× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

দেনমোহর নিয়ে নয়ছয়, শুধু যৌতুকেই ছাড় নয়

ফারহানা বহ্নি

প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০২৪ ১০:৫৯ এএম

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২৪ ১১:০৭ এএম

শুধু দেনমোহরের মামলাই নয়, নারী নির্যাতনের সব ধরনের মামলাই নিষ্পত্তিতে লাগে দীর্ঘ সময়। ছবি : সংগৃহীত

শুধু দেনমোহরের মামলাই নয়, নারী নির্যাতনের সব ধরনের মামলাই নিষ্পত্তিতে লাগে দীর্ঘ সময়। ছবি : সংগৃহীত

বাগেরহাটের ব্যবসায়ী আমির হোসেন (ছদ্মনাম)। বোনকে বিয়ে দিয়েছিলেন লন্ডনপ্রবাসী ছেলের সঙ্গে। কিন্তু বিয়ের এক সপ্তাহের মাথায় বোনকে তালাক দেয় স্বামী। এ ঘটনায় আমির হোসেনের পরিবারের স্বাভাবিক জীবনে ঘটে ছন্দপতন। স্ত্রীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ার অজুহাতে তালাকনামা পাঠোনো হলেও দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করেনি স্বামী। 

এদিকে মামলা করেও দেনমোহরের প্রাপ্য টাকা আদায় করতে পারেনি ভুক্তভোগী ওই নারী। আলাপকালে আমির হোসেন বলেন, এত কম সময়ে আমার বোনের সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটবে তা চিন্তাও করিনি। শান্ত স্বভাবের বোনটি আমার এখন কারও সঙ্গে কথা বলে না। অনার্স পাস করা এমন একটি মেয়ের সঙ্গে ওরা এভাবে প্রতারণা করবে, ভাবতেও পারিনি।

তিনি বলেন, বিয়ের সময় ১২ লাখ ১ টাকা দেনমোহর ধরা হলেও তখন কোনো টাকা দেয়নি বরপক্ষ। এমনকি মামলা করেও দেনমোহরের টাকা উদ্ধার করতে পারিনি। মান-সম্মানের ভয়ে আমরা মামলা তুলে নিয়েছি। তালাকের পর মেয়েদেরই ক্ষতি হয় বেশি। মেয়েটা সংসারই করতে পারল না, এখন সে তালাকপ্রাপ্ত। মামলা টেনে নেওয়ার মতো মানসিক অবস্থা আমাদের ছিল না। কেউ যদি তালাক দেয় তা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কার্যকর হয়ে যায়। দেখা যায়, যতদিন মামলা চলছে ততদিন এই স্মৃতির সঙ্গে থাকতে হবে। 

বিবাহ বিচ্ছেদের পর দেনমোহরের ২০ হাজার টাকা উসুল হলেও বাকি টাকা পাননি রিতা জাহান নামের মধ্যবয়সি এক নারী। নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইবুন্যালের বারান্দায় কথা হয় রিতার সঙ্গে। দেনমোহর নিয়ে ২০১৮ সালে তার দায়ের করা মামলাটি এখনও সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। তিনি বলেন, ২০১৭ সালে আমার বিয়ে হয় ২ লাখ ২০ হাজার টাকা দেনমোহরে। বিয়ের সময় ২০ হাজার টাকা উসুল ধরা হয়। ওই সময় আমার পরিবার যৌতুক হিসেবে ১ লাখ টাকার বেশি মূল্যের আসবাব দিয়েছিল। বিয়ের কয়েকদিন পর মানসিক নির্যাতন শুরু হয় শ্বশুড়বাড়িতে। একসময় স্বামীই আমাকে তালাক দেয়। দেনমোহরের জন্য ২০১৮ সালে মামলা করেছি। বিচ্ছেদের ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও আমার প্রাপ্য টাকাটা পাইনি। সেই টাকার জন্য এখানে ওখানে তদবির করে ব্যর্থ হয়েছি। এখন আদালতের বারান্দায় ঘুরছি। 

এই দুটি ঘটনাই কেবল নয়, আমাদের দেশের নারীরা নিজেদের মোহরানার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। স্বামীর সংসারে থাকাকালে দেনমোহর তো পানই না, বিচ্ছেদ হলেও নানাভাবে হয়রানির শিকার হন তারা। প্রাপ্য টাকার জন্য আদালতের বারান্দায় ঘুরতে ঘুরতে অনেকে আশাই ছেড়ে দেন।

শুধু দেনমোহরের মামলাই নয়, নারী নির্যাতনের সব ধরনের মামলাই নিষ্পত্তিতে লাগে দীর্ঘ সময়। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ধারা ২০(৩)-এ বলা আছে, বিচারের জন্য মামলার তারিখ হতে ১৮০ দিনের মধ্যে ট্রাইব‌্যুনাল কার্য শেষ করতে হবে। কিন্তু বহু মামলার ক্ষেত্রে এই নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। এসব মামলার রায়ে দেরি হচ্ছে বলেই নির্যাতনের ঘটনাও বেড়ে চলেছে। 

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তদন্ত হতে দেরি হওয়া, ভুল রিপোর্ট দেওয়া, মেডিকেল রিপোর্টে অতিরিক্ত সময় লাগা, ঘটনাস্থলের দূরত্ব, আসামির পালিয়ে যাওয়া, পুলিশ সদস্যদের বদলি, নির্যাতনের শিকার মেয়েটির পরিবারের সদস্যদের আর্থসামাজিক অবস্থান ইত্যাদি কারণে নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার নিষ্পত্তি হতে দেরি হয়।


দেনমোহরের টাকা পরিশোধে গুরুত্ব দেয় না অধিকাংশ পরিবার

২২ বছর ধরে সংসার করেছেন সালমা বেগম ও রফিকুল ইসলাম। একসঙ্গে এতগুলো বছর সুখেই কাটিয়েছেন তারা। স্বামীর কাছ থেকে দেনমোহরের টাকা না পেলেও তা নিয়ে আক্ষেপ নেই সালমার। তিনি বলেন, যখন যা প্রয়োজন ছিল, তা পেয়েছি। কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। 

স্বামী রফিকুল বলেন, সে সময় ৫০ হাজার টাকা নির্ধারিত ছিল। এর থেকে চারগুণ বেশি দিয়েছি। দেনমোহরের টাকা দিলেই কি আর না দিলে কি? সংসার টেকে তো সম্পর্কে, দেনমোহরে না। তবে যদি কখনও আমাদের ছাড়াছাড়ি হয়, এটা নিয়ে হয়তো ভাবতে হবে। 

আসমা বেগমের স্বামী মারা গেছেন গত বছর। প্রায় ৫০ বছরের সম্পর্কে নানা কলহেও একসঙ্গে কাটিয়েছে এই দম্পতি। তবে দেনমোহরের টাকা পরিশোধ হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাকে জায়গা কিনে দিয়েছিল। তবে তা বিয়ের অনেক বছর পর।

শুধু আসমা বেগম নয়, অনেকে মনে করেন তালাক হলেই দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করা হয়। তিন কন্যাসন্তানের জননী ফাতিমা। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেন, এই টাকাটা তো ছাড়াছাড়ি হলে দেওয়া লাগে। 

দেনমোহরের টাকা পরিশোধ না করা হলেও তালাক কার্যকর হবে বলে জানান মোহাম্মদপুরের জামিয়াতুল আবরার রাহমানিয়া মাদ্রাসার মুহাদ্দিস মুফতি মিজানুর রহমান কাসেমি। তিনি বলেন, এই টাকা আদায় করতে হলে তাকে তখন মামলা করতে হবে। এছাড়া দেনমোহরের টাকার পরিবর্তে গয়না বা জমি দিলে তা আগে থেকে স্পষ্ট করে বলতে হবে। পরে গয়না বা জমি দিয়ে বললে সেটা দেনমোহর হিসেবে গণ্য হবে না। যখন বিয়ে হবে তখনই দেনমোহরের টাকাটা দিতে হবে। পরে দিতে চাইলে তা-ও কাবিননামায় উল্লেখ করতে হবে। সবকিছুই স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। 

মহিলা পরিষদের সিনিয়র আইনজীবী দীপ্তি রানী সিকদার বলেন, আমাদের দেশে যৌতুকের টাকা আদায়ের ক্ষেত্রে যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয় দেনমোহরের প্রাপ্য টাকা আদায়ের ক্ষেত্রে ততটা দেওয়া হয় না। দেনমোহর বিয়ের শর্ত। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই টাকাটা দেওয়া হয় না। সচেতনতার কথা যদি বলি, পরিবারগুলো খেয়াল করে না। বিয়ের সময় উসুল লেখা হয় কিন্তু তখন তাদের মাথায় থাকে না, টাকাটা পরবর্তীতে পাওয়া যাবে কি না। প্রথমত, দেনমোহর নির্ধারিত হয় দুই পরিবারের অবস্থা অনুযায়ী। টাকা আদায়ে মূলত আমাদের কোর্টের প্রসেসিংয়ের জন্য মামলায় দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়। সেক্ষেত্রে বিবাদী পক্ষও চায়, টাকা না দিয়ে যতটা পারা যায় সময় কাটানো। মামলার রায়ের পর কোর্ট থেকে বিবাদী পক্ষকে জানানো হয়। তারা সমন দেয়, সেখানেও বিভিন্ন ধাপ আছে। এভাবে অনেক সময় লেগে যায়। 

তিনি বলেন, সাধারণত তালাক হওয়ার পরই এই টাকাটা আদায়ের জন্য নারীরা আসে। তার আগে খুব কম মানুষই দেনমোহরের টাকা আদায়ের ক্ষেত্রে সচেতন হয়। এক্ষেত্রে অসচেতনতা আছে বলা যাবে না, বরং সচেতনভাবেই এই টাকাটা না দেওয়ার জন্য এড়িয়ে যায় বিবাদী পক্ষ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাদীপক্ষ হাল ছেড়ে দেয়। শুধু তা-ই নয়, তালাক কার্যকর হতে তিন মাস সময় লাগে। এই সময়ের ভরণপোষণের টাকা দিতেও বাধ্য বিবাদী পক্ষ।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুসারে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে গত বছর সারা দেশে শুধু থানায় ১৮ হাজার ৯৪১টি মামলা হয়েছে। গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তথ্য অনুসারে, সারা দেশের ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৪৩৮টি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে পাঁচ বছরের বেশি সময়ের মামলা বিচারাধীন প্রায় ৩৪ হাজারের বেশি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা