এমপি আনার হত্যা
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০২৪ ২০:৩০ পিএম
আনোয়ারুল আজিম আনার। ছবি : সংগৃহীত
ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) আনোয়ারুল আজিম আনারকে অপহরণ ও হত্যা মামলায় হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তি দেওয়া ৩ আসামি জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদন করেছেন।
বৃহস্পতিবার (৪ জুলাই) ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তারা এই আবেদন করেন।
ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদনে তারা বলেছেন, তাদের দেওয়া স্বীকারোক্তি স্বেচ্ছায় ছিল না।
আসামিরা হলেন, ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক কাজী কামাল আহমেদ বাবু ওরফে গ্যাস বাবু, শিমুল ভূঁইয়া ওরফে শিহাব ওরফে ফজল মোহাম্মদ ভূঁইয়া ওরফে আমানুল্যাহ সাঈদ এবং তার ভাতিজা তানভীর ভূঁইয়া।
ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাহবুবুল হকের আদালতে আসামিদের জবানবন্দি প্রত্যাহারের ওপর শুনানি হয়। এ সময় আসামিদের আদালতে হাজির করা হয়। আসামিপক্ষে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটর এহসানুল হক সমাজীসহ কয়েকজন আইনজীবী শুনানি করেন। শুনানি শেষে আদালত আবেদনগুলো নথিভুক্ত রাখার নির্দেশ দেন।
আবেদনে বলা হয়, তাদের গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়। স্বীকারোক্তি দিতে তাদের বাধ্য করা হয়। এমনকি স্বীকারোক্তি লেখা ছিল। তাদের ইচ্ছার বাইরে ওই স্বীকারোক্তিতে স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
আবেদনের ওপর শুনানি শেষে অ্যাডভোকেট এহসানুল হক সমাজী সাংবাদিকদের বলেন, আসামিরা স্বীকারোক্তি স্বেচ্ছায় দেননি। এই কারণে তারা প্রত্যাহারের আবেদন করেছেন। এদিকে আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করার কারণে তারা অসুস্থ মর্মে চিকিৎসার আবেদন করেন। আদালত কারাবিধি অনুযায়ী কারা কর্তৃপক্ষকে চিকিৎসার নির্দেশ দেন।
ডিবির ভাষ্য অনুযায়ী এমপি আনারের অন্যতম ঘাতক শিমুল ভূঁইয়া ঘটনাস্থলে থেকে হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়ন করেন। অপর আসামিরা ছিলেন তার সহযোগী। আর এই হত্যাকাণ্ডের মূল মাস্টরমাইন্ড আখতারুজ্জামান শাহীন। তিনি হত্যাকাণ্ডের পর আমেরিকায় আত্মগোপন করেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আনার হত্যার ঘটনায় নতুন করে আরও কয়েকজনের নাম পেয়েছে গোয়েন্দারা। তাদের গ্রেপ্তারে কাজ চলছে। এরইমধ্যে আনার হত্যার ঘটনায় সাতজনকে দেশে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যার মধ্যে ছয়জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ জানিয়েছেন, এমপি আনার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সর্বশেষ দুর্গম পাহাড়ে অভিযান চালিয়ে মোস্তাফিজ ও ফয়সালকে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালত তাদেরকে ছয়দিনের রিমান্ড দেন। সেই রিমান্ডের প্রেক্ষিতে জিজ্ঞাসাবাদে মোস্তাফিজ ও ফয়সাল জানায়- তাদেরকে ভারতে যাওয়ার জন্য আক্তারুজ্জামান শাহীন পাসপোর্টের ব্যবস্থা করে দেন। ঢাকার বসুন্ধরায় শাহীনের বাসায় থেকে ফয়সালকে হৃদরোগের রোগী ও মোস্তাফিজকে কিডনি রোগীর ভুয়া কাগজপত্র, ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট এবং বিভিন্ন ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে ভারতের ভিসা করানো হয়। যতদিন পর্যন্ত তাদের ভিসা হয়নি ততদিন তারা শাহীনের ঢাকার বাসায় ছিলেন।
তিনি বলেন, ভিসা হওয়ার পর আক্তারুজ্জামান শাহীন ২০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন মোস্তাফিজ ও ফয়সালকে; যাতে তারা রেলযোগে ভারতে চলে যান। ভারতে গিয়ে তারা ১০ এপ্রিল কলকাতার সঞ্জিবা গার্ডেনে প্রবেশ করেন। ১৩ মে বন্ধু গোপাল বিশ্বাসের বাসা থেকে বেরিয়ে লাল গাড়িতে করে এমপি আনারকে সঞ্জিবা গার্ডেনে নিয়ে আসেন ফয়সাল। এরপর শাহীনের পিএস পিন্টুর কাছে থেকে অচেতন করার জন্য ক্লোরোফর্ম ও চাপাতি নিয়ে আসার দায়িত্ব পালন করেন মোস্তাফিজ, ফয়সাল ও জিহাদ।
মোস্তাফিজ ও ফয়সালকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে হারুন আরও জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ড শেষে যখন সবাই চলে যায় তখন সর্বশেষ মোস্তাফিজ ও ফয়সাল সঞ্জিবা গার্ডেনের ওই ফ্ল্যাটে ছিলেন। সেখানেও শাহীনের সঙ্গে তাদের কথা হয়। শাহীন তাদের নির্দেশ দেয়, ফ্ল্যাটটিতে যেন কোনো চুল এবং রক্তের দাগ না থাকে; সবকিছু গুছিয়ে ঠিকঠাকভাবে রাখতে বলা হয়। এরপর ১৯ মে মোস্তাফিজ ও ফয়সাল বাংলাদেশে চলে আসেন। দেশে আসার টিকিটও শাহীন কেটে দেন। বাংলাদেশে এসেও শাহীনের ঢাকার বাসার তিনতলায় ওঠেন মোস্তাফিজ ও ফয়সাল।
আমানুল্লাহ আমান ওরফে শিমুল ভূঁইয়া যখন ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হন তখন শাহীনের দেওয়া ৩০ হাজার টাকা নিয়ে মোস্তাফিজ ও ফয়সাল বিভিন্ন জায়গায় আত্মগোপন করেন জানিয়ে হারুন অর রশীদ বলেন, এরপর তারা পরিকল্পনা করে দুর্গম পাহাড়ে কোনো মন্দিরে গিয়ে হিন্দু সেজে সেখানে লুকিয়ে থাকবেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, খাগড়াছড়ির দুর্গম পাহাড়ের পাতাল কালীমন্দিরে হিন্দুদের ধুতি পড়ে মাকালী পূজা শুরু করে এবং নাম পরিবর্তন করে ফেলে।
আনোয়ারুল আজিম গত ১২ মে দর্শনা–গেদে সীমান্ত দিয়ে চিকিৎসার জন্য ভারতে যান। বরাহনগরের স্বর্ণ ব্যবসায়ী বন্ধু গোপাল বিশ্বাসের বাড়িতে ওঠেন। কিন্তু ১৬ মে থেকে তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে না পারায় নিখোঁজ জানিয়ে ১৮ মে বরাহনগর থানায় জিডি করেন গোপাল বিশ্বাস। গত ২২ মে সকালে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে আনোয়ারুল আজীম খুন হওয়ার খবর আসে। সেদিন তার মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন শেরেবাংলা নগর থানায় তার বাবাকে অপহরণের পর গুম করার অভিযোগে মামলা করেন। মামলার পর বিভিন্ন তারিখে এই তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিভিন্ন মেয়াদে তাদের রিমান্ডে নেওয়ার পর আদালতে হাজির করলে তারা স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দি দিয়ে হত্যার দায় স্বীকার করেন।
তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ৮ আগস্ট
এদিকে এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ পিছিয়ে আগামী ৮ আগস্ট দিন ধার্য করা হয়। বৃহস্পতিবার প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ধার্য ছিল। কিন্তু তদন্ত সংস্থা ডিবি প্রতিবেদন দাখিল না করায় আদালত নতুন তারিখ ধার্য করেন।