সর্বজনীন পেনশন
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৪ ২১:২৯ পিএম
আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৪ ২১:৫৪ পিএম
সর্বজনীন পেনশনের ‘প্রত্যয় স্কিম’ প্রত্যাহারের দাবিতে সপ্তম দিনের মতো সর্বাত্মক কর্মবিরতি পালন করেছেন দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সাপ্তাহিক ছুটির কারণে দুই দিন আন্দোলন স্থগিত থাকার পর রবিবার (৭ জুলাই) আবারও ক্লাস, পরীক্ষা, একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রেখে কর্মবিরতি পালন করেছেন তারা। আন্দোলনকারীরা বলছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন প্রত্যাহার করা হবে না।
এদিকে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আবারও সরকারের পক্ষ থেকে যোগাযোগ হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষক নেতারা। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক, পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও রবিবার বলেছেন, শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। তাদের সঙ্গে কখন বসব, এই মুহূর্তে বলতে পারছি না। তবে বিষয়টি সময়মতো সমাধান হবে। এর আগে গত ৪ জুলাই আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে শিক্ষক নেতাদের বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত হয়নি।
সর্বজনীন পেনশনের প্রত্যয় স্কিমের প্রজ্ঞাপন বাতিলসহ তিন দফা দাবিতে ১ জুলাই থেকে সর্বাত্মক কর্মবিরতি পালন করছেন দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। এর বাইরে সুপার গ্রেডে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্তি ও শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল প্রবর্তনেরও দাবি রয়েছে তাদের।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের মহাসচিব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. নিজামুল হক ভূইয়া বলেন, আজ (রবিবার) আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের পক্ষে একাধিক ব্যক্তি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। যদিও এখনও বৈঠকের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আশা করছি, শিগগির এ বিষয়ে বৈঠক হবে। সরকারের মধ্য ছোট্ট একটি গ্রুপ ২০১৫ সালে ষড়যন্ত্র করেছে। সুপার গ্রেড নিয়ে ’১৫ সালে কমিটি হয়েছিল; কিন্তু কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। এ সময়ে এসেও তারা আবার ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। এরা কারা, তাদের খুঁজে বের করা প্রয়োজন।
রবিবার সকাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের ক্লাস, পরীক্ষা ও দাপ্তরিক কার্যক্রম বন্ধ ছিল। খোলা হয়নি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারও। দুপুর ১২টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত শিক্ষকরা কলা ভবনের ফটকের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। এছাড়া সকাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক ভবনের সামনে কর্মকর্তা-কর্মচারী ঐক্য পরিষদও কর্মবিরতি পালন করে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সেশনজট তৈরির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অবস্থান কর্মসূচিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জিনাত হুদা বলেন, এই আন্দোলন থেকে শিক্ষক সমাজ পিছু হটবে না। এই আন্দোলন চলমান থাকবে, আমাদের বিজয় সুনিশ্চিত। এই আন্দোলন নিয়ে ভুল ব্যাখ্যা হচ্ছে। এই আন্দোলন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে নয়। এটা শুধু প্রত্যয় স্কিমের বিরুদ্ধে, যারা এই স্কিম চালু করে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়কে অচল করতে চাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষক-কর্মকর্তারা বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সিনেট ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। কর্মসূচিতে শিক্ষক সমিতির সভাপতি হাবিবুর রহমান বলেন, তিন মাস ধরে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলন করে যাচ্ছি। গত সপ্তাহে ভেবেছিলাম এ সপ্তাহে আর আমাদের দাঁড়ানো লাগবে না। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমাদের এখনও দাঁড়ানো লাগছে। আমি মনে করি, আমাদের দাবি আদায়ে আন্দোলনের পাশাপাশি আলোচনাও দরকার। এই আন্দোলন কতদিনে থামবে তা জানি না। কিন্তু এটা জানি প্রত্যয় স্কিম থেকে শিক্ষকদের নাম বাতিল এবং শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল ছাড়া শিক্ষকদের আর ঘরে ফেরার উপায় নাই।
স্বতঃস্ফূর্তভাবে সর্বাত্মক কর্মবিরতি ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষকরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার চত্বরে অবস্থান কর্মসূচিতে জবি শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. শেখ মাশরিক হাসান বলেন, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। জ্ঞান সৃষ্টি ও বিতরণ আমাদের মূল কাজ। ছাত্রছাত্রীরা আমাদের প্রাণ। আমরা ছাত্রছাত্রীদের মাঝে ফিরে যেতে চাই। শিক্ষকদের মান-মর্যাদা ও উচ্চশিক্ষাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য বৈষম্যমূলক পেনশন প্রজ্ঞাপন প্রত্যাহার চাই ।
শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের লাগাতার আন্দোলনে অচল হয়ে পড়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ও। ঈদুল আজহা ও গ্রীষ্মকালীন অবকাশ শেষে রবিবার থেকে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও দাপ্তরিক কার্যক্রম চালু হওয়ার কথা থাকলেও তা বন্ধ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রত্যয় স্কিম চালু হলে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মানে ব্যাপক পতন ঘটবে।’
হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সর্বাত্মক কর্মবিরতি ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। অবস্থান কর্মসূচিতে হাবিপ্রবি শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. সাদেকুর রহমান বলেন, বিগত ১৫ বছরে এক দিনের জন্যও বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। কিন্তু আজকে একটি জটিল ইস্যু তৈরি হয়েছে, যেটি শিক্ষকদের আত্মমর্যাদার ইস্যু। আমরা প্রত্যয় স্কিম প্রত্যাহার চাই না, কিন্তু প্রত্যয় স্কিম থেকে আমাদের প্রত্যাহার করা হোক।
একই দাবিতে সর্বাত্মক কর্মবিরতি পালন করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।