প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৪ ০৮:৫৯ এএম
২০১৮ সালের পরিপত্র পুনর্বহালের দাবিতে শনিবার রাজধানীর শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা। অনেকে বুকে স্লোগান লিখে যোগ দেন সমাবেশে। ছবি : আলী হোসেন মিন্টু
ঢাকাসহ সারা দেশে অবরোধের (বাংলা ব্লকেড) কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। রবিবার (৭ জুলাই) বেলা ৩টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি থেকে শিক্ষার্থীদের এ কর্মসূচি শুরু হবে। গতকাল শনিবার বিকালে রাজধানীর শাহবাগ মোড় অবরোধের সময় কোটাবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরাও। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেসবুক গ্রুপ ও পেজ থেকে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের বার্তা দেওয়া হচ্ছে। গতকাল আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা টাঙ্গাইল, রংপুর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, পাবনা ও কুষ্টিয়ায় সংশ্লিষ্ট পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। এ সময় মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ ও জটের সৃষ্টি হয়। এছাড়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি এ আন্দোলনে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন জানিয়েছে।
শাহবাগ মোড় অবরোধ
পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী গতকাল বেলা ৩টা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে অবস্থান নেওয়া শুরু করেন আন্দোলনকারীরা। তাদের এই অবস্থানে মিছিলসহকারে যোগ দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল, ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা। তাদের মিছিল কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি, হাজী মোহাম্মদ মুহসিন হল, ভিসি চত্বর, টিএসসি, জগন্নাথ হলের মোড় হয়ে বকশীবাজার, বুয়েট, পলাশী, আজিমপুর হয়ে ইডেন কলেজ, হোম ইকোনমিক্স কলেজ হয়ে ফের নীলক্ষেতের রাজু ভাস্কর্য হয়ে বিকাল ৪টা ৩০ মিনিটে শাহবাগ মোড় অবরোধ করে। প্রায় ১ ঘণ্টার এই অবরোধ তুলে নেওয়ার আগে পরবর্তী আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
কর্মসূচি ঘোষণার আগে বৈষম্যবিরোধী এই ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘আজকে আমাদের শাহবাগ ব্লকড হয়েছে। আগামীকাল থেকে বাংলাদেশ ব্লকড শুরু হবে। আজকের মতো কালকেও যদি আমাদের বোনেরা আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে যায়, কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না। আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।’
কর্মসূচি ঘোষণা করে আন্দোলনের আরেক সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আগামীকাল (রবিবার) বেলা ৩টা থেকে বাংলা ব্লকেড কর্মসূচি ঘোষণা করা হলো। শুধু শাহবাগ মোড় নয়, সায়েন্সল্যাব, চানখাঁর পুল, নীলক্ষেত, মতিঝিল, যাত্রাবাড়ীসহ ঢাকার প্রতিটি পয়েন্ট অবরোধ করা হবে।’
ক্লাসে না ফেরার ঘোষণা দিয়ে নাহিদ বলেন, ‘শিক্ষকদের আন্দোলন একদিন বন্ধ হয়ে যাবে, কিন্তু আমাদের আন্দোলন বন্ধ হবে না। শিক্ষকরা ক্লাসে ফিরে গেলেও দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা ক্লাসে ফিরব না।’
মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ
গতকাল প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতেও শিক্ষার্থীদের কোটাবিরোধী আন্দোলনে উত্তাল ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। আন্দোলনরত তিন হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর থেকে মিছিল নিয়ে প্রধান ফটকের সামনে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করেন তারা। এর আগে সকাল ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান বর্জন করে প্যারিস রোডে জড়ো হতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা ‘লেগেছে রে লেগেছে, রক্তে আগুন লেগেছে,’ ‘মেধাবীদের কান্না আর না আর না’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে থাকেন।
একই দাবিতে গতকাল দ্বিতীয় দিনের মতো ক্যাম্পাস ছেড়ে চট্টগ্রাম শহরের রাজপথ অবরোধ করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে রাজপথে নামেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থীরাও। বিকাল ৫টার দিকে বন্দর নগরী চট্টগ্রামের ২ নম্বর গেটসংলগ্ন চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক অবরোধ করে ছাত্রসমাবেশে অংশ নেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। তবে অ্যাম্বুলেন্স চলাচলে বাধা দেননি শিক্ষার্থীরা।
অন্যদিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) শিক্ষার্থীরা। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে টাঙ্গাইল শহরের বাইপাসনগর জলপাই এলাকায় অবস্থান করে বিক্ষোভ করেন তারা। ফলে নাটিয়াপাড়া থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার রাস্তায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দুপুরে নগরের মডার্ন মোড়ে রংপুর-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন। দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত ঘণ্টাব্যাপী এই কর্মসূচি চলে। এ সময় মহাসড়কের দুই পাশে যান চলাচল বিঘ্নিত হয়। তবে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে ঢাকা-পাবনা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। প্রায় ১ ঘণ্টা এই অবরোধ চলে। এতে দুপাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে প্রশাসনের অনুরোধে ক্যাম্পাসে ফিরে যান শিক্ষার্থীরা।
কুষ্টিয়ায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) কোটাবিরোধী আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বৃষ্টি উপেক্ষা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে প্রায় আধাঘণ্টা কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন।
গতকাল বেলা ৩টার দিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক হাজারের বেশি শিক্ষার্থী মিছিল নিয়ে গুলিস্তান জিরো পয়েন্টের দিকে রওনা হলে তাঁতিবাজার মোড়ে পুলিশ তাদের আটকে দেয়। পরে তারা তাঁতিবাজার মোড়ে সড়ক অবরোধ করে অবস্থান নেন। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) শিক্ষার্থীরা বঙ্গবন্ধু চত্বরের সামনে সমবেত হয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন এবং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
কলেজ শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে
সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে কিশোরগঞ্জে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন গুরুদয়াল সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীরা। ময়মনসিংহে কলেজ শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন। গতকাল সকালে নগরীর ময়মনসিংহ সরকারি কলেজ, নাসিরাবাদ কলেজসহ বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা সরকারি আনন্দ মোহন কলেজে জড়ো হন। পরে সেখান থেকে কোটা বাতিলের দাবিসংবলিত প্লেকার্ডসহকারে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে টাউন হল মোড়ে সমাবেশ করেন।
(তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিরা)