণে স্বল্প মেয়াদে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। আওতা বাড়াতে হবে। কারণ, অনেকেই নতুন করে খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকিতে পড়বে। রিজার্ভের পতন ঠেকাতে হবে। আর মধ্য মেয়াদে রাজস্ব ও ব্যাংক খাতে সংস্কার আনতে সরকারের সদিচ্ছা লাগবে। তাছাড়া বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে উচ্চপর্যায়ের কমিটি করা দরকার। সেই কমিটির পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।’
কিভাবে খাদ্যসংকট থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে সে বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রচুর পরিমাণে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে হবে, আমদানির বিকল্প বাজার খুঁজে বের করতে হবে যেন এক বাজার বন্ধ হলেও অন্য বাজার থেকে আমদানির মাধ্যমে খাদ্যঘাটতি মোকাবেলা করা যায়। তাছাড়া কঠোরেভাবে বাজার মনিটর করতে হবে এবং সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধির জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে।